মেয়েটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী!

মেয়েটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারে না। অনেক কিছু একেবারেই বোঝে না। বেশ লম্বা এবং সুন্দর। প্রথম দেখায় মনেই হবে না ওর কোনো সমস্যা আছে। যে কোনো ভাবেই হোক মেয়েটার মা আমাকে খুঁজে বের করেছেন।

ওনার অনুরোধে আমি ওনার বাসায় গিয়েছিলাম। মেয়েটাকে নিয়ে কোনো কাজ করা হয়নি। দেখলেই বোঝা যায়। আমি বলে এসেছিলাম, শিক্ষার ব্যাপারে আমার সাথে যোগাযোগ যেন করেন। অনেকদিন পর আজকে মেয়েটার মায়ের ফোন এসেছিল। অনেক কান্নাকাটি করলেন। আমাকে যেতে বললেন। কিন্তু আমি তো এমন হুটহাট ফোনে এখন আর যেতে পারি না। আগে থেকে কোথাও কমিটমেন্ট থাকলে তো একেবারেই না।

বললাম, সময় করে আসবো। জেনে নিলাম কখন যেতে হবে। পরে উনি ফোনেই অনেক কথা বললেন। মহিলার তিন ছেলেমেয়ে। মেজো মেয়েটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। মেয়েটাকে দিনের মধ্যে মিনিমাম তিন বার তার বাবা মারধর করে। ফ্লোরে ফেলে পুরো শরীরের ভার দিয়ে চেপে রাখে। মহিলা মুখে না বললে কি হবে। আমি বুঝে নিয়েছি মহিলা নিজেও শারীরিকভাবে নির্যাতিত। বাসায় একটা অস্থির পরিবেশ থাকে সব সময়। ছোট এগারো বছরের ছেলেটা বলে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।

লোকটা যেহেতু একজন সৈনিক। বললাম, কমপ্লেইন করেন। মহিলা বলেন, তাও বলসিলাম ম্যাডাম। কিন্তু বিচার দিলে তো চাকরী চলে যাবে। খাব কি! চলবো কেমন করে। মহিলার বাবা, মা, ভাই, বোন কেউ নেই। এক কথায় যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাই বিচার দেয়ার চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিয়েছেন। শেষে শুধু বললেন, আপনার উপর আমাদের চারজনের জীবন মরন নির্ভর করে। হয় আমাদের বাঁচান নয়তো বিষ দেন। খেয়ে মরে যাই।

কি করতে পারবো, কতটুকু করতে পারবো জানি না। তবে চেষ্টা করবো নিশ্চয়ই। আমার আইডিতে যদি মানবাধিকার কর্মী থাকেন যারা disable child, নির্যাতনের স্বীকার নারী ও শিশু নিয়ে কাজ করেন তারা এগিয়ে আসলে ভালো হোত। আমি এখন পর্যন্ত special educator ছাড়া আরকিছু নই। তবে এ ধরনের ঘটনায় মনটা আসলেই কেঁদে ওঠে।

গত কিছুদিন ধরে কোর্সের প্রয়োজনে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুর উপর লেখাপড়া করছিলাম। একটা রেফারেন্স বইতে পড়ছিলাম,

“PL: 94-142 (1975) The Education For All Handicapped Children Act অনুসারে যে কোন একটি মানবতাবাদী রাষ্ট্র তার অধীন সকল প্রকারের প্রতিবন্ধী শিশুদের সকল প্রকারের শিক্ষা ও পূর্নবাসন দানের জন্য সার্বিকভাবে দায়বদ্ধ। কিন্তু এই দায়বদ্ধতা প্রাচীন যুগের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছিল না।পাশ্চাত্যের শিক্ষার ইতিহাসে স্পার্টাতে দেখা যায়, যেহেতু প্রতিবন্ধীরা দেশ রক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধে অংশগ্রহণে অক্ষম সুতরাং রাষ্ট্র প্রতিবন্ধীদের বেঁচে থাকার অধিকারকেই স্বীকার করেনি। ফলে শিশু প্রতিবন্ধী হলে হত্যা করা হত এবং কন্যা শিশুদের ভবিষ্যতে মিলিটারিদের ব্যবহারের জন্য বাঁচিয়ে রাখা হতো। অর্থাৎ সার্বিকভাবে সে সময়ে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতিবাচক মনোভাবই প্রকাশিত ছিল। আধুনিককালে এইরুপ মনোভাবকে Hostile attitude বলা হয়।” (ব্যতিক্রমধর্মী শিশু…অধ্যাপক বিষ্ণুপদ নন্দ, অধ্যাপিকা সারাওয়াতারা জামান)

