মৃত শিশুটি ভার্চ্যুয়ালি ছুঁয়ে দিল মায়ের হাত

এইচ বি রিতা

যখন কোন নারী তার স্বামী হারান, তখন আমাদের দেশে তাকে বলা হয় বিধবা। যখন কোন স্বামী তার স্ত্রীকে হারান, তাকে কি বলা হয় বাংলায়? তবে ইংরেজিতে স্বামী হারা স্ত্রীকে উইডো এবং স্ত্রীহারা স্বামীকে বলা হয় উইডোয়ার। যখন কোনও শিশু তার পিতামাতাকে হারায় তখন তাকে এতিম বলা হয়। কিন্তু যে বাবা-মা তার সন্তানকে হারান, তাকে কী বলো হয়? পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ডিকশনারীগুলোতে এর কোন শব্দ আছে কিনা জানা নেই, তবে ইংরেজিতে এর কোনও শব্দ নেই। কারণ ব্যথাটি এতটাই অকল্পনীয়-অসহনীয় যে কোনও শব্দ দ্বারা এটি বর্ণনা করা সম্ভব হয়না।

অসময়ে অনেক কাছের মানুষ চলে যেতে দেখেছি। নিজ পরিবারে তিনজন তরুন ভাই, আশাপাশে সর্বত্র। মৃত্যুরও বুঝি নানান ধরন থাকে। তাই তো এত এত মৃত্যু সহ্য করতে পারলেও কারো মৃত্যুতে, আহাজারিতে আমাদের বুক জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। যে যায়, সে তো যায়। অসহনীয় ব্যাথা নিয়ে যে থেকে যায়, তাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে?

করোনা মহামারীতে দেখেছি আত্বায়-অ‌নাত্বীয় বহু মৃত্যু। বুক কেঁপেছে ভয়ে, কখনো স্বাভাবিক নিয়মে। দেখেছি কাছের শিক্ষক বন্ধু আ্যান নুয়্যুনের মৃত্যু। বুক চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি। অনুভব করেছি মাহবুব-উ‌ষা দম্পত্তির সন্তান মারজানকে হারানোর বেদনা। এখনো কানে বাজে তাঁর মায়ের চিৎকার, ‘মাই বয় ইজ হাঙরী! মাই বয় ইজ হাঙরী!’

আজ এমনই এক সন্তান হারানো ব্যাথাতুর মায়ের ‘ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি’ ভিডিওটি দেখে মন অস্থির হয়ে উঠেছে। এ অস্থিরতার কোন নাম নেই। কোন ব্যাখা নেই। কোন কারণ নেই। কেউ বলবে বাড়াবাড়ি, আমি বলবো, এটাই আমি।

ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। জাং জি সাং এর চার সন্তানের মধ্যে নেইয়েন ছিল ৩য় সন্তান। ৭ বছর বয়সী নেইয়েন হঠাৎ করেই হায়মোক্রোম্যাটোসিস নামে একটি বিরল রোগ আক্রান্ত হয়। হায়মোক্রোমাটোসিসের বর্তমানে কোনও নিরাময় নেই তবে চিকিৎসা রয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত রোগী তার ডায়েট থেকে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ শরীরে গ্রহণ করে, যার ফলে আয়রন ওভারলোড হয় শরীরে। এটি সময়ের সাথে সাথে সারা শরীরে জমতে থাকে এবং লিভার সহ অনেক অঙ্গকে ক্ষতি করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত এই রোগ মৃত্যুর কারণ ঘটায়। তিন বছর আগে ২০১৭ এর এমনই এক অনাকাঙ্খিত শরৎতকালে মৃত্যু হয় নেইয়েন এর। নেইয়েন মারা যাওয়ার পর তার মা জাং জি-সাংকে অকালে সন্তান হারানোর বেদনার মধ্য দিয়েই পার করতে হয়েছে তিনটি বছর।

তবে কন্যা শিশু হারানো শোকাহত মায়ের বুকে মলম লাগাতে অনেকটাই সহায়ক হয়েছে আজকের প্রযুক্তি। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি (ভিআর) এর বদান্যতায় দক্ষিণ কোরিয়ান মা জাং জি সাং তার মৃত সন্তানের সাথে অল্প সময়ের জন্য হলেও পূনরায় মিলিত হতে সক্ষম হয়েছেন।
দেশের অন্যতম ব্রোডকাষ্ট এমবিসি একটি অনুবাদ করা ডোকোমেন্টারি “মিটিং ইউ” এর মাধ্যমে এটি সম্ভব করেছে। গত বছর মার্চের শেষের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি প্রচারিত হয়েছিল। জাং এবং তার প্রাক্তন কন্যার সাথে দৃশ্যের একটি পূর্বরূপ এমবিসির ইউটিউব চ্যানেলে দেখানো হয়। সেখানে আসল এবং ভার্চুয়াল উভয় পৃথিবীর মধ্যে প্রযুক্তির জাদুকরিতে দু’জনের মধ্যে আবারও সাক্ষাৎ করানো হয় যা ছিল অদ্ভূত এক আবেগঘন মুহূর্ত।

এমবিসি অনুসারে, ভিআর এ অনুকরণটি বিকাশ করতে প্রযোজনা টিমটির আট মাস সময় লেগেছে। তারা শিশু অভিনেত্রীর গতিবিধি রেকর্ড করতে মোশন ক্যাপচার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল, যা তারা পরে ভার্চুয়াল নেইয়েনের মডেল হিসাবে ব্যবহার করেছে। এবং তার ভয়েস ও পুনরুত্থাপন করেছিল। পুরো দৃশ্যটিতে তাঁরা একটি ভার্চুয়াল পার্কও ডিজাইন করেছিল যার ভিত্তিতে মা-কন্যা দু’জনেই সেখানে প্রায়শই মিলিত হতে পারবে।
ইউটিউবের পূর্বরূপ ভিডিওটিতে যখন জাং তাঁর মেয়ের সাথে কথা বলছিল তখন তাঁর অন্য তিনটি শিশুসহ তাঁর স্বামীও মনিটরিং রুমে চিত্রটি বসে দেখছিলেন।

ভিডিওর পর্দায় নেইয়েনের ভার্চুয়েল মডেলটি মায়ের দিকে ছুটে এসে যখন বলে, মা, তুমি কোথায় ছিলে? তুমি কি আমাকে ভেবে দেখেছ?
তখন মনিটরিং রুমে থাকা প্রতিটি আবেগ জর্জরিত মানুষ কেঁদে উঠেছিল। ভিডিওতে জাং এর ভার্চ্যুয়েল মেয়েকে স্পর্শ করার চেষ্টার দৃশ্যটি ছিল হ্নদয় বিদারক।
এ ব্যাপারে জাং বলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলাম। আমি তার হাত ধরে তার মুখ তোলার চেষ্টা করেছিলাম।’

অবশেষে, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির (ভিআর) বদান্যতায় জাং তার মৃত মেয়ের হাত ছুঁতে পেরেছিল। জাং তার মেয়েকে একটি জন্মদিনের গানও গেয়ে শোনায়। সেখানে তাদের কাছে সিউইড স্যুপ ছিল, একটি প্রচলিত কোরিয়ান জন্মদিনের থালা ছিল। এবং মেয়ে খেতে পছন্দ করতো বলে জাং তাকে মধুর এক টুকরা কেইকও উপহার দিয়েছিলেন।
এক সময় ভার্চ্যুয়েল ভিডিওতে নেইয়েন ফুঁ দিয়ে মোমবাতিগুলি উড়িয়ে দেয়। । এবং উইশ করে, ‘দয়া করে আমার বাবাকে ধূমপান করতে দিবেনা না … দয়া করে আমার মা কে কাঁদাবেন না।’

শেষটা ছিল খুব বেশী হ্নদয় বিদারক। শেষের “মিটিং ইউ” ভিডিওটিতে দেখা যায় নুইয়েন বিছানায় শুয়ে আছে। হাতে একটা চিঠি, মা’কে পড়ে শুনাচ্ছে, ‘বিদায় মা! আমি তোমাকে অনেকদিন স্মরণে রাখবো। ভালোবাসি তোমাকে!’
উত্তর পেয়ে মা জাংকে বলতে শুনা যায়, ‘মি টু।’
তারপর নেইয়েন ঘুমোতে ফিরে যায় এবং একটি যাদুর মতো নেইয়েন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর প্রজাপতিতে পরিণত হয়।

‘মিটিং ইউ’ এর পুরো অভিজ্ঞতার পর জাং বলেছিলেন, যদিও এটি সম্পূর্ণরূপে তার মেয়ের মতো নয়, তবু মনে হয়েছিল যেন তিনি তার মেয়েটিকে এই মুহূর্তে দেখেছেন। তিনি বলেছিলেন যে, এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে তিনি যেন তার সন্তানকে আর মিস না করেন, বরং তার পরিবর্তে তাকে আরও বেশী ভালবাসেন।

ভিডিওটিতে যখন জাং তার মৃত মেয়েটিকে ছুঁতে চেয়েছিল, তখন জাং নিজেও জানতো মেয়েকে ছোঁয়ার এ কেবল ক্ষনিকের ভার্চ্যুয়েল মিটিং, চিরসত্য নয়। সত্য কিছুক্ষণ পরই দৃশ্যপট বদলে দিবে। তবু মায়ের অবুঝ মন ব্যাকুল হয়েছিল। হোক ভুল, হোক মিথ্যে তবু মৃত সন্তানকে জীবিত দেখে কার না ছুঁতে মন চায়?
দৃশ্যটি দেখে কেঁদেছিল জাং এর পরিবার, ক্যামেরাম্যানসহ উপস্থিতি ভিআর এর সকলে। আমিও কেঁদেছিলাম হাউমাউ করে। মৃত শিশু সন্তানকে জীবিত দেখে কার না ছুঁতে মন চায়! কার না বুক ভাঙ্গে!
ভিডিও লিংকটি দেয়া হল- Mother meets her deceased daughter through VR technology

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন