শিশুর সেন্সরি ডায়েট

তৃপ্তি পোদ্দার

সেন্সরি ডায়েট বলতে আসলে কি বোঝায় ? এবং একজন মা বাবার কতটুকু জানা দরকার। আমি সেন্সরি ডায়েট এর কথা বলছি আপনি ঠিকই পড়েছেন, আমি ব্যালান্স ডায়েট এর কথা বলছি না। শিশুর ভালো শারীরিক গঠনে যেমন ভালো সুষম খাবার দরকার ঠিক তেমনি শিশুর বিকাশে দরকার সঠিক সেন্সরি ডায়েট। বৃদ্ধি ও বিকাশ দুটি ভিন্ন বিষয়। বৃদ্ধি শারীরিক আর বিকাশ হলো শরীরের সক্ষমতাকে কাজে লাগাবার মানসিক প্রবণতা। প্রারম্ভিক শৈশবে শিশুর বৃদ্ধির প্রতি আমরা যতটা যত্নশীল ততটা বিকাশের প্রতি নই। কিন্তু দুটি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটিকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া না হলে বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় এবং শিশু অস্বাভাবিক মানসিক প্রবণতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে মানসিক বিকাশের জন্য আমরা কি করতে পারি; আজ এই বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলবো।
সেন্সরি হলো আমাদের সেন্স অর্থাৎ আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয়: দেখা হলো ভিজ্যুয়াল সিস্টেম, শোনা হলো হিয়ারিং সিস্টেম, টেস্ট বা গস্ট্যাটরি সিস্টেম, স্মেল বা ওলফ্যাক্টরি সিস্টেম এবং টাচ বা ট্যাক্টিল সিস্টেম। আমরা অনেকেই জানি না যে আমাদের মুভমেন্ট হলো ভেস্টিবুলার এবং ব্যালান্স রাখার ক্ষমতা হলো প্রোপ্রাইওসেপ্টিভ সেন্স। এই সেন্সগুলো শিশুর পরিচর্যার উপর কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, মা বাবা অথবা পরিবেশ থেকে শিশু এই বিকাশ ধীরে ধীরে অর্জন করে। শিশুর জন্মের পর প্রথম বছরগুলো তার বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। তবে শিশুর প্রথম পাঁচ বছর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ।এ সময়ে শিশুর মস্তিস্ক নমনীয় থাকে এবং দ্রুত বিকশিত হয়। শিশুর ভালো ও খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো মস্তিস্কের বৃদ্ধির ওপর কড়া প্রভাব ফেলে। এই সময়ে অবহেলা বা নির্যাতন শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি, আচরণ ও আবেগের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করে। শিশু যেমন তাচ্ছিল্য পেলে নিজেকে দূরে সরিয়ে দেওয়াটা খুব সহজেই গ্রহণ করে । ঠিক তেমনি ভালো আচরণ পেলে তাদের কাছে যেতে চায়, খেলতে চায় । আমরা হয়তোবা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো শিশুরা শিশুসুলভ আচরণ বেশি পছন্দ করে এবং যাদের মধ্যে এই শিশুসুলভ আচরণ রয়েছে তারা শিশুদের সাথে বেশ তাড়াতাড়ি মিশতে পারে এবং খুব সহজেই প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠে।

সেন্সরি প্রসেসিং আসলে কি? সেন্সরি প্রসেসিং হলো আমরা পারিপার্শ্বিকতা থেকে এই ইন্দ্রিয়গুলোর মাধ্যমে তথ্য নিয়ে থাকি এবং ব্রেন এই তথ্যগুলো সংযোগ করে। অনেক সময় তথ্যগুলো ব্রেইনে যাচ্ছে কিন্তু প্রক্রিয়া করে সঠিক কাজটি করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে । এই বাধাগ্রস্ত হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে- একটি হতে পারে সেন্সরি সিকিং এবং অন্যটি হতে পারে সেন্সরি এভোইডিং। শিশুর সেন্সরি সিকিং হলো, এই ধরণের শিশুরা শক্ত করে ধরে বা খুব জোরে ধরে যাতে করে তাদের শারীরিক অবস্থান এবং প্রেসার বুঝতে পারে আর সেন্সরি এভোইডিং শিশুরা হলো এই সব ধরনের কাজ থেকে এড়িয়ে থাকবে। সেন্সরি সিকিং শিশুরা আন্ডারসেনসিটিভ অথবা হাইপোসেন্সিটিভিটি থাকে, তারা সেন্সরি স্টিমুলেশন/উদ্দীপনা বেশি খুঁজে বেড়ায়। অন্যদিকে সেন্সরি এভোইডিং হলো ওভারসেন্সিটিভ বা হ্যাপারসেন্সিটিভিটি, এই ধরনের শিশুরা আলো ও শব্দে অস্থির হয়ে ওঠে, এছাড়াও অনেক ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে।

