বাংলাদেশকে ভারত কেন ট্রানজিট সুবিধা দেয়না?

মাসুদ আলম 

সম্প্রতি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম গুলোতে খবর প্রচার হচ্ছে যে ভারত তাদের ভুখন্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নেপালে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট দিয়েছে। বিষয়টি কি বাংলাদেশ যেভাবে নিজ ভূখণ্ডের উপর দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট  দিয়েছে বা ট্রানজিট চুক্তি করেছে সেরকম নাকি ভিন্ন কিছু? সেটাই আজকে আমার আলোচনার বিষয়। তবে বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হলে আমাদেরকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট ভাবে বুঝতে হবে। এক.  ট্রানজিট কি? দুই.  ট্রান্সশিপমেন্ট কি? তিন. করিডোর কি?  

ট্রানজিট 

কোন একটি দেশ যদি তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী একটি দেশের পণ্যবাহী যানবাহন তৃতীয় অন্য একটি দেশে যাতায়াতের সুবিধা দেয় তাকে ট্রানজিট বলে। যেমন- ভারতকে বাংলাদেশ ট্রানজিট দিয়েছে যাতে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের পণ্যবাহী যানবাহনগুলো বাংলাদেশের পূর্ব দিকের ভারতীয় রাজ্য গুলোতে যাতায়াত করতে পারে।

ট্রান্সশিপমেন্ট 

একটি দেশের পণ্যবাহী যানবাহন গুলো প্রতিবেশী একটি দেশের সীমান্তবর্তী বন্দরে গিয়ে মালামাল গুলো ঐ দেশের নিজস্ব যানবাহনে তুলে দিবে। সেই যানবাহন গুলো মালামাল পরিবহন করে অন্যপ্রান্তের সীমান্তে অপেক্ষমান সে দেশের যানবাহনে তুলে দিয়ে আসবে নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে- এটাই ট্রান্সশিপমেন্ট।

যেমন- ভারতের পণ্যবাহী জাহাজগুলো বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসে তাদের পণ্য গুলো খালাস করে। তারপর বাংলাদেশের ট্রাকগুলো সেই পণ্য বহন করে ভারতের আসাম- ত্রিপুরার সীমান্ত পর্যন্ত গিয়ে আবার ভারতের ট্রাকে তুলে দিয়ে আসে। ট্রান্সশিপমেন্ট স্থল বন্দর দিয়েও করা যায় এবং এতে অর্থনৈতিক ভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়।

করিডোর 

একটি দেশের যানবাহন অন্য একটি দেশের উপর দিয়ে নিজে দেশের অন্য অংশে পৌঁছানোর সুযোগ পেলে যে দেশটির উপর দিয়ে গেল সেটা হলো তাদের জন্য করিডোর। যেমন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের কোন যানবাহন বাংলাদেশের উপর দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে গেলে ‘বাংলাদেশ’ হলো তাদের জন্য করিডোর। 

একটি দেশের অন্তত দুই দিক জুড়ে বিস্তৃত কোন প্রতিবেশী দেশ থাকলে সেক্ষেত্রে বাণিজ্যিক কারণে প্রতিবেশী দেশটি করিডোর সুবিধা চেয়ে থাকে। যেমন গাম্বিয়া- সেনেগাল, বাংলাদেশ- ভারত, ইথিওপিয়া- সোমালিয়া, লেসেথো- দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি। ভৌগোলিক কারণ হোক কিংবা রাজনৈতিক কারণ হোক বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতকে উপরোক্ত তিনটি (দুই ভাবে) সুবিধাই দিয়েছে। কিন্তু বিনিময়ে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য সুবিধাই পায়নি।

ট্রানজিট সুবিধার জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে গৃহীত কিছু বিধান মেনে চলতে হয়, আর তা হলো বার্সেলোনা ট্রানজিট কনভেনশন-১৯২১ ও নিউইয়র্ক ট্রানজিট কনভেনশন-১৯৬৫। এ ছাড়া WTO (World Trade Organization) এর জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট) দলিলের আর্টিকেল-৫  এ ট্রানজিটের রীতি-নীতির উল্লেখ রয়েছে যা WTO এর সদস্যভুক্ত সব সদস্য দেশের জন্য প্রযোজ্য। ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট) দলিলের পঞ্চম ধারায় (আর্টিকেল-৫) ‘ট্রানজিটের স্বাধীনতা’ বিষয়টি সম্পর্কে নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে। 

