মৃত্যুদণ্ডের স্মরণে প্রার্থনা দিবস ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’- আমাদের মনোবিকৃতির স্বরূপ

নাসীমুল বারী 

আমরা যে প্রণয়ঘটিত মানবীয় ভালবাসার জন্য ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বলি- তা সম্পূর্ণ ভুল, আমাদের মনোবিকৃতি মাত্র। বিশ্বে প্রেম-ভালবাসা এসব পালনের কোনো দিবসই নেই। যে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’-এর কথা বলি তা মূলত ‘অন্ধদের মানবীয় ভালবাসায় সেবা করার’ ভালবাসা।
তাহলে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেনটাইন ডে’ বা ‘ভালবাসা দিবস’ যে সবাই পালন করে- এ প্রশ্ন করবেন তাই তো? আচ্ছা ইতিহাসটাই না হয় একটু শুনুন। উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া মজার সে ইতিহাসটা জানাচ্ছি।
এর ইতিহাস শুরু আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৭০০ বছর আগে- ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খ্রিষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে ২৬৯ সালে বন্দী করে। সে সময় রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় সেন্ট ভ্যালেইটাইন জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তা আরো অনেক বেড়ে যায়। এই জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ডের সেই দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি।
অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে প্রার্থনার জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে’ ঘোষণা করেন।
খ্রিষ্টানজগতে পাদ্রী-সাধু সন্তানদের স্মরণ ও কর্মের জন্য এ ধরনের অনেক দিবস রয়েছে। যেমন : ১৭ মার্চ – সেন্ট প্যাট্রিক ডে, ২৩ এপ্রিল – সেন্ট জজ ডে, ২৪ আগস্ট – সেন্ট বার্থোলোমিজম ডে, ১ নভেম্বর – আল সেইন্টম ডে, ১১ নভেম্বর – সেন্ট মার্টিন ডে, ৩০ নভেম্বর – সেন্ট এন্ড্রু ডে। তেমনি ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি দিবস ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে’। সেন্ট ভ্যালেন্টাই’স ডে মূলত খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় আবহের একটি দিবস মাত্র।

পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব, ধর্মোৎসব সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি মুখ্য। তাই গির্জা অভ্যন্তরেও মদ্যপানে তারা কসুর করে না। এমন মদ্যপান জাতীয় ঘটনায় খ্রিষ্টিয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়, নিষিদ্ধ হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানের আদালত সেদেশে ২০১৭ সালে ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে। [উইকিপিডিয়া থেকে লিখিত]

১৯৯৪ সালে সে সময়ের এক কথিত বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে এটি আমদানী করে বিকৃত ইতিহাস হিসেবে প্রণয়ঘটিত মানবীয় ‘ভালবাসা দিবস’ নামে। শুধু তা-ই নয় সেই কথিত বুদ্ধিজীবীর সম্পাদিত জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকায়ও বাংলাভাষার বিকৃত চর্চা শুরু সেই একই সময়ে- নব্বই দশকে। তার পত্রিকায় অপ্রয়োজনে বাংলা শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি শব্দ বাংলা উচ্চারণে ব্যবহার করে বাংলাভাষার চরম ভাষা-বিকৃতির বিস্তৃতি ঘটায়। এটা নাকি নতুন স্টাইল; যেমনটি আজকাল এফ এম রেডিও জকিরা করে থাকেন। আমি সেই সময়ে একদিন তার একটি পত্রিকায় ব্যবহৃত অনেক অপ্রয়োজনীয় শব্দের উদাহরণ টেনে প্রতিবাদী পত্র পাঠিয়েছিলাম সম্পাদক (তাঁর) বরাবরে। কিন্তু পত্রিকায় তো ছাপেই নি; আমাকেও কোনো জবাব দেয় নি। হয়ত আমি ‘চুনোপুটি’ তাই ওই জ্ঞানপাপী রাঘব বোয়ালদের কাছে ‘পাত্তা’ পাই নি। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, সম্ভবত ৪৪ বা ১৪৪ দিনের মাথায় (সঠিক সংখ্যা মনে নেই) সে পত্রিকাটি ‘আত্মহত্যা’ করে বন্ধ হয়ে যায়। জাতি মুক্তি পায় বাংলাভাষার বিকৃতি থেকে। তবে তার সে প্রেতাত্মারা এখন রেডিও জকি-তে ঝেঁকে বসেছে।
আজ যদি ভ্যালেন্টাইন ডে পালনই করতে হয়, আসুন প্রকৃত ইতিহাস হিসেবে আমরা এদিন দৃষ্টিহীন মানুষকে আন্তরিক ভালবাসা দিয়ে একটু সেবা করি। তারা আমাদের মতো পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পায় না; কিন্তু মনের সৌন্দর্য তো তারা অনুভব করতে পারবে।
এবারের আগত বাংলাদেশী ভ্যালেন্টাইন ডে-তে দৃষ্টিহীন মানুষকে আন্তরিক ভালবাসা দেওয়াই হোক আপনার পুষ্পবিতরণের শপথ।

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন