মিয়ানমার অভ্যুত্থানঃ জনগণের আন্দোলন চলছে

আয়েশা সিদ্দিকা 

বছর ৮ নভেম্বর নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে অং সান সূচী। কিন্তু ভোটে কারচুপির অভিযোগ আনে সেনা সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি। নতুন নির্বাচনের দাবি জানায় তারা। তাদের দাবি না মানলে সংবিধান বিলুপ্তির হুমকি দেয় সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাই। পরে সংবিধান মেনে চলার আশ্বাস দিয়ে নতুন জাতীয় পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হয়েছিল। সেদিনই সকালে (১ফেব্রুয়ারি) এক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে  টাটমাড। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেট কাউন্সিলর তথা ডি ফ্যাক্টো লিডার তথা কার্যকর নেতা অং সান সূচীকে গ্রেফতার করে।  এবং এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা দেয়। সেনা  সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে মিয়ানমারের জনগণ।  

টাটমাড

স্থল, নৌ, বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বার্মার সশস্ত্র বাহিনীকে টাটমাড নামে ডাকা হয়। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান। তাদের জন্য জিডিপির প্রায় তিন শতাংশ বরাদ্দ থাকে। এবং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের ২৫ শতাংশ আসন টাটমাডর জন্য সংরক্ষিত। এসব ক্ষমতা  সংবিধানেভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য সেনাবাহিনীই ২০০৮ সালে  সংবিধান  প্রণয়ন করে। টাটমাডর প্রধান ১৯৫৬ সালে জন্ম নেওয়া মিন অং হ্লাই। ১৯৬২ থেকে ২০১১ পর্যন্ত সরাসরি দেশ শাসন করে টাটমাড।

কেন এই অভ্যূত্থান?

১.  নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে অং সান সূচীর দল আসলে হয়তো গণতান্ত্রায়ন কর্মসূচীকে এগিয়ে  নিয়ে যেতে পারে। টাটমাড এর দৃষ্টিভঙ্গি এতে সামরিক বাহিনীর অহংকার, সুযোগ সুবিধা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

২. টাটমাড এর প্রধান ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত পদে থাকতে পারে। এই বয়সসীমা ২০১৬ সালে নির্ধারন করা হয়েছিল। মিন অং হ্লাইয়ের বয়স ৬৫। তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিলে আন্তর্জাতিক বিচারের মুখে পড়তে পারে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর ব্যাপারে। তখন অং সান সূচী ও সেনাবাহিনীকে গণহত্যার অভিযোগ থেকে বাঁচাতে নাও আসতে পারে। যদিও ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে তাঁদের পক্ষেই সাফাই গেয়েছিলেন।  

চীন কেন সেনা সরকারকে সমর্থন করছে?  

১. চীন মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগকারী এছাড়াও দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বও চীনের সঙ্গে।  

২. রাখাইনের  কিয়াউপিউ ( kyauphyu) তে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে চীন। এবং আরাকান থেকে ২৩৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করেছে। গভীর সমুদ্রে যে তেল ও গ্যাস পাওয়া যায় এই পাইপলাইনের মাধ্যমে  চীন তার ইউনান প্রদেশে নিয়ে যায়।  

৩. দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে  সাগর তীরবর্তী দেশগুলোর সাথে বিবাদ রয়েছে চীনের। যদি কখনো এই দেশগুলো মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দেয় তবে চীনের  ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই চীনের কুনমিং থেকে  রাখাইনের কিয়াউপিউ( kyauphyu) পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করেছে চীন । এ পথে সহজেই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে পারে। এটি মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প পথ। ফলে সহজেই মধ্যাপ্রাচ্য থেকে এ পথে জ্বালানি তেল কিনতে পারে।

তাই মিয়ানমার চীনের কাছে ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।   

ভারত কি করবে? 

ভারত মনে হয় একটু দোটানায় পড়েছে। একদিকে বন্ধুরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র রক্ষায় জন্য সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে।  এবং সেনাবাহিনীর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে।  যদিও তাতে তাদেরকে দমানো সম্ভব নয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন ও ভারতের সুবরামনিয়াম জয়শংকরের বৈঠকে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান আবারও পরিষ্কার করেন। 

উল্লেখ্য ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সাথে মিত্রতা বেড়ে চলেছে।  ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলকে অবাধ ও মুক্ত রাখার জন্য কোয়াড গঠন করে এবং বেকা চুক্তি সম্পন্ন করে। মিয়ানমারের ভারতের স্বার্থ  রয়েছে। ভারত যে “লুক ইস্ট” নীতি গ্রহণ করেছে তার সফলতা নির্ভর করছে মিয়ানমারের ওপর। কারণঃ

১. ভারত -মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক নির্মাণ করেছে। এই মহাসড়ক মিয়ানমার- ভারত সীমান্তবর্তী Moreh-Tamu হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় ও নাইপিদো ও বাগো শহরে শেষ হবে। এই সড়কপথে ভারতীয় পণ্য দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়  যেতে পারবে  এবং মুক্তবাণিজ্যের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।  

২. এই মহাসড়ক কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায় ভারত। যা East West Economic Corridor   এর অংশ। এই মহাসড়ক সম্প্রসারিত হলে আসিয়ান বাণিজ্যে ৭০ বিলিয়ন যোগ হবে ভারতের।

৩.  ভারতের কালাদান প্রজেক্টের আওতায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা বন্দরের সাথে সমুদ্রপথে ভারতের সাতবোন রাজ্যের মিজোরামের রাজধানী আইজল সংযুক্ত। কলকাতা থেকে পণ্য মিয়ানমারের সমুদ্রবন্দর সিটওয়েতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে কালাদান নদী পার হয়ে পণ্য যাবে আইজলে।  

বাংলাদেশে কোন পথে যাবে?  

রোহিঙ্গা মুসলিমদের যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়েছিল সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাই। বর্তমানে তিনিই দেশটিতে স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন  কতটা কার্যকর হবে তা ভাবার বিষয়। ২০১৭ সালে প্রত্যাবসন চুক্তি হলেও গত তিন বছরেও তা অগ্রগতি হয় নি।   

২০২১ সালে ৪ ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাটি স্থগিত হয়। মিন অং হ্লাই ঘোষণা দিয়েছেন প্রত্যাবসন সংক্রান্ত আলোচনা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ নিয়মিত মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কিন্তু এই সামরিক সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক কোনো ফল আসবে কি না। তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে।  তবু বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সাথে আলোচনা করে দশ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হোক সেটাই বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা।

মিয়ানমার ও সামরিক শাসন দুটি সমার্থক শব্দ 

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরিসমাপ্তিতে মিয়ানমার স্বাধীন হয়  এবং ইউ নু ক্ষমতায় বসে। ১৯৫৮ সালে অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রীডম লীগ (AFPFL) এর মধ্যে বিভক্তি দেখা দিলে পার্লামান্টে এক অনাস্থা ভোটে  ইউ নু হেরে গেলে সামরিক বাহিনীর প্রধান  নে উইন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। এর মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে আসে। ঠিক দুই বছর পর সাধারণ নির্বাচনে ইউ নু জয়লাভ করে ক্ষমতায় বসে।  

রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে ১৯৬২ সালে নে উইন এক রক্তপাতহীন অভ্যূত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। তখন থেকেই দেশটিতে সামরিক শাসন চলতে থাকে। ২০১৫ সালে নির্বাচনে অং সান সূচীর দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি(  এনএলডি) জয়লাভ করে।  ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। 

জনগনের আন্দোলন চলছে। বিশ্বের অনেক দেশই এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছেন। এখন দেখার পালা মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার দর্প চূর্ণবিচূর্ণ হয়, না আরো বেশি পাকাপোক্ত হয়। জনগণ যে সহজেই সামরিক কর্তৃত্ব মেনে নেবে না তা প্রতীয়মান হয়েছে। মিয়ানমারের ললাটে কি আছে তা দেখতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। 

লেখকঃ শিক্ষার্থী ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন