ভুল পথে নারীর ক্ষমতায়ন

হাসান আল বান্না

ক্ষমতায়ন হচ্ছে মানুষের বস্তুগত, দৈহিক, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যার সঙ্গে দক্ষতার প্রশ্নটি জড়িত। কাজেই নারীর ক্ষমতায়ন বলতে এমন একধরনের অবস্থাকে বোঝায়, যে অবস্থায় নারী তার জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি ক্ষেত্রে মর্যাদাকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারে। নারী তার স্বাধীন সত্তা নিয়ে মর্যাদার সাথে পরিবার, দেশ, জাতি গঠনে কাজ করুক এটাই আমাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের যে সব কর্ম পরিকল্পনা তা বেশিরভাগই ভুলের উপর দন্ডায়মান। যার ফলে সামগ্রিক ভাবে রাষ্ট্রের উন্নতি ঘটলেও নারীরা সবসময়ই নিগৃহীত হচ্ছেন।

আমাদের কিছু সংকীর্ণ চিন্তা ধারাগুলো হচ্ছে এমন: নারী শ্রমিকের মাথায় ইটের ডালা তুলে দিচ্ছেন এক পুরুষ শ্রমিক, যা সভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারী-পুরুষের সমান অবদানের কথাই তুলে ধরে। রাস্তা এবং কলকারখানার মতো মরণকূপে নারীকে কাজে লাগিয়ে বলে বাহ্ নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে। এই সব বিকৃত মানুষদের আবার আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করি। নিন্মে নারীদের সামাজিক সূচকের কিছু তথ্যচিত্র তুলে ধরে পুনরায় শিরোনামে ফিরছি :

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতি হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকেও। এই সময়ে পরিবর্তন এসেছে নারীর অবস্থা ও অবস্থানেও। বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশই নারী। পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে সরকারি-বেসরকারি ও আধাসরকারি অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলেও।

গোটা বিশ্বেই অন্য মাধ্যমের পাশাপাশি তথ্যের জন্য আজকাল নারী-পুরুষ উভয়েরই অনলাইন মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনাকারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই। তবে আশার কথা এই, বিরূপতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে দিন দিন নারী অনলাইনেও নিজেদের একটা পরিসর তৈরি করে নিতে পেরেছেন। সরকার পরিচালনায়, রাজনীতিতে, প্রশাসনে, সামরিক বাহিনীতে, আইনশৃঙ্খলা বিভাগেও নারীর অবস্থান ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে পথেঘাটেও।

নারী নির্যাতন একটি প্রাগৈতিহাসিক সমস্যা। এখান থেকে উত্তরণে আজও কোন শক্তিমান কাঠামো গড়ে উঠেনি।

একজন নারী যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় প্রাইমারী থেকেই। দুঃখজনক ভাবে আমরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বিশেষে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই এখনও নির্যাতনমুক্ত করতে পারিনি, যা অনেক সময়ই প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়েই মেয়েদের শিক্ষা সমাপ্তির একটা অজুহাত হয়ে ওঠে। যতক্ষণ আমরা এ নিশ্চয়তা দিতে না পারব যে, মেয়েরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হবে না, ততক্ষণ এই বাধা ডিঙানো মুশকিল হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের যত সংবাদ আমরা গণমাধ্যমে দেখি, বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়েও বেশি। সব ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না। সব ঘটনার ন্যায্য প্রতিবিধানও হয় না।

শিক্ষা থেকে মাঝপথে কিশোরীদের ঝরে পড়ার আরেক কারণ স্কুল-মাদ্রাসায় মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুবিধা না থাকা। ২০১৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন জরিপ অনুযায়ী, স্কুলগুলোয় প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য আছে মাত্র একটি টয়লেট। অথচ সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী প্রতি ৫০ জনের জন্য একটি টয়লেট থাকার কথা। জরিপ অনুসারে গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৪৩ শতাংশ স্কুলে উন্নত ও কার্যকর টয়লেট রয়েছে, শহর এলাকায় যা ৬৩ শতাংশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার অপর্যাপ্ততার কারণে কিশোরীরা প্রজননতন্ত্রের নানা সংক্রমণেও ভোগে, যা তাদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে এবং ক্ষমতায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতি সম্প্রতি বিশেষ করে কলকারখানাভিত্তিক কাজে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বাড়ছে, যা নারী কর্মীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। এটি অদক্ষ শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের আশঙ্কার সামনে ফেলছে। তাছাড়া দক্ষতার অভাবে নবাগতরাও এসব কাজে যুক্ত হতে পারছেন না।

