রোজায় শিশুর খাদ্য তালিকা

ডা: লুনা পারভীন

ইসলামে সাবালক হলেই শিশুদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে। বয়সটা ক্ষেত্র বিশেষে ১০ থেকে ১১ বছর বলা হয়ে থাকে। নামাজও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ১০ বছরে নাহলে প্রহারের কথাও বলা হয়েছে( নামাজ শুরুর বয়স যদিও ৭ বছর আমরা জানি)।

এত ছোট শিশু এতক্ষণ কিভাবে রোজা রাখবে এই গরমে অনেক বাবা-মাই চিন্তায় পড়ে যান। কিভাবে রোজা রাখাবেন, কি খাওয়াবেন? শুরুটা কিভাবে করবেন তাই আজ আলোচনা করবো।

কিভাবে শুরু করবেন?

১. রোজা কেন রাখা হয় , রোজার ফজিলত কি এসব গল্পের মতো করে শিশুকে বলতে হবে। বড়দের রোজা রাখা দেখলে এমনিতে বাচ্চারা সাহরী ও ইফতার খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।

২.বাসায় অন্যান্য ছোট বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও করে, কে কার চেয়ে বেশী রোজা রাখলো। বাসায় বাচ্চা না থাকলে যে বাসায় শিশুরা রোজা রাখে তাদের উদাহরণ দিতে পারেন।

৩.রোজা রাখার জন্য পুরস্কার বা পছন্দের খাবার বানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন।

৪. শুরুতে অল্প সময়ের জন্য বাচ্চাকে না খাইয়ে রেখে অভ্যস্ত করান ও আস্তে আস্তে সময় বাড়াতে পারেন।

৫. সাহরিতে শেষ দিকে ডাকবেন যেন খাবারটা পেটে থাকে, যতটা সম্ভব বেশী সময় কাটে।

৬. রোজা অবস্থায় মনযোগ সরানোর জন্য ওকে সময় দিতে হবে, কোরআন শরিফ বা দোয়া দরুদ পড়ানো, হালকা গল্পের বই পড়া, বাবা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে নামাজ পড়া, খারাপ লাগলে ঘুম পাড়িয়ে রাখা, এভাবে সময় কাটানো যেতে পারে।

৭. তারপরও যদি পেশাব কমে যায় বা বাচ্চা বেশি দূর্বল হয়ে পরে তাহলে রোজা ভেঙে ফেলতে সাহায্য করতে হবে। স্বাস্থ্য যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, সুস্থতা আগে।

কি খাওয়াবেন সাহরি ও ইফতারে?

১. সাহরীতে বাবুকে ধীরেসুস্থে উঠিয়ে মুখ ধোয়াবেন। যতটুকু খেতে পারে এমন ভাত ডাল, যথেষ্ট পরিমাণে সবজি, মাছ বা মুরগী সাথে সম্ভব হলে দুধ বা দুধভাত অথবা মিষ্টি দই দেয়া যেতে পারে। পানি খাওয়ানো না গেলে ডালের পাতলা পানি, পাতলা খিচুড়ি বা জাউ, স্যুপও দেয়া যেতে পারে সাহরীতে।

২. ইফতারে বাচ্চার খাবারে যেন পর্যাপ্ত পরিমানে পানি, তরল ও পুষ্টিকর খাবার থাকে যাতে প্রোটিন ও শর্করা যথেষ্ট থাকে। পানি, লেবুর শরবত, ঘরে তৈরী পেপে, তরমুজ বা আমের শরবত, পাকাকলার স্মুদি, মিল্ক শেক, স্যুপ, নরম করে খিচুড়ি, ফ্রায়েড রাইস, এমনকি ঘরে তৈরী সবজি বার্গার, কম তেলে ভাজা চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইও দিতে পারেন। পাশাপাশি ছোলা মুড়ি, চিড়াদই, পুডিং পায়েস, হালুয়াও দিতে পারেন। ডিম বা আলুর চপ, সবজি বড়া, কাস্টার্ডও হতে পারে বাচ্চার জন্য ভালো ইফতার।

অল্প অল্প করে বার বার পানি, শরবত খাওয়াতে হবে ইফতারের পর থেকে। সন্ধ্যা রাতের খাবারে হজম হয় এমন খাবার নরম ভাত, ডাল, মাছ বা মুরগী দেয়া যেতে পারে পরিমান মতো।

৩. রোজা রাখে না এমন বাচ্চাদের সহজে বানানো যায় এমন নাস্তা বানিয়ে দিন সকালে। আগের দিনের বাসি খাবার না খাইয়ে বাচ্চার জন্য প্রয়োজনে ২ বেলার খাবার বানিয়ে ফ্রিজে রাখুন ও নিয়ম মেনে ঠিকমতো গরম করে বাচ্চাকে খেতে দিবেন। ইফতারের ভাজাপোড়া ওদের না দেয়াই ভালো।

যেসব মায়েরা বুকের দুধ খাওয়ান তারা কি করবেন?

