পরার্থপরতার অর্থনীতিঃ সুবাস ছড়ানো ফুল

এম আর রাসেল

দান খয়রাতের সংস্কৃতি সুপ্রাচীন কাল থেকেই আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। কথিত আছে, কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধন প্রতি চার বছরে একবার প্রয়োগের মেলায় তার সর্বস্ব দান করতেন। এমনকি, সব দেওয়ার পর নিজের কাপড়ও দান করতেন। এর পর গঙ্গা স্নান শেষে অন্যের কাপড় পরিধান করে বাড়িতে ফিরতেন। ফ্রান্সিস বেকন মনে করতেন “দান-খয়রাতে কোন আতিশয্য নেই”।

আমাদের ধর্মেও ধান-খয়রাতকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামের স্বর্ণযুগে এমন অনেক উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান সময়েও সমাজে দান-খয়রাত চালু রয়েছে। তবে ধরণ পাল্টেছে, যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্যই বেশি থাকে। এ ব্যাপারে আমাদের সবার সতর্ক থাকা উচিত। সবকিছুর উপরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।

দান-খয়রাত যেহেতু সম্পদ ও টাকা-কড়ির সাথে সম্পর্কযুক্ত, তাই অর্থনীতিতেও দান-খয়রাত জায়গা করে নিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এর নাম দিয়েছেন পরার্থপরতার অর্থনীতি। এই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হল Non-profit Organization এর প্রতিষ্ঠা যা এনজিও নামেই সমধিক পরিচিত। এই এনজিও প্রকৃতপক্ষে কর ফাঁকি দিয়ে জনগণকে শোষণের এক সৃজনশীল পদ্ধতি।

পরার্থপরতার এই অর্থনৈতিক সূত্র ধরেই চালু হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। জার্মান চ্যান্সেলর অটোভন বিসমার্ক হাত ধরেই এই কর্মসূচি প্রথম আনুষ্ঠানিকতা পায়; এর পর ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকারও এই কর্মসূচির আওতার বিভিন্ন পোগ্রাম পরিচালনা করে থাকে। সামাজিক নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তা এই তিন শিরোনামে বিভিন্ন পোগ্রাম চালু রয়েছে। ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এসবের অন্তভূর্ক্ত।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মূলত দুঃস্থ ও গরীর মানুষের জন্য পরিচালিত হলেও এর থেকে ফায়দা লুটছেন এর পরিচালনার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে তথাকথিত দেশপ্রেমিক নেতা ও আমলারা এই কর্মসূচির নামে টাকা আত্নসাৎ করছেন। সাম্প্রতিক দুর্যোগের সময়েও এই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ চাল আত্নসাৎ এর ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অমানবিকতার প্রাচুর্য সবর্ত্রই চোখে পড়ে অনেক বেশি।

ক্ষমতার দম্ভে মানুষ ভুলে যায় তাঁর আসল পরিচয়। এই দম্ভের বড়াই শেষ পর্যন্ত কি বহাল থাকে? সাময়িক সুখ- স্বাছন্দ্যের আয়েশী হাতছানিতে মানুষ নিজের মনুষ্যত্ব ও বিবেকবোধ বিক্রি করে ফেলছে। এই ক্রয়-বিক্রয়ের খেলায় যে শুধু ক্ষতি ছাড়া লাভ পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই সেটা যেন সবাই ভুলেই গেছে? বিবেকের মৃত্যু মানুষকে অন্ধ করে দেয়। এই অন্ধত্ব যে কত ভয়ানক পরকালে বিশ্বাসী অন্তর ঠিকই উপলব্ধি করতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছিলেন পারস্পারিক সহযোগিতা ও জানাশোনার লক্ষ্যে। সূরা আল হুজুরাত অধ্যয়ন করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সামাজিক শ্রেণীবিভাগের প্রকারভেদ, ধনী-গরীর, আশরাফ- আতরাফ, উঁচু- নিচু এসব তো মানব সৃষ্ট। মক্কা বিজয়ের পর কাবা তাওয়াফের পর রাসূল (সা) তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন,

“হে লোকেরা! সমস্ত মানুষ দু’ভাগে বিভাক্ত ৷ এক, নেক্কার ও পরহেজগার-যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদার অধিকারী ৷ দুই, পাপী ও দূরাচার যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট ৷ অন্যথায়, সমস্ত মানুষই আদমের সন্তান ৷ আর আদম মাটির সৃষ্টি।”

মাটির সৃষ্টি এই মানুষদের এক সময় মাটিতেই মিশে যেতে হবে। এই ব্যপারটা মানুষ জানলেও অনুভূতির আরশিতে অন্তরে ধারণ করতে পারে না। মানুষের অন্তর আজ দূষিত পদার্থে ভরে গেছে। তবে এত হতাশার মাঝে আশার দিকও রয়েছে। আমাদের সমাজ যে শুধু পাপী ও দূরাচারীদের আবাসস্থল নয়, কিছু নেককার ও পরহেজগারী মানুষও রয়েছেন।

বিশুদ্ধ অন্তরের এইসব মানুষেরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ দূর করতে ফুলের সুবাস ছড়ানোর কাজ করছেন।  বিভিন্ন অঞ্চলে দুঃস্থ মানুষদের মাঝে পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা আমাদের আশাবাদী হতে শেখায়। হাজারো নিরাশার মাঝে এই আশায় আমাদের পথ চলার প্রদর্শক। আসুন সবাই সুবাস ছড়ানো ফুল হই…………………………

লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন