লাইক ও কমেন্ট বিষয়ে কিছু কথা

রফিকুল্লাহ্ কালবী
ফেসবুকে লাইক, কমেন্ট ও রিপ্লাইয়ের মহোৎসব চলে। কোন কিছুর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে মাধ্যমটি বেশ কার্যকর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেকে কেবল লাইক কমেন্ট পাওয়ার ইচ্ছায় এমন তুচ্ছ বিষয়াদি পোস্ট দিয়ে থাকেন যা নগন্য, হাস্যকর ও অগুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পোস্টকৃত বিষয়টির হয়তো কোন গুরুত্ব আছে। যাই হোক, বিষয়টি আপেক্ষিক। আমি যেহেতু সাহিত্যের একজন পাঠক, তাই আলোচ্য লেখায় সাহিত্য বিষয়ের লাইক, কমেন্ট ও রিপ্লাই নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো।

নিজের প্রোফাইল পোস্টে লাইক, কমেন্ট বা রিপ্লাই নিয়ে কারও কোন সমস্যা নেই। আমার মনে হয়েছে গ্রুপগুলোতে লাইক, কমেন্ট ও রিপ্লাইয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে, যা রীতিমত জুয়া খেলার তুল্য। কে কত বেশি কমেন্ট করতে পারেন তিনি পুরস্কৃত হন। আমি নিজে বিশটার মত গ্রুপে পোস্ট দিয়ে থাকি এবং ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি গ্রুপে গিয়ে সকলের কবিতা পড়ে তাতে মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে আমি অনেকের পোস্ট পড়ি, কিন্তু সকলের পোস্টে মন্তব্য করি না। আমার অনেক হিতাকাঙ্ক্ষী আছেন, যারা অনেক সময় তাদের লেখায় আমাকে মন্তব্য করতে বলেন। প্রথমত সময়ের অভাব এবং দ্বিতীয়ত কিছু লেখায় আমি কমেন্ট করতেই চাই না(কারণ বলবো না)। এ জন্যে কিছু কিছু গ্রুপ থেকে বেশ আপত্তিজনকভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। গ্রুপের মডারেটর বা দায়িত্ব প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি আমার কোন লেখায় মন্তব্য করার পাশাপাশি শেষের দিকে লিখে দেন,- “মহোদয়, অন্যের লেখা পড়ুন এবং মন্তব্য করুন”। কেউ বা লিখেন, “আপনার লেখায় যখন কেউ কমেন্ট করছে তখন অন্যের লেখায় কমেন্ট করাও আপনার দায়িত্ব”। কেউ আবার আরও এগ্রেসিভ হয়ে লিখছেন, “কবি, এটা কেমন লজ্জার বিষয় যে আপনি কারও লেখায় কমেন্ট করছেন না”?

