শিশুর সাথে কথা বলার সময় যা কখনও করবেন না

তৃপ্তি পোদ্দার

ফেব্রূয়ারি/ February মাসটি আমাদের জন্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা সবাই জানি, কারণ কী? সাদা কালো শাড়ি/পাঞ্জাবি, খালি পায়ে ভোর বেলায় গাঁদা ফুল নিয়ে শহীদ মিনারে যাওয়া, গান গাওয়া, এই প্রতীক গুলোর অর্থ হলো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ আজ আপনি অথবা আমি আমাদের স্মৃতি থেকে কত কি বলছি আমাদের সন্তানকে? কিন্তু আমাদের সন্তান পারবে তো তার সন্তানকে এই ভাবে স্মৃতি চারণ করতে।

আমি মাঝে মাঝে আপনাদের প্রশ্ন করি জানার জন্য আপনারা কতটুকু জানেন এবং কতটুকু তথ্য আমি আপনাদেরকে দিবো?  এই লেখাটির সাথে আরও নতুন তথ্য যোগ করে দিতে চাইলে কমেন্ট বক্সে দিয়ে জানাবেন, অনুরোধ রইল। কিছু দিন পূর্বে একটি পোস্টে দুটি প্রশ্ন করেছিলাম।

প্রথমটি ছিল, শিশু লিখতে পারে তা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আপনার মতামত। দ্বিতীয়টি ছিল, শিশু কথা বলতে পারে তা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আপনার মতামত। আজ আমি দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়ে লিখবো, ‘শিশুর কথা বলা।’

শিশুরা কথা বলতে পারে এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপনারা অনেকে অনেক মতামত দিয়েছেন। কিছু উদাহরণ আমি বিশ্লেষণ করার জন্য উল্লেখ করছি। আপনাদের কারো নাম উল্লেখ করা হচ্ছে না। এরপরও যদি কারো আপত্তি থাকে, আমাকে জানাবেন। আমি মুছে ফেলবো।

কথা বলা বলতে মুখের ভাষাকে বোঝানো হয়, যার মাধ্যমে আপনার সন্তান আপনার সাথে এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে । একটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, ৩ বছর বয়সী শিশুর পিতামাতা এক ঘন্টায় ৩৪ থেকে ৭৮৩ টি শব্দ বলে থাকেন। এর অর্থ হচ্ছে একটি শিশু এক বছরে ২৫০ হাজার থেকে ৪ মিলিয়ন পর্যন্ত উচ্চারিত ভাষা পরিচর্যাকারীর মুখ থেকে শুনে থাকে। কম শব্দ অর্থ হলো প্রতি ঘন্টায় সবকিছুর কমতি, যেমনঃ প্রশ্ন করা, ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা ইত্যদি।

শিশুর সাথে কথা বলতে গেলে যে কাজগুলো কখনই করা উচিত নয়-

• শিশুর কথা বলার সময় থামিয়ে দেওয়া যাবে না। আপনি হয়তো আপনার সন্তানের অনেক কথাই বুঝতে পারছেন না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আপনি তাকে বলবেন, চুপ করো, কথা বলো না। একজন বাঙালি অভিভাবক জানিয়েছেন তার ছোট শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে ‘দারুণ কথা বলতে পারে। ২ বছরের থেকেই বুদ্ধি খাটিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিত। বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করতো, যার উত্তর দিতে হিমশিম খেতাম। ৩য় শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণির বিজ্ঞান বই পড়তে হয়েছিল সহজ করে উত্তর দিতে। গুগল ঘাটতাম।এখনো প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাই। কবিতা, গান, গল্প সব কিছু হুবুহু মনে রাখে এবং পুনরায় বলতে পারে। এখন বয়স ৪ বছর ৫ মাস।’

• শিশু কথা বলতে আসলো, আপনি পরে বলতে বলে তাকে সরিয়ে দিলেন। আপনি আপনার সন্তানকে গুরুত্ব না দিয়ে আপনার কাজটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর ফলে শিশুর মনে খুব ক্ষতিকর প্রভাব পরে। শিশুর বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। একজন বাঙালি অভিভাবক জানিয়েছেন তার ছোট শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে ‘২১ মাস বয়স থেকে বাক্য বলতে পারে, তার চেয়েও ছোট যখন ঘুম পাড়াতাম ছড়া,কবিতা বলে, প্রতি লাইনের শেষ শব্দটা বলে দিত। এখন মেয়ের বয়স সাড়ে তিন বছর।গুছিয়ে বড় বড় বাক্য বলতে পারে। ইংরেজি,বাংলা অনেকগুলো কবিতা পারে।’

• শিশু যখন কথা বলতে শুরু করে তখন অনেক বেশি ভুল বলে এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা থেকে ভালো শব্দ সমূহ না শিখে খারাপ শব্দ সমূহ তাড়াতাড়ি শিখে ফেলে। সেক্ষেত্রে যদি আপনি চিৎকার, ধমক দিয়ে নতুন শেখা শব্দ (খারাপ শব্দ) বলা থেকে বিরত রাখার চিন্তা করে থাকেন তাহলে সেক্ষেত্রে এটাও মাথায় রাখবেন, আপনার শিশু পরবর্তীতে নতুন শব্দ শিখলেও কিন্তু তা আপনাকে বলবে না। সুতরাং আপনি চিৎকার না করে, ধমক না দিয়ে পরবর্তী সময়ে বুঝিয়ে বলবেন যে এই নতুন শব্দটির অর্থ ভালো না।