সুস্থ শিশুর জন্য চাই সুস্থ মা। তাই বাচ্চার সুস্থতার জন্য মায়ের খাবার নিয়েও আলোচনা করবো স্বল্প পরিসরে।

১. ৬ মাসের নিচে যাদের বাচ্চার বয়স, তাদের জন্য রোজা অত্যাবশ্যক না। চাইলে তারা পরেও রোজা রাখতে পারবেন। রোজা রাখলে খেয়াল রাখতে হবে যেন বাচ্চা পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায়। পেশাব কমে গেলে বা বাচ্চা নেতিয়ে গেলে বাচ্চার পানিশূন্যতা হচ্ছে ধরে নিতে হবে। রোজা রেখে মা বুকের দুধ দিতে পারবেন। বুকের দুধ খাওয়ানোতে মায়ের তেমন কোন পুষ্টির ঘাটতি হয় না , তবে মায়ের শারিরীক দূর্বলতার জন্য যদি বাচ্চা কম দুধ পায় তাহলে মায়ের রোজা না রাখাই ভালো।

২. ৬ মাসের উপরের বাচ্চাদের মায়েদের ক্ষেত্রেও একই কথা তবে বাচ্চা যদি বাড়তি খাবার ধরে থাকে তাহলে সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত বাড়তি খাবার ও পানি বার বার খাওয়াতে হবে পাশাপাশি মা যতটুকু পারে বুকের দুধ দিবেন।

৩. মাকে অবশ্যই সাহরি ও ইফতারে বেশী করে পানি, প্রোটিন তথা ডিম, দুধ, মাছ মাংস, ডাল ; শর্করার জন্য ভাত, আলু, ডাল বেশী করে সবজি খেতে হবে।

৪. কোনো ধরনের তেলচর্বি, ভাজাপোড়া, চা-কফি, গ্যাস তৈরী করে এমন খাবার, ঠান্ডা ও কাঁচা খাবার যেন মা না খায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে একবারে না খেয়ে বার বার একটু করে খেতে হবে যেন, সঠিক পরিমানে এনার্জি ও পুষ্টি নিশ্চিত হয়।

বুকের দুধ বাড়ানোর খাবারঃ

সবুজ শাকসবজি পাল্ং শাক,, কাঁচা পেপে, করলা, সজনে ; দুধ ডিম, মসুর ডাল, ছোলা, মিষ্টি আলু, কমলা, আঙুর, লেবু, তরমুজ, কাজু বাদাম, মেথি, জিরা, হলুদ রসুন, সামুদ্রিক মাছের ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড বুকের দুধ বাড়াতে সাহায্য করে।

কাজেই বাচ্চা যদি রোজা রাখতে সক্ষম হয় ও স্বাস্থ্য হুমকির মুখে না পরে তাহলে ১১ বছর ( মেয়েরা ১০ বছর) বয়স থেকে আপনার সন্তান রোজা থাকবে পারবে। কাজেই শিশুকে রোজা রাখতে উৎসাহিত করবেন এবং নিজেও রোজা নামাজ সরূয়ত মতো পালন করবেন।

গরম, দিনের দৈর্ঘ্য ও খাদ্যে ভেজালকে মোকাবিলা করেই রোজা রাখতে হবে। কাজেই বাচ্চাকে ধীরে ধীরে রোজা রাখানোর জন্য অনুপ্রাণিত করুন ও রমজানের পবিত্রতা বজায় রাখুন।

ধন্যবাদ।

সূত্র: লেখকের শিশর যত্নে মায়ের জিজ্ঞাসা বই থেকে

লেখকঃ  ডাঃ লুনা পারভীন
শিশু বিশেষজ্ঞ, বহির্বিভাগ
ঢাকা শিশু হাসপাতাল,শ্যামলি, ঢাকা

আরও পড়ুন