মোদের গরব, মোদের আশা

শাহীন আক্তার 

‘পতিত’ মানে কি?

ভাগনীর প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে যাই। আমি জানি অভিধানানুযায়ী শব্দটির মানে হয়তো আমি সঠিক ধরিয়ে দিতে পারবো, কিন্তু এই তিনটি অক্ষর মিলে যে কতরকমের ভাব প্রকাশ করে, তা এই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া ছেলেমেয়েগুলি কোনোদিনও বুঝতে পারবে না।

ফেব্রুয়ারী মাস এলেই আমাদের ভাষাপ্রেম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে! সবাই চেষ্টা করে বাংলা ভাষায় ভাবগম্ভীর কিছু স্ট্যাটাস দেয়ার। সেটা তো অবশ্যই দোষের কিছু নয়। কিন্তু যারা দিচ্ছেন তাদের কেউ কেউ কী লিখছেন তার মানে জানেন বলেও বোধ হয় না। অগুনিত বানান ভুলের কথা না হয় বাদই দিলাম, কেননা আমি নিজেও সেই দোষে দুষ্ট। কারন পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছি বহু আগে। আর খুব যে মনোযোগ দিয়ে কাজটি করেছিলাম তাও নয়। এ কারনে বানান ও ব্যাকরণ সর্বদা মাথার উপরেই বিচরণ করছেন। অবশ্য বাংলা একাডেমি তার ইচ্ছে মত বছর বছর বানানের ধরন পাল্টাবে তা মনে রাখার দায় আমার নয়! যারা পারেন তারা নমস্য, তবে আমি কোনদিনই ওই প্রজাতির অন্তর্ভূক্ত ছিলাম না আর হতেও পারবো না সম্ভবত।

তবে ভাষাটা কিছুটা হলেও বুঝি। অন্তত য়/ই/উ/ও এগুলির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা আছে। তাই…কেউ কে কাও,খাই কে খায়, যায় কে যাই, হয় কে হই… লিখিনা।

আমাদের ভাষাজ্ঞান যে কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তা দেখে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয়! কয়েকদিন আগে একজনকে দেখলাম তার সময়রেখায় পরিচিত একজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে এইভাবে,

“তিনি অত্যন্ত ভালো, অমায়িক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিলেন।”

পড়ে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে না পেরে নিজেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম! কিংকর্তব্যবিমূঢ় বলতে হয়তো তিনি রাজকীয় চালচলন বা এই জাতীয় কিছু বুঝাতে চেয়েছেন। তাওতো এটা অনেক জটিল শব্দ! কিন্তু আজকাল অনেকেই সাধারণ অনেক বাংলা শব্দের মানেও বোঝেন না। ভাষা বা সাহিত্য সংক্রান্ত গ্রুপগুলিতে ঘুরে হতাশাই বাড়ে শুধু।

কোনো ভাষার অনুবাদ যতই সঠিক হোক না কেন তাতে কখনই প্রকৃত রসাস্বাদন করা যায় না। নিজের মাতৃভাষায় কোনো কিছু জানার মত মধুর আর কিছুই হতে পারে না। এক একটি ভাষার প্রতিষ্ঠার পিছনে থাকে সেই অঞ্চলের শত শত বছরের বিভিন্ন সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার অবকাঠামো। এক একটি অক্ষরের ঠাসবুননে গড়ে ওঠে ভাষার যে নকশীকাঁথা, তার পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে আপনজনের ভালোবাসা আর মমতা। সেই উষ্ণতা অনুভব করতে হলে তাকে জানতে হবে ভালবেসে, ভালোবাসা দিয়ে।

আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমার ‘চন্দ্রিমা’ নামের মানে জানবে না (অনুভব করবে না) ভেবে আমার বুকের ভিতর ক্ষরণ হয়। Moonlight কি কখনও মনে চন্দ্রিমা বা জোছনার দ্যোতনা আনতে পারে? কখখনো না!

প্রতিটি মানুষের উচিত সঠিকভাবে নিজের ভাষাকে জানা। আমি কোনো ভাষাবিদ নই তাই ভাষার জরুরি আনুষাঙ্গিক বিষয় অর্থাৎ ব্যাকরণ/উচ্চারণ/বানান এগুলির চাইতে ভাষার (শব্দের) প্রকৃত মানে জানাটা অনেক বেশি প্রয়োজন বলে মনে করি। সাধারণ মানুষ বলেই সাধারণ মানুষদের মধ্যে যে মানে জানা বাংলা শব্দের ভান্ডার ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে এটা টের পাই।

একদিনের ভাষাপ্রেম একটি ভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।

প্রতিবছরই কিছু অতিউৎসাহী ভাষাপ্রেমীরা পড়া-মহল্লায় তাদের ভাষাপ্রেমের নিদর্শন স্বরূপ নানারকমের প্রীতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ছেলেবেলায় এই সব অনুষ্ঠান, যা কিনা মনে অন্যরকম আবেগের জন্ম দিত তা এখন বিরক্তির উপলক্ষ মাত্র। এই যেমন আপতত একদিনের ভাষাপ্রেমের উৎপীড়নে আমার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। এদের রুচিজ্ঞান রীতিমতো বিবমিষার উদ্রেক ঘটায়। দিবস উদযাপনের উৎসাহ আছে কিন্তু দিবসের মর্যাদা বা মর্ম অনুধাবনের দায় নাই। ফলশ্রুতিতে “দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা” দিয়ে শুরু করে ভুল উচ্চারণে “মোরা একটি ফুলকে(রিমিক্স)” পেরিয়ে এখন “পারা ইতনা হাই হুয়া কি থার্মোমিটার টুট গায়া” চলছে! কার কি অবস্থা জানি না তবে আমার ধৈর্যের বাঁধ অনেক আগেই টুটে গেছে! সবে বাজে রাত দশ-টা! এর পর আর কী কী টুটবে আমি জানি না…

তবে যে যাই করুক আমার ভাষার প্রতি আমার ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি বরং দিন দিন পুরানো চালের ভাতের মতো বেড়েই চলেছে। তাই পরিশেষে প্রতিবারের মতই ভাষা আন্দোলনের উপর একটি কবিতা দিয়ে শেষ করছি। সকলের অবগতির জন্য পুনরায় জানাচ্ছি এই কবিতাটি আমার শিশুবেলায় আমার আব্বু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে লিখে দেন!

ফেব্রুয়ারি…

ফেব্রুয়ারি, ফেব্রুয়ারি

তোমার সাথে দিলাম আড়ি।

কেন তুমি বরকত ভাই, জব্বার ভাই,

আরও কতো ভাই কেড়ে নিলে?

কেন তুমি বাংলার মাঠ, বাংলার ঘাট,

রক্ত দিয়ে রাঙিয়ে দিলে?

কেন তুমি ছড়িয়ে দিলে গোলাগুলির মহামারী?

.

.

.

ফেব্রুয়ারি, রাগ কোরো না!

সত্যি আড়ি দিচ্ছি নাকো!

যুগে যুগে অমর হয়ে তুমি

বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বেঁচে থাকো।।।

(স্মৃতি থেকে কবিতাটি এতটুকুই উদ্ধার করতে পারলাম)

 

আরও পড়ুন