কীভাবে গড়ে তুলবেন শিশুর ঘুমের সুন্দর অভ‍্যাস

তৃপ্তি পোদ্দার

শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর সঠিক বিকাশে সহায়ক। শিশুর ঘুম নিয়ে কম বেশী সমস্যার সম্মুখীন প্রত্যেক অভিভাবককে হতে হয়, বিষয়টি এমন নয় যে অভিভাবক শুধু সন্তানকে সঠিক নির্দেশনায় ঘুমে অভ্যস্ত করতে পারলেই হবে; শিশুর সঠিক বিকাশের জন্য তাদের যেমন পর্যাপ্ত ঘুম দরকার তেমনি পরিচর্যাকারীদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে।
শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে ঘুমের প্রয়োজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে বলার কিছুই নেই। শিশু যদি রাতের ঘুম ঠিকমত না ঘুমায় তবে শিশু তার প্রতিদিনের রুটিন থেকে সরে আসতে শুরু করে, যা শিশুর পরবর্তী জীবনে হুমকির সম্মুখীন হয়ে দাঁড়ায়। শিশুর জন্মের সাথে সাথে তাকে একটি রুটিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, যেমনঃ শিশুর ঘুম, খাবার, খেলা, ইত্যাদি। শিশু নবজাতক অবস্থায় রুটিনটি খুব দ্রুত ফলপ্রসূ করা সম্ভব কিন্তু শিশু একটু বড়ো হয়ে গেলে শিশুকে রুটিনে বাঁধা কষ্টকর হয়ে যায়। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন: আপনার হলিডে অথবা অফডেতে কিন্তু আপনি ঠিক আপনার অফিসের সময়ে ঘুম থেকে উঠেছেন কারণ প্রতিদিন আপনার ওই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। আবার আপনি যদি নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেয়ে থাকেন তাহলে ওই নির্দিষ্ট সময়টিতে আপনার ক্ষিদে লাগবে। এই উদাহরণ দিলাম কারণ, শিশুর খাবার নিয়েও আমাদের বাঙালি অথবা এশিয়ান মায়েদের অথবা বাবাদের কষ্টের আর শেষ নেই কিন্তু রুটিনে নিয়ে আসলে আপনি শিশুকে বলবেন না, শিশু আপনাকে বলবে তার খাবার সময় বা ঘুমের সময়। শিশুর খাবার এবং শিশুর রুটিন নিয়ে অন্য আরেক দিন লিখবো। আজ চেষ্টা করবো শিশুর এবং মায়ের ঘুমের প্রয়জোনীয়তা তুলে ধরতে।

অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এ ভুগছে এমন শিশুরা সাধারণত ঘুমের সমস্যায় বেশী ভুগে থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সাধারণ শিশুদের তুলনায় ৪০%-৮০% অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার শিশুরা বেশী অনিদ্রায় ভুগে থাকে। এই অনিদ্রার কারণসমূহ হলো শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা পরিবেশগত, এবং জিনগত অস্বাভাবিকতার ফলাফল।

নানান গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পর্যাপ্ত ঘুমের ফলপ্রসূতা হিসেবে উঠে এসেছে শিশু তার মনোযোগকে বৃদ্ধি করতে পারে, ভালো আচরণ করতে সক্ষম হয়, শিখন শিক্ষণ প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হয়, স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। সর্বপরি, শিশুর মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। কিভাবে, প্রশ্ন? স্বাভাবিক ভাবে শিশুর ঘুম ভালো না হলে শিশুকে দিয়ে আপনি পরবর্তী দিনের একটিভিটিসগুলো সঠিক ভাবে করতে পারবেন না, একটু একটু করে রুটিনের সাথে তার জীবনের মূল্যবান সময়টুকু চলে যেতে থাকবে। আপনি নিজও না ঘুমাতে পেরে ধীরে ধীরে কেমন যেন পরিবর্তন হতে শুরু করবেন, খিটমিটে মেজাজ নিয়ে আপনি বা আপনার শিশু কোন কাজ ভালো ভাবে সফল করতে পারবেন না, আমরা বড়রা কফি পান করি ঘুম তাড়ানোর জন্য অর্থাৎ নিজেকে সজাগ করার জন্য কিন্তু শিশুটি কি করে একটু চিন্তা করতে থাকেন, লেখার শেষের দিকে উত্তর পায়ে যাবেন। গবেষণা বলছে, আপনি কম ঘুমের কারণে উচ্চ রক্ত চাপ, ওবেসিটি এবং ডিপ্রেশন এ ভুগতে পারেন।

মায়েরা যারা শিশুর প্রথম পরিচর্যাকারী তারা কিভাবে কতটুকু ঘুমাচ্ছেন বা ঘুমাতে পারছেন ? অনেক বাবা তার শিশুর বিকাশের কথা অথবা তার সন্তানের মায়ের যত্ন নিতে হবে এই চিন্তা করে শিশু নবজাতক অবস্থায় মাকে ঘুমের ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকেন কিন্তু এই সুবিধাটুকু খুব কম মায়ের ভাগ্যে হয়ে থাকে। শিশুর পাশাপাশি মায়েরও যত্ন এবং ঘুমের দরকার রয়েছে, অধিকাংশ মা এখনও শিশুর প্রথম পরিচর্যাকারী। শিশুর এবং তার মায়ের পরিপূর্ন ঘুম শিশুর মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

কতক্ষন ঘুমাবে একটি শিশু? শিশুর বয়সভেদে ঘুমের পার্থক্য হয়ে থাকে। শিশু নবজাতক অবস্থায় বেশী ঘুমায় এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘুম কমতে থেকে।তবে একজন পূর্ন বয়স্ক মানুষকে ২৪ ঘন্টায় ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে বলে তারা মতামত দিয়েছেন।
শিশুর বয়স যখন ১ বছরের নিচে শিশু তখন ১২-১৬ ঘন্টা ঘুমাবে।
শিশুর বয়স যখন ১-২ বছর ১১-১৪ ঘন্টা ঘুমাবে।
শিশুর বয়স যখন ৩-৫ বছর ১০-১৩ ঘন্টা ঘুমাবে।
শিশুর বয়স যখন ১৩-১৮ বছর ৮-১০ ঘন্টা ঘুমাবে।

শিশু যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমায় তবে কি হবে:

শিশু না ঘুমানোর কারণে অস্থিরতা তৈরি করতে সাহায্য করবে, অস্থির থেকে অতি-অস্থিরতায় ধীরে ধীরে প্রবেশ করবে। শিশুর মেধা বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করবে এবং তা সরাসরি তার ভবিষ্যৎ জীবনে সফলতা আনতে প্রতিবন্ধক হবে। ঠিক তাই, শিশুকে বললেই শিশু ঘুমিয়ে পড়বে না অথবা শিশুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েও ঘুমিয়ে পড়বে না, শিশুকে সঠিক সময়ে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম পাড়ানোর কিছু কৌশল আছে তা আপনাকে জানতে হবে। শিশুর অনিয়মিত ঘুমের কারণে মা নিজে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।শিশুকে নিজের অজান্তে শারীরিক ও মানসিক আঘাত করছেন এবং অনুশোচনায় ভুগছেন। মা নিজেকে কর্মহীন মনে করছেন। পরিবারের অন্যদের কথায় আপনি আরো ব্যকুল হয়ে নিজেকে দোষারোপ করছেন।

এই পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস এক ঘন্টায় বা একদিনে হবে না। কিন্তু শিশু নবজাতক অবস্থায় অল্পকিছুদিনের মধ্যে শিশুর প্রয়োজন এবং পরিবেশ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে খুব সহজেই ঘুমের রুটিন ঠিক করা সম্ভব। শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুর বিকাশ এবং শিশুর চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্র পরিবর্তন হতে শুরু করে।

শিশুর ঘুমের অভ্যাসটি করাতে হবে শিশুর জন্মের শুরু থেকে আর এই অভ্যাসটি ২/৩ মাসের মধ্যে শিশু অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই নতুন মায়েরা জেগে উঠুন এবং রুটিনের মাধ্যমে শিশুর জীবন শুরু করুন। প্রয়োজনে এক্সপার্টসদের সাহায্য নিন।মনে রাখবেন; প্রতিটি শিশু অন্য আরেকটি শিশু থেকে আলাদা।

লেখক : আর্লি ইয়ার্স এক্সপার্ট, ইউকে

আরও পড়ুন