এটুকু পড়েই কেমন লাগছিল। ভাবছিলাম যাক এখন আর এমনটা হয় না। কিন্তু আজকে সকালের ঘটনাটা এছাড়া ও স্পেশাল এডুকেটর হিসেবে কাজ করার সুবাদে এমন কিছু ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার কারনে আমার নির্মমভাবে মনে এলো, আগের ব্যবস্থাই ভালো ছিল। রাষ্ট্র আরকিছু পারুক না পারুক ওদের একটা ব্যবস্থা করে দিত। যা নিয়ে বাবা মায়ের চিন্তা থাকতো না। বিশেষ করে মায়েদের। একজন মা কত কষ্ট করে সন্তান জন্ম দেন। সন্তান জন্মের প্রক্রিয়ার সাথে পুরুষের সম্পৃক্ততা থাকলেও সন্তান সুস্থ অসুস্থতার সাথে যেন তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অসুস্থ সন্তানটির অসুস্থতার সব দায়ভার যেন একা মায়ের উপর বর্তায়।

মেয়েটির বাবাকে দেখে আমার মনে হয়েছে, পুরো সংসারটা যেন তার উপর একটা বোঝা। আজকের ফোনালাপে আমার ধারণাটা আরো একটু পোক্ত হলো। ব্যাপারটা এমন ইচ্ছে করেই যেন পুরুষটি এমন করছে। সরাসরি বলতে পারছে না চলে যাও সবাই। আমি নতুন করে জীবন শুরু করবো। এমন মনে হওয়ার পেছনে একটা শক্ত কারন হচ্ছে, এই প্রতিবন্ধী মেয়েটি ছাড়াও তো তার আরো দুটো ছেলেমেয়ে আছে। সে যদি প্রকৃত অর্থে বাবা হয়ে থাকে তাহলে বাকি দুটো সন্তানের জন্য হলেও সংসারে অশান্তি করতো না। এখন তো সে পরিবারের বাকি সদস্যদের ও প্রতিবন্ধী বানিয়ে দিচ্ছে। যদিও ধারণা করে বলছি। তবু এই যুগের হালহকিকত দেখে মনে হচ্ছে, পুরুষটির বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। এতটা উগ্র হওয়ার পেছনে এটাও একটা কারন হতে পারে।

এই জায়গাটায় নারীরা এখনো কত বোকা! আজও স্বামীর টাকায় চলবে বলে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করার পরিবর্তে বিয়ের কথাটাই আগে চিন্তা করে। আবার বিয়ে হয়ে গেলে জান প্রাণ দিয়ে সংসার করে। নিজের প্রতি যত্ন নেয় না। মুটিয়ে যায়। চেহারায় বয়সের ছাপ পরে। স্বামী, সংসারকে আপন ভেবে সারাটা জীবন দিয়ে দেয় সংসারের পেছনে। দিনশেষে কেউ শান্তি পায়। কেউ পায় না। যারা অশান্তির মধ্যে পরে যায় তারা অতীতের দিকে তাকিয়ে কেবল হায় হায় করে। ততোদিনে হয়তো নারীটির নিকট আত্মীয়রা আর কেউ পাশে নেই।

আমি বলবো এখন থেকে নারীদের প্রতিটা স্টেপ খুব সাবধানে ফেলতে হবে। বিয়েটা জরুরি কিছু না। ওটা জৈবিক চাহিদা মেটানোর একটা মাধ্যম কেবল। আর যেহেতু মানুষের একটা পরিবার প্রয়োজন। হাটে মাঠে ঘাটে থাকতে পারবে না। একসময় বয়স হবে। পরিবারের কম বয়সীরা বেশি বয়সের আত্মীয়কে দেখাশোনা। তা না হলে একা ঘরে অবহেলায় মরে পরে থাকবে। তাই বিয়ে নামক বন্ধন। এই বন্ধন সবার জন্য সুফল বয়ে আনবে ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়।

তাই নারীদের উচিত আগে নিজে স্বাবলম্বী হওয়া। পরে বিয়ের পিড়িতে বসা। এমনকি সন্তানও নিজের ইচ্ছেয় নেয়া। ব্যাপারটা এমন যে, আমি মা হতে চেয়েছি তাই আমার প্রয়োজনে সন্তান নিয়েছি। সুতরাং সন্তানের সকল সুযোগ সুবিধার দিকে আমার নজর থাকবে। সে প্রতিবন্ধী শিশু হোক বা সুস্থ। তাই একথাটা আর বলতে হবে না যে, সন্তানের বাবার তো একটা দায়িত্ব আছে। আমি মনে করি একজন সচেতন মা যদি স্বাবলম্বী হন তাহলে সন্তানের দায়িত্ব তার নিজেরই নেয়া উচিৎ।

আর যারা সংসার মায়ায় জরিয়ে এখন চারপাশে অন্ধকার দেখছেন, তারা হতাশ না হয়ে ঘুরে দাঁড়ান। নিশ্চয়ই পারবেন। কারন পৃথিবীতে সব প্রানীর রিজিকের দায়িত্ব স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার উপর ন্যস্ত। যার যার নিজের রিজিকে সে বেঁচে আছে। সুতরাং সাহস সঞ্চয় করে আর নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাড়াতে চেষ্টা করুন। দেখবেন আল্লাহ একটা না একটা রাস্তা ঠিকই দেখিয়ে দিয়েছেন।

সালমা তালুকদার, কবি ও সাহিত্যিক,
স্পেশাল এডুকেটর
২২/১১/২০২০

আরও পড়ুন