বার্সেলোনা কনভেনশনে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার বিবেচনায় ট্রানজিট সুবিধা সীমিত করার সুযোগও এ কনভেনশনে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ট্রানজিট দিয়ে তার বিনিময়ে কোনো শুল্ক আদায় করার সুযোগ নেই। তবে এই পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দেশটির অবকাঠামো ব্যবহার, সেসবের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি সেবার জন্য মাশুল আদায় করা যাবে।

মানচিত্রঃ বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট

বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদেশ অনুযায়ী ভারতেকে দেয়া ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রতি চালানের জন্য (অর্থাৎ এক জাহাজে আনা পণ্যের জন্য) প্রসেসিং মাশুল ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য মাশুল ২০ টাকা, নিরাপত্তা মাশুল  ১০০ টাকা, এসকর্ট মাশুল ৫০ টাকা, কনটেইনার স্ক্যানিং মাশুল ২৫৪ টাকা, অন্যান্য প্রশাসনিক মাশুল ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়/ হবে। এর পর পরিবহন খরচ বা ভাড়া পাবে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানি বা যানবাহনের মালিকগণ।

তবে দূর্ভাগ্যজনক ভাবে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভূটানে পণ্য রপ্তানির জন্য ভারতের কাছ থেকে ট্রানজিট  বা ট্রান্সশিপমেন্ট কোনটাই পাচ্ছেনা এবং আদায় ও করতে পারছেনা। যদিও ফেব্রুয়ারী (২০২১) মাসের প্রথম দিকে ভারতের রেলপথ ব্যবহার করে দুই দফায় মোট (২৭+২৫) ৫২ হাজার টন সার নেপালে পৌছানোর ট্রানজিট বা অনুমতি দিয়েছে ভারত। আর এটাকেই ফলাও করে প্রচার করে যাচ্ছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম গুলো। ৫২ হাজার টন সার রপ্তানির ট্রানজিটটি কোন নিয়মিত ট্রানজিট নয়, পরবর্তীতে আরো রপ্তানির জন্য নতুন করে আলোচনা/দেনদরবার করে আবার নতুন ভাবে রফাদফা করতে হবে অর্থাৎ অনুমতি সাপেক্ষ! 

বাংলাদেশ যখন খুশি চাইলেই তা পারবেনা। কেননা ভারতের সাথে এ সংক্রান্ত কোন চুক্তি নেই। যেমনটা রয়েছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের ট্রানজিট চুক্তি এবং ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি। তাই ভারত তাদের ইচ্ছে মতো বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করতে পারবে।

বাংলাদেশের জনগণ(!!) যতোই হাহুতাশ করুক না কেন ভারতের রাজনীতিবিদরা সবার আগে তাদের দেশের স্বার্থ দেখে। ভারত বাংলাদেশকে কখনোই নিয়মিত  ট্রানজিট দিবেনা এবং চুক্তিও করবেনা।

তার কারণ হলো- নেপাল ও ভুটান দুটি দেশই আমদানি নির্ভর দেশ। এবং তাদের আমদানির প্রায় ৯৫ % ই হয় ভারত থেকে। আর বাকি প্রায় ৫% আমদানিও হয় ভারতের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে, তারপর ভারতীয় ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধায় ভারতের পরিবহন গুলো সেসব পণ্য পৌঁছে দেয় নেপাল ও ভুটানে।

সুতরাং বাংলাদেশকে যদি ট্রানজিট/ ট্রান্সশিপমেন্ট দেয় তাহলে নেপাল এবং ভুটান তাদের বহু পণ্য বাংলাদেশ থেকেই আমদানি করবে! বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটান পণ্য আমদানি করতে পারবে! ভারতের চেয়ে অনেক সস্তায় পণ্য দিতে পারবে বাংলাদেশ! চীনের সাথে পাহাড় পর্বত বেষ্টিত সীমান্ত থাকায় এবং খরচ বেশি হওয়ায় স্থল পথে তাদের পণ্য আমদানি সম্ভব হয়না। সুতরাং ভারত কেন তার বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী বাড়াবে? 

লেখকঃ কলামিস্ট  ও প্রবাসী বাংলাদেশী, আল আইন, ইউএই

 

আরও পড়ুন