অবশ্যই সেন্সরি প্রক্রিয়াকরণ প্রক্রিয়াটি একটি শিশুর অন্য একটি শিশুর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে এবং একই তথ্য দিলেও এক একটি শিশু এক একভাবে তথ্যগুলি প্রসেস করবে সঠিক উত্তর বা সমাধানটি দেবার জন্য । ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে শিশু সেন্সরি গ্রহন করে এবং সমাধানের পার্থক্য করে থাকে।আমাদের ব্রেন সবসময় আমাদের এই সেন্সগুলো থেকে তথ্য নিচ্ছে , এই তথ্যসমূহ নিয়ে প্রসেস করা সবসময় সমস্যা না ও হতে পারে, কিন্তু প্রকাশ করা বা বলা বা করে দেখানো শিশুর জন্য এক একটি পরীক্ষা পাশের মতো, সব শিশুর উত্তর দেওয়ার বা ভাব প্রকাশের ধরন এক নয়। এই ধরনের শিশুরা পড়াশুনা বা একাডেমিক অংশগ্রহনের সাফল্য থেকে পিছিয়ে পড়ে, অনেক সময় তাদের এই অপারগতা অভিভাবক না বুঝে অনেক ধরনের মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন করে থাকেন। আসলে শিশুটির বয়স যখন ৫ বছরের নিচে ছিল তখন শিশুর সেন্সরি বিকাশের জন্য তেমন কোন একটিভিটিস করানো হয়নি অর্থাৎ সেন্সরি ডায়েটটি ঠিক মতো হয়নি, তাই শিশুটি অস্থির, মনযোগী নয়, বা মনে রাখার ক্ষমতা অনেকটা কম । আবার অনেকক্ষেত্রে শিশু একটি দক্ষতা খুব ভালো অর্জন করেও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যদি অভিবাবক শিশুটিকে ৫ বছর পূর্বে সেন্সরি ডায়েটটি ঠিক মতো পরিচালনা করিয়ে থাকেন। আপনি ভাবছেন কিভাবে আমি সেন্সরি ডায়েটটি পরিচালনা করবো, শিশুর সেন্সরি ডায়েট এককথায় বা এক বাক্যে আমি বোঝতে পারবো না কিন্তু আপনি শিশুকে দিয়ে তার শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি যদি বিকাশের প্রতি একটু লক্ষ্য রাখেন তবেই সম্ভব সেন্সরি ডায়েটটি ঠিক রাখা। আমি আমার প্রতিটি ভিডিওতে আপনাদের এই সম্পর্কিত তথ্য দিচ্ছি কিভাবে আপনার শিশুকে তার শিখন জটিলতা থেকে রক্ষা করবেন, উন্নত বিশ্বে আমরা শিশুর শিখন শিক্ষন পরিপূর্ণ ও সফলতা পাবার জন্য কয়কটি কৌশল অবলম্বন করি যা অন্নুনত বা উন্নয়নশীল দেশে ব্যয়বহুল। শিশুর দেরীতে কথা বলা, অমনোযোগী হওয়া, খুব সহজেই অনুভূতি প্রকাশ করা যেমন ধরুন কেঁদে ফেলা বা কারণ ছাড়া অন্য শিশুর সাথে মারামারি করা বা আচরণগত ত্রূটি, অল্পতেই বলে ফেলা ‘আমি পারবো না’ বা কাজটি শেষ হওয়ায় আগেই তার আগ্রহ শেষ হয়ে যায়, শুরুতে প্রচুর আগ্রহ কিন্তু কাজটি আর শেষ করতে পারছে না বাহানা তৌরী করে চলে যাওয়ার প্রবনতা, ৬/৭ বছর বয়সে প্রচুর কথা বলা, শিশুর খাবারে উৎসাহী না হওয়া, একই খাবার খেতে পছন্দ করা, খুব বেশী কথা বলতে চাওয়া কিন্তু বলতে না পারা, সে যেটা করতে চায় সেটি না করতে পারলে অস্থির হয়ে উত্তেজিত হওয়া, কলম ঠিক মতো ধরতে না পারা, খুব সহজেই মনোযোগ ভেংগে যায় এবং মনোযোগী হতে সময় লাগে, পড়ছে কিন্তু মনে রাখতে পারছে না,এই ধরণের কারণগুলো সৃষ্টির একটি মূল কারণ হয় সেন্সরি ডায়েটটি সঠিক বয়সে পরিচালনা করা হয়নি, এ ক্ষেত্রে সব শিশুর জন্য কিন্তু একই ধরণের শিখন শিক্ষন কার্যক্রম প্রযেজ্য নয়, তাই এমন কারো কাছে শরণাপন্ন হবেন না যাতে আপনার শিশুর উপকার না হয়ে শিশু আরো ঘাবড়ে যায়। শিশুকে বকাবকি বা কথা না শুনিয়ে বা আপনার ভাগ্যের উপর দোষ না দিয়ে শিশুর অপারগতাকে বুঝে তার শিখন শিক্ষনে সাহায্য করা প্রতিটি অভিভাবকের কর্তব্য। সব লক্ষণ যে একটি শিশুর মধ্যে থাকবে তা কিন্তু ঠিক নয় আবার ২/৩ টি লক্ষণ ও একটি শিশুর মাঝে বিদ্যমান থাকতে পারে, তবে মনে রাখবেন, সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার কিন্তু অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার নয় কিন্তু প্রতিটি অটিস্টিক শিশুর সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার থাকবে, হতে পারে হাইপার অথবা হাইপোসেন্সিটিভিটি। আপনার শিশু আপনার, সমাজের, জাতির এবং দেশের।

লেখকঃ শিশু শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, লন্ডন, ইউকে

আরও পড়ুন