এই সমস্ত অসুস্থ্য মন্তব্য পেয়ে আমি সাথে সাথেই সংশ্লিষ্ট গ্রুপ রিমুভ করে দিয়েছি। সামনে আরও কিছু গ্রুপকে রিমুভ করতে হতে পারে। আমার মনে হয় একজন কবি নিজের প্রয়োজনে, নিজেকে সমৃদ্ধ করার মানসেই তিনি অন্যের লেখা পড়বেন। এ নিয়ে প্রেসার ক্রিয়েট করার কিছু নেই। আবার কিছু কিছু কমেন্টদাতাকে চিনি যারা প্রত্যেকের পোস্টের বিপরীতে আজীবন একই কমেন্ট ব্যবহার করে আসছেন। পরিষ্কার বুঝা যায়, উনি কারও পোস্ট পড়েন না, একটি কমেন্ট কপি করে রেখেছেন এবং সকলের ক্ষেত্রে একই মন্তব্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনও ঘটতে দেখেছি– আমি প্রবন্ধ পোস্ট করেছি, অথচ কমেন্টকারী বন্ধু কমেন্ট করলেন, “বাহ্! খুব সুন্দর কবিতা লিখলেন, আমি পাগল হয়ে গেলাম” ইত্যাদি। আমার এক বন্ধুবর কবি সেদিন দুঃখ করে বলছিলেন, কেউ আসলে কবিতা ভালোভাবে পড়ে গভীরে ডুব দিয়ে মন্তব্য করছে না। কোন কিছু ছিটেফোটা না পড়েই দু’এক শব্দে লিখে দিচ্ছে,– “চমৎকার”, “দারুন”, “অপূর্ব”, “ভালো লাগল”, “ওয়াও”, “হা হা হা”, “ইস”, “উহু”, “আহা”, “মরি”, “সেই”, “বেশ” প্রভৃতি। প্রকৃত অর্থে এসবের কোনটিই সাহিত্যের ভেতরে ডুব দেয়া মন্তব্য নয়। আমি জানি এই লেখাটিও না পড়েই অনেকে মন্তব্য করবেন, “বাহ্! কী মধুর ছড়াকাব্য হলো, একটুখানি ছোট করলে ভালো হতো”! আবার কোন কোন লেখা এমন আছে যা পড়তে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। অথচ লেখাটি পোস্ট করার সাথে সাথে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে কমেন্ট চলে এলো গোটা পাঁচেক এবং কমেন্টের যা সাইজ সেটা লিখতেও অন্ততপক্ষে দু’মিনিট সময় লাগার কথা। যদি কমেন্টের অবস্থা এই হয়, তবে লাইকের অবস্থা যে আরও ভয়াবহ তাতে কোন সংশয় নেই। এছাড়া অধিকাংশের অবস্থা এই যে, তাদের নিরপেক্ষ মন্তব্য ধারণ করার ক্ষমতা নেই, নেতিবাচক মন্তব্যের তো প্রশ্নই আসে না। তিনি যেভাবে যা-ই লিখেন না কেন, তার খালি প্রশংসা দরকার। অথচ আমাকে কেউ সমালোচনা করলে আমি তাকে ওয়েলকাম করি।

একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়, নবীন লেখকদের উৎসাহিত করার বিষয়ে। উৎসাহ দেয়া মানে যদি পজেটিভ কমেন্ট করা হয় তাহলে আমি এতে খুব বেশি উদ্বুদ্ধ হওয়ার কিছু দেখছি না। একজন লেখক যিনি নবীন হোন বা প্রবীণ, তিনি যদি নিয়মের বাইরে গিয়ে ভুল কবিতা লেখেন এবং অন্যেরা তাকে উৎসাহ যোগাতে থাকেন তাহলে তিনি কখনই কবি হয়ে উঠবেন না। চির কিশোর কবি সুকান্ত মাত্র একুশ বছর বেঁচে ছিলেন। জীবদ্দশায় তাঁর কোন বই প্রকাশ হয় নি এবং তিনি লিখে গেছেন নিজের ভিতরের তাকিদ থেকে; কারও উৎসাহের তোয়াক্কা করেন নি কখনো। জীবনান্দ দাশ নীরবে লিখে যাওয়ার এক জীবন্ত উদাহরণ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ব্যাপারেও একই কথা খাটে। তিনি প্রায় সমসাময়িক সকল মহল থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কই তাঁর প্রতিভা তো কেউ আটকাতে পারে নি। তবে এটা ঠিক যে, শত্রুরা নজরুলকে অনেক ক্ষতি করতে পেরেছে। এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, বাধাগ্রস্ত হলে প্রতিভা আরও পরিপক্ক হয়ে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।

কাজেই আপনার পোস্টে কমেন্ট আসুক আর নাই আসুক, আপনি লিখতে থাকুন কাব্যের নিয়ম মেনে আপন মহিমায়। অন্যের লেখায় মন্তব্য করতে পারেন বা নাই পারেন সম্ভব হলে সকলের লেখা পড়ুন নিজেকে সমৃদ্ধ করবার লক্ষ্যে। কারও কাছে দায়বদ্ধতার খাতিরে দায়সারা কমেন্ট রিপ্লাইয়ের কোন প্রয়োজন নেই। আমরা কখনই কারও কমেন্টের আসায় বসে থাকবো না।

লেখক :  কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন