যেভাবে বললে সঙ্গে সঙ্গে শিশু কথা শুনবে

তানিয়া হাসান 

এমন মা বাবা বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না যারা এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হননি যে, সামান্য একটা কাজ করার জন্য শিশুকে বলার পর কাজটা করা তো দুরের কথা, আপনার নির্দেশ শুনেছে কিনা সেটাও বোঝার উপায় নাই কারন, আপনি বার বার বলছেন তবুও নড়াচড়ার লক্ষণ নেই।
বার বার বলার পরও যখন কথা শোনে না, তখন মা বাবাদের এমন মনে হতে পারে যে, বাচ্চার উপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণই নাই- – – সন্তানের চোখে আপনার জন্য কোনো রকম ভক্তি শ্রদ্ধা নাই- – – আপনাকে একেবারেই কেয়ার করে না। আপনার মনে হতে পারে, এমন কি ভুল শিক্ষা দিলেন যে আপনার সন্তান এমন আচরণ করে?
প্রশ্ন হচ্ছে কেন আপনি বলার সঙ্গে সঙ্গে কথা শোনে না;
বার বার ঘ্যান ঘ্যান করাঃ যখন আপনি বারবার একই কথা বলতে থাকেন, অজান্তেই আপনি শিশুকে এই ম্যাসেজ দিচ্ছেন যে, একবার বলার সংগে সংগে কথা শোনার প্রয়োজন নাই, তাই আপনি বার বার বলছেন। মনে করুন, স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে আপনি সন্তানকে স্কুলের ইউনিফর্ম পরে নিতে বলেছেন, যখন কাজটা করল না তখন আরেকবার অনুরোধ করলেন, তাও শুনল না – – – এবার গলার আওয়াজ উঁচু করলেন রাগী গলায় আদেশ করলেন- – -না তাতেও কাজ হলনা।

 উঁচু আওয়াজঃ যখনই গলার আওয়াজ সপ্তমে উঠাবেন আপনার সন্তান ধরে নেবে শান্ত স্বরে যখন কোনো কথা বলবেন, সেটা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। একই রকমভাবে যখন ওকে হুমকি দিচ্ছেন- – -ও ধরেই নেবে বার বার হুমকি দিচ্ছেন এর অর্থ হচ্ছে এটা ফাঁকা বুলি। কেন ও আপনি বলার সংগে সংগে শুনবে যখন ও জানেই যে, আপনি এক কথা অসংখ্য বার বলবেন?

যখন শিশু উপায়হীনঃ অবশেষ যখন শিশু বুঝবে যে, এবার কথা না শুনলে উত্তম-মাধ্যম জুটবে তখন বাধ্য হয়ে কথা শুনবে – – -কারন ও বুঝতে পারছে এবার আপনি সত্যিই রেগে উঠেছেন- – – আর ওর মনে বদ্ধমূল ধারনা হয়ে যাবে, চিৎকার করে হুমকি ধমকি না দেয়া পর্যন্ত গা করবার দরকার নেই।

আপনি রেগে উঠলেই মেজাজ হারাবেন খুব স্বাভাবিকভাবেই, সন্তানের সাথে তিক্ততা সৃষ্টি হবে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি না করে বরং নিচের কৌশলগুলো শিখে নিন;

১। শিশুর সম্পূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণ করুনঃ

শিশুরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা এমনই মগ্ন থাকে যে, সে হয়ত বুঝতেই পারে না তাকে কিছু বলা হচ্ছে। দুর থেকে চিৎকার করে হুকুম না করে ওর কাছে যান, একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন যতক্ষণ না ওর নিজের কাজটা শেষ হয়। ওর কাঁধে হাত রাখুন, ওর চোখের দিকে তাকান, যখন বুঝবেন ওর সম্পূর্ণ মনোযোগ আপনারই দিকে তখন ওকে আপনার কথা বলুন। চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বললে, শিশু চাইলেও ভান করতে পারবে না যে, আপনার কথা ও শুনতে পায়নি।

২। কাজটা করতে ওকে সাহায্য করুনঃ

যখন দেখলেন শোনার পরও কাজটা করতে গড়িমসি করছে, তখন ওর সংগে সংগে নিজেও কাজটা করতে থাকুন। শিশু হয় আপনার সাহায্য নেবে নাহয়, নিজেই করতে শুরু করবে- – কারন এখন ও বুঝে যাবে যে, আপনার আদেশ না শুনে ওর অন্য কোনো পথ নাই।

৩। ধীরে— – — ধীরেঃ

যখন শিশুকে কিছু করতে বলা হয়, মা বাবারা আশা করেন যে বলার সংগে সংগেই যেন তাদের হুকুম তামিল হয়ে যায়- – – একবারও ভেবে দেখেন না যে, পূর্ণবয়স্ক মানুষের তুলনায় শিশুর কচি মাথায় যে কোনো ইনফরমেশন প্রসেস হতে অনেক বেশি সময় লাগে।তাই, যখনই শিশুকে কিছু করতে বলবেন; প্রথমে ওর নাম ধরে ডাকুন একটু বিরতি দিন- – – ওর চোখের দিকে তাকান, শান্ত এবং কোমল স্বরে আপনার বক্তব্য বলুন- – – কিচ্ছুটি না বলে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকুন যতক্ষণ না আপনার কথা শুনছে। চুপ করে থাকার অর্থ কথাটার গুরুত্ব অনুধাবন করার সুযোগ দেয়া- – ও বুঝতে পারবে যে, আপনি আশা করছেন কাজটা ও করবে।

৪। লম্বা ইন্সট্রাকশন না দিয়ে অল্প অল্প করে দিনঃ

শিশুকে একসঙ্গে একগাদা কাজ করার হুকুম না দিয়ে, কয়েক বারে কাজগুলো করার নির্দেশ দিন- – – খেলনাগুলো একটা একটা করে বক্সে রাখো- – -বইগুলো সব টেবিলে রাখতে হবে- – – জুতা কাপর জায়গামতো- – – তারপর হাতধুয়ে খেতে এস।

৫। আদেশর সুরে নয় অনুরোধ করে বলুনঃ

লম্বা আদেশ না দিয়ে একই কথা অনুরোধের স্বরে ছোট করে বলুন, এতে শিশুর মনে রাখতে এবং ফলো করতে সুবিধা হয় তাকে কি করতে বলা হয়েছে। যেমন, আপনি হয়ত চান প্রতিবার খাওয়া হয়ে গেলে প্লেটটা এনে বেসিনে রাখবে তাহলে, আপনি নিজের প্লেট নিয়ে বেসিনের দিকে যান এবং শিশুকে এভাবে বলে দেখুন, “তোমার প্লেট।” ছোট এবং নির্দিষ্টভাবে বলা কথা শিশুর পক্ষে বুঝতে এবং ফলো করতে সহজ হয় ।

৬। নির্দেশ দিন এবং শুনতে বাধ্য করুনঃ

কখনও কখনও এমন হয় যে শিশু আপনার আদেশ শুনতে পেয়েছে, কিন্তু ভালমতো বুঝে উঠতে পারেনি যে আসলে ওকে ঠিক কী করতে বলা হয়েছে। ওকে শেখান ডাকলে উত্তর দিতে হবে— – – “জী মা,” বা “শুনেছি,” খুব ছোট্ট উত্তর এবং সহজ মনে রাখা যায় এমন কিছু। ওকে কয়েকবার প্র্যাকটিস করান যাতে মনে রাখতে পারে।

আসল কথা কীভাবে আপনি আপনার সন্তানকে শেখাবেন, তার উপর নির্ভর করে কথা বলার সংগে সংগে ও সেটা শুনবে কিনা। সঠিক পদ্ধতি অনুসরন করুন এতে আপনার এবং শিশুর উভয়ের সময় এবং এনার্জি দুটোই বেঁচে যাবে। আপনারা দুজনেই মেজাজ খারাপ হওয়ার হাত থেকে যেমন বাঁচবেন তেমন, আপনাদের সম্পর্কও আরও মজবুত হবে।

লেখকঃ কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট
বইঃ মনকাহন ১ম খন্ড

আরও পড়ুন