• শিশুর প্রতিটি কথার মূল্যায়ন করতে হবে। সেটা স্পষ্ট বা অস্পষ্ট যাই হউক না কেনো। একজন বাঙালি অভিভাবক  জানিয়েছেন তার ছোট শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে ‘খুব বেশি চিন্তা করতাম না ছোট থাকতে বাবু। ওর সাথে কথা বলতাম যতটুকু প্রয়োজন, তারপর যখন বাবুর ১বছর ৫ মাস পড়েছিলো তখন সে দুইটা করে জোড়া দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতো, আমি শুধু কোনটা কি এগুলো জানাতাম আর সাথে সাথে কথা বলতাম। আলহামদুলিল্লাহ ৩ বছর সব কথা ঠিক ভাবে বলতে পারে। তাই বলবো বাচচার সাথে সাথে সঙ্গী হয়ে কথা বলতে থাকলে একাই কথা শিখবে।’

শিশুর সাথে আহ্লাদিত ভাষায় কথা না বলা, যদি ও আমাদের অনেকেরই ছোট বাচ্চাদের সাথে আধো আধো করে কথা বলতে ভালো লাগে। আধো আধো বুলি শিশু বড়দের কাছ থেকে শুনলে, শিশুর আধো আধো ভাষা অনুকরনের মাধ্যমে শিশুর ভাষা বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে। একজন মা জানিয়েছেন, ‘শিশুর সাথে আহ্লাদিত ভাষায় কথা না বলাই ভালো। আধো আধো বুলি শুধুমাত্র শিশুর মুখেই মানায়। ওর সাথে ওর মতো কতা বললে ওর শুদ্ধ এবং কথা পরিস্কার হতে সময় বেশী লাগে বলে আমার মনে হয়।’

• গর্ভকালীন সময় থেকে ছোটদের গল্পের বই পড়ুন এবং জোরে জোরে পড়ে শোনান। “Reading to your unborn baby is a wonderful way to both bond and de-stress, plus, it’s really good for your baby’s development and brain. … Talking and reading while pregnant, therefore, can give your baby a foundation for language development.’

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শিশু মাতৃগর্ভে ১০ সপ্তাহের থাকাকালীন সময় থেকে ভাষা absorb/গ্রহণ করা শুরু করে। একজন বাঙালি অভিভাবক জানিয়েছেন তার ছোট শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে ‘আমার ছেলের বয়স ১২ মাস চলে।একটু একটু মেধার বিকাশ হচ্ছে।’  .

শিশুর ভাষা গ্রহন/absorb শুরু করে মাতৃগর্ভে ১০ সপ্তাহ থাকাকালীন সময় থেকে, জন্মের পরবর্তী সময় থেকে ৩ বছর এবং পরবর্তীতে ৪ থেকে ৫ বছর বয়স শিশুর জীবনে একটি সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ সময়। শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের যাত্রা এখন থেকে শুরু হয়। শিশুর উচ্চারণে, ভাষা বলায় এবং যোগাযোগ স্থাপন করতে যদি ভালোভাবে সক্ষম না হয় তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও অন্যান্য সব ধরণের শিক্ষা থেকে সে পিছিয়ে পরবে কারণ ভাষা একটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে, নিজের ভাব প্রকাশ করতে সাহায্য করে।

ভাবুন তো, আপনার অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু আপনি প্রকাশ করতে পারছেন না কারণ আপনার মুখ কেউ আটকে দিয়েছে। শিশুটির ও ঠিক তেমন ভাবে কষ্ট হয়, হয়তবা বেশি হয় কারন ওতো অনেক কিছু শিখছে পরিবেশ থেকে, পরিবেশ শিশুর ভাষা শেখার একটি বৃহৎতম মাধ্যম। কোন ভাষায় শিশু কথা বলবে তা পরিবেশ নির্ধারণ করে। তাই তো বাঙালি মা যখন লন্ডন থাকে, তখন বাঙালি মায়ের ছেলেরা ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে, মনের ভাব প্রকাশ করতে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকে।

• শিশুর ভালো শিখনফল পেতে হলে শিশুর সঠিক বয়সে ভাষার বিকাশ দরকার, অন্যথায় শিশু শিক্ষন শিখন প্রসেসে সেন্সরি ওভার স্টিমুলেশন অথবা আন্ডার স্টিমুলেশন হতে পারে (এটি নিয়ে আমার একটি ভিডিও আছে ) প্রয়জন হলে দেখতে পারেন। শিশুর ভাষা বিকাশে কিভাবে সাহায্য করবেন এই বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক গুলো ভিডিও করেছি, দেখলে উপকৃত হবেন।

• শিশুর আচরণগত ত্রূটি দেখা দেবে, সবার কাছ থেকে দূরে সরে আসবে, নিজেকে গুটিয়ে নেবে। কারণ শিশু খুব সহজে বুঝতে পারে তার কোনটি ভালো লাগে বা কোনটি খারাপ লাগে।

এই মাসটিতে আসুন আমরা সবাইকে জানাই, সবাইকে বলি, শিশুর ভাষা বিকাশ বা কথা বলা কতটা গুরুত্ব। ভাবুনতো, আজ আপনি আপনার স্মৃতি থেকে কত কি বলছেন আপনার সন্তানকে কিন্তু আপনার সন্তান পারবে তো তার সন্তান কে এই ভাবে স্মৃতিথেকে স্মৃতি চরণ করে বলতে, এমনটা জেনে হয়! তাই আমার এই আনাড়ী হাতে টাইপ করে লেখা টি আপনাদের জন্য। ভালো থাকবেন। মাতৃভাষা হোক শিশুর ভাষা শিক্ষার প্রথম মাধ্যম। সবাই কে এই তথ্য গুলো শেয়ার করুন এবং বলুন মাতৃগর্ভ থেকে শিশু ভাষা গ্রহণ করে।

লেখক:আর্লি ইয়ার্স এক্সপার্ট,লন্ডন, ইউকে

আরও পড়ুন