সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারদের মরণোত্তর ফাঁশি চাই

হাসান আল বান্না

দুইশত বছর বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করে বৃটিশদের যখন উপমহাদেশে অক্সিজেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম করছিলাম তখন লর্ড মাউন্ড ব্যাটেন পরোক্ষভাবে উপমহাদেশ শাসনের নতুন তত্ত্ব দিয়ে বলেন : ‘বৃটিশরা এমন এক প্রজন্ম ও জাতি তৈরি করবে যার রক্তে মাংসে হবে ভারতীয় আর চিন্তা ও চেতনায় হবে ইউরোপীয়।’ বৃটিশদের আধিপত্য সামরিকভাবে শেষ হলেও ইংরেজি দিয়ে তারা উপমহাদেশ শাসন করছে। শাসনের ভাষা হচ্ছে এখনও ইংরেজি আর সাংস্কৃতির ভাষা হতে যাচ্ছে হিন্দি। আমার এক অধ্যাপক বন্ধুর ছেলে ঢাকার সেরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। আমি জানাতে চাইলাম কেন পড়াচ্ছেন? তিনি বললেন এখনকার শতাব্দীতে সেরা হতে হলে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াতে হবে। এই ধারণাটি কেবল আমার অধ্যাপক বন্ধুর নয় বরং এখন শিক্ষিত বেশিরভাগ শ্রেনী একই ধারণা পোষণ করে থাকেন। আর এই ধারণা তাদের নিজেদের তৈরীকৃত নয় বরং রাষ্ট্র তাদের এই ধারণা সৃষ্টির ক্ষেত্রে মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করেছে। যে রাষ্ট্রের কোর্টের রায় হয় ইংরেজিতে। কর্পোরেট মিটিং এখন আর বাংলায় চলে না। এইতো সেদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন কর্ণেলের সাথে বৈঠক করলাম তারাও পুরো অংশ জুড়েই ইংরেজি ব্যবহার করলেন। জাতীয় সংসদে কোন কোন সাংসদ তার বক্তৃতার মাঝে দাম্ভিকতা দেখাতে ইংরেজি ব্যবহার করেন। আপনি যখন রাস্তায় হাটবেন তখন প্রায়ই দেখবেন কোন কোন কথিত ভদ্রলোক রিক্সাওয়ালা বা অন্য কাউকে ঝারি বা হুমকি দিচ্ছে ইংরেজিতে অর্থ্যাৎ ইংরেজি হচ্ছে শাসক শ্রেণির ভাষা শোষণের হাতিয়ার আর বাংলা হচ্ছে মজলুম ও নিচু শ্রেণীর ভাষা।

৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সবারই জানা। তখনও বাংলা ছিল মানুষের হৃদয়ের ভাষা আর শাসকের ভাষা ছিল উর্দূ ও ইংরেজি। সেই ভীনদেশীয় ভাষার বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি এবং মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের দামামা বাঁজিয়েছি। কিন্তু দ্বীর্ঘ সংগ্রাম আর যুদ্ধের ফলে আমরা উর্দূকে হটিয়েছি বটে তবে এখন শাসকের উর্দূ, ইংরেজি পরিবর্তে হিন্দি ইংরেজি হচ্ছে শোষকদের ভাষা। আপনি তিন,পাঁচ তারকা হোটেলে যাবেন প্রথম অভ্যর্থনা পাবেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের নাগরিক জেনেও সেখানকার একজন পরিচ্ছন্ন কর্মীও আপনার সাথে কথা বলবে ইংরেজিতে। থ্যাংক ইউ,ওয়েলকাম ছাড়া সৌজন্যে বিনিময় এখন রীতিমতো কবিরা গুনাহের সামিল। বাংলাদেশের শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। আমি নিজেও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভূতপূর্ব শিক্ষকতা করি। প্রথম পাঠদানেই আমাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে ইংরেজিতে পাঠদান করতে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলেছি, এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভেঙে গুড়িয়ে মাটির সাথে না মিশালে সালাম বরকতদের সাথে প্রতারণা করা হবে। আমার প্রিয় বন্ধু সুপ্রীম কোর্টের সাবেক ডিপুটি এ্যাটর্নী জেনারেল এডভোকেট আমিনুর ভাইকে বলেছিলাম : উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা নিষিদ্ধের প্রয়োজনীয়তা। তিনি বললেন ভীনদেশীয় ভাষার কারনে ইংরেজি পরিবর্তন করতে চান তাহলে আদালতের পোশাক? আমি বললাম! হাঁ প্রয়োজনে তাই হবে। লুঙ্গি এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছোট পাঞ্জাবী হবে আইনজীবী বিচারকদের পোশাক। জেনারেল এরশাদের কিছু ভালো কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে, অধ্যাদেশ জারি করে রাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা করেছেন বাংলায়। সেটুকুও যদি না থাকতো তবে এই শতাব্দীতেই বাংলা ভাষাকে জাদুঘরে দেখা যেতো। আমার মনে হচ্ছে, প্রথমে বৃটিশ বিরোধী ২০০ বছরের শাসন এবং পরবর্তী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩০ বছর শাসনের বিরুদ্ধে বহু রক্তের গঙ্গার বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ততদিন পর্যন্ত পাওয়া যাবে না যতদিন বাংলায় ইংরেজি ও হিন্দির প্রভাবের বিরুদ্ধে আরেকটি বিদ্রোহ না করতে পারবো!!

একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর প্রথম ও প্রধান পরিচয় হচ্ছে তার ভাষা। আর এই ভাষা হারিয়ে গেলে মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। বহু শতাব্দীর ও বহু মানুষের সাধনায় তৈরি হওয়া আমাদের মাতৃভাষাকে অবহেলায় অপাঙ্ক্তেয় হতে দেয়া যায় না কোনোক্রমেই। যে ভাষার জন্যে এতো রক্ত ক্ষয় সেই ভাষা এমন খিচুড়ি ভাষায় রূপ নেবে তা ভাবা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা এখন রীতিমত কঠিন আর দুঃসাধ্য এক বিষয়। বিয়ে বাড়ি, সামাজিক অনুষ্ঠান সহ সব জায়গায় চলছে রীতিমতো হিন্দি গানের ছড়াছড়ি। কোন এক ভিডিওতে দেখছিলাম,শহীদ মিনারেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হিন্দি গান চলছে। সেই সঙ্গে রয়েছে মিডিয়া ডাকাতদের ভাষা নিয়ে নানা রকম ষড়যন্ত্র। রেডিওতে বাংলাকে এমনভাবে উচ্চারণ করে মনে হয়, মুখে বুঝি গোটা আস্ত একটা মারবেল পুরে বসে রয়েছে। চিবিয়ে চিবিয়ে বিকৃত উচ্চারণে এভাবে বাংলা উচ্চারণ এখন যেনো ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। হায়! এর জন্যেই কি সালাম, বরকত, জব্বাররা রক্ত দিয়েছিলেন? যদি বাংলা হয় কেবল মজলুমের ভাষা তবে সালাম, বরকত, রফিক জব্বারদের মরণোত্তর ফাঁশি চাই।

লেখকঃ কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, লেখকের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট 

আরও পড়ুন