পেশাজীবী নারীদের সিংহভাগকেই বাসস্থান ও কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হয় গণপরিবহনে, যেখানে নিয়মিতভাবে তাদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব অপরাধে যুক্ত থাকে একইসঙ্গে পুরুষ যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকরা। নারী যাতে নির্বিঘ্নে বাসে চলাচল করতে পারে, সেজন্য বিধি মোতাবেক কিছু আসন সংরক্ষণ করা হলেও প্রায়ই ওসব আসন দখল করে রাখে পুরুষ যাত্রীরা। তাছাড়া অধিকাংশ যাত্রী ও হেলপারের ধারণা, কেবল সংরক্ষিত আসনগুলোই নারী যাত্রীদের, এর বাইরে নারী বসতে পারবেন না। ফলে অনেক সময়ই নারী যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। তাতে তাদের হয়রানিমূলক মন্তব্য তো শুনতে হয়ই, এমনকি শরীরে হাত দেয়া, গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো, ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কা দেয়া, চিমটি কাটা, কাঁধে হাত রাখার মতো ঘটনারও মুখোমুখি হতে হয়। হেলপাররাও প্রায়ই নারী যাত্রীদের বাসে উঠানো-নামানোর সময় সাহায্য করার ছলে সুকৌশলে শরীরে হাত দেয়, বিশেষ করে চলন্ত অবস্থায় যখন যাত্রী উঠানো হয়।

বিভিন্ন গবেষণাই উঠে এসেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৮ জন নারী রাস্তায় চলার পথে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের শিকার হন, যেখানে সিংহভাগ পারপেট্রেটরই গণপরিবহনের চালক ও হেলপাররা। সম্প্রতি চালক ও হেলপারের দ্বারা বাসে দলগতভাবে ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আজও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এতোসব বিভীষিকাময় চিত্রের পরিবর্তন না ঘটিয়ে শুধুমাত্র সমালোচনা আর নারী অধিকারের কথা বলতে গিয়ে ধর্ম ও সামাজিক রীতির বিরুদ্ধাচরণ করার মাঝে কোনদিনই সমস্যার সমাধান হবে না।

ইদানীং কেবলই মনে হয়, নারীর সমতা, স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন আর অধিকার নিয়ে সর্বত্র ভুলে ভরা এক ধারণাকে লালন করে চলেছি আমরা। আর এই ধারণাগুলো যখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা লালন করেন, তখন আমাদের সামনে থাকে শুধুই অন্ধকার। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এ ক্ষেত্রে রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা, ইচ্ছাশক্তির অভাব এবং এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাব। অথচ বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে সবার আগে প্রয়োজন এই সব নীতিনির্ধারকের মনোজগতের পরিবর্তন।

নারীর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধে এবং নারীর সমতার যাত্রাকে এগিয়ে নিতে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণার স্পষ্টতা থাকা দরকার। জানতে হবে জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষা এবং তার প্রয়োগ। অসতর্ক শব্দচয়ন যেকোনো ইতিবাচক চিন্তাভানাকেও মুহূর্তেই বিপরীতভাবে উপস্থাপন করতে পারে। সর্বোপরি প্রয়োজন নারীর প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারীর চোখে বিশ্বকে দেখতে পারার প্রবল ইচ্ছাশক্তি! এই দুইয়ের মাঝেই নারীকে তার সম্মানজনক ও মর্যাদাকর জায়গাই আসিন করতে পারে।

কিস্তি – ১ (খুব শিগ্রই দ্বিতীয় কিস্তি আসবে)

লেখক: কলাম লেখক

আরও পড়ুন