হিজাবের জন‍্য থুথু দিয়েছিল এক জার্মান

জুম্মি নাহদিয়া

আমি তখন মাত্র বৈদেশ এসেছি। সামার চলে। জামাইর সাথে কোন এক উইকেন্ডে দাঁত বের করে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

ও কী কাজে জানি দূরে গেল। আমি দাঁড়িয়ে গ্রীষ্মের ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য দিয়ে মাখো মাখো প্রকৃতি মনযোগ দিয়ে দেখছি। এরকম সময়ে আমি বেশ ভাবালু থাকি। হঠাৎ পায়ের কাছে জনৈকা জার্মান রমনী থুথু দিয়ে কি কি সব বলতে বলতে চলে গেল (অনুবাদঃ গরমের ভেতর কাপড়ের গাট্টি সেজেছে! শখ দেখলে মরে যাই, উদ্ভট আরব কাহেঁকা, থুঃ!)।

আমার নিজের জন্য প্রচণ্ড মায়া লাগল। “দাঁত বের করে খুব দাঁড়িয়ে ছিলে হে ! লোকজন ছ্যাপ দিয়ে চলে যায়!”

তবে খুব অবাক হইনি। মারওয়া শেরবিনিকে তো এই দেশেই মেরে ফেলা হয়েছিল। আর নিজের দেশেও নানারকমের পরিস্থিতি মাড়িয়ে এসেছি। অবাক হব কেন?

আমি তাকে কিছুই বললাম না। জার্মান ভাষায় তর্ক করার মত দক্ষ নই এক, আর দুই হল যারা ছ্যাপ দিয়ে মানুষকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত বা মতামত জানাতে পছন্দ করে তাদের সাথে মাতৃভাষাতেও তর্ক করতে আগ্রহী নই।

অনেক পরে আমার ল্যাংগুয়েজ ইন্সট্রাক্টরের সাথে এইসব সুখ দুঃখের কথা কিছু শেয়ার করেছিলাম। ভদ্রমহিলা ক্যাথলিক। টিপিকাল জার্মান। হাসতে হাসতে বলল, “তুমি তো ছ্যাপ খেয়েছ, আমি তো অলমোস্ট ঘুষি মারা খেয়েছি। হাঙ্গেরী গিয়েছি শীতকালে। মাথায় ভালভাবে স্কার্ফ লাগিয়েছিলাম। ওভার কোটটাও বেশ লম্বা ছিল। সহসা এক বিপ্লবী বুড়ি অ্যায়সা ঘুষি বাগিয়ে মাতাল কণ্ঠে চিৎকার করতে লাগল যে, আমি মুসলিম, আমি টেরোরিস্ট…আমি আজকে মরছি। সুতরাং এগুলি পাত্তা দিওনা। মাতাল বা উগ্রপন্থীরাই এরকম আচরণ করে।”

আগে পড়েছিলাম, কাল আবার কোন পত্রিকায় “বাঙালীর বোরখা” পড়লাম। বুঝলাম লেখিকা ক্ষ্যাপা। খারাপ মেয়ে , গালিবাজ মেয়ে, পড়ালেখা পারেনা মেয়েদেরই মৌলবি বাপ মায়ের চক্করে পড়ে বোরকা পরা উচিৎ, এইটাই উনি বোঝাতে চান। অসুবিধা নাই। বুঝতে পেরেছি। রাজনীতি সমাজনীতি নিয়ে নীতি কথা বলা কত মানুষের উৎকণ্ঠার প্রতিফলন পত্রিকা অফিসে পড়ে। তাই আজকাল ঘুরে ফিরে এরকম লেখা আসছে। মানে ছ্যাপ দিয়ে আদর্শ প্রচার টাইপের লেখাপত্র।

কাউকে নীচু করে, কারো আত্মসম্মানবোধে আঘাত করে আমার মনে হয়না পৃথিবীতে কোন আদর্শ কায়েম হয়। জোর করে কাউকে বোকো হারাম বা আইসিস স্টাইলে বোরকা পরিয়ে যেমন আল্লাহর প্রতি ব্যক্তির ভালবাসা বাড়ানো অসম্ভব তেমনি এভাবে এত অসম্মান দেখিয়ে কাউকে নিজের আদর্শের প্রতি অনুরাগী করে তোলাও খুবই সীমাবদ্ধ চিন্তা।

যে যেই আদর্শেই দাঁড়িয়ে থাকুন না কেন, কনভে করতে হলে করুন, জাস্ট কনভে। থুথুর সাহায্যে বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বা বাঁধাছাঁদা করে কনভার্ট না প্লিজ! আমার মতামত, খুবই স্বল্প জ্ঞানের কাজ সেটা।

কনভার্শনের চিন্তাটা বরং ব্যক্তির নিজের ওপরে ছেড়ে দেয়ার পক্ষে।

লেখক : কলামিস্ট ও জার্মান প্রবাসী

আরও পড়ুন