সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-৩)

নুরে আলম মুকতা

আজ একটি ছোট গল্প দিয়ে শুরু করি বন্ধু। আমার আম্মার একজোড়া স্যান্ডেল কেনার পর দোকানী বললেন, স্যার স্যান্ডেল জোড়া চারিদিকে সেলাই করে নিলে টিকবে বেশি দিন। এত দাম দিয়ে কিনে আবার সেলাই করতে হবে? তারপরও ভেবে দেখলাম। মন্দ নয় পরামর্শ। যদি কদিনেই নষ্ট হয়ে যায়। ছোট প্রাণ কষ্ট পাবে। দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আমার পরিচিত ফুটপাথের দিকে। আমরা কোনদিন কি ভেবে দেখেছি আমাদের এক মুল্যবান পরিচ্ছেদের মহারক্ষক ফুটপাথে দিন গুজরান করেন ?

চকচকে জুতো জোড়া নয়তো স্যান্ডেল রক্ষণাবেক্ষণের কারিগর কমে যাচ্ছে চারিদিকে আজকাল। কদিন পর ইচ্ছে করলেও আর আপনার প্রিয় জুতো জোড়া মেরামত করার লোক পাবেন না। ফেলে দিতে হবে। আমি তো অবহেলায় পড়ে থাকা পুরোনো চটি জোড়ার দিকে অবলিলায় চেয়ে থাকি। তুলে এনে রাখি সযতনে। জানি গৃহ তত্বাবধায়ক মহীয়সীর কিছু ভৎর্সনা আমার ভাগ্যে আছে । তারপরেও করি। জুটেও কিছু বকবকানি । আমি বেচারা মুচকি হাসি ছাড়া কি আর দেবার আছে তাঁকে ? মা সহ গেলাম আমার কাঙ্ক্ষিত দাদাবাবুর কাছে। লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আমি হাতজোড় করে নমস্কার করলাম। উনিও দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু কোমর সোজা করতে পারলেন না। সারাদিন ঝুঁকে বসে কাজ করে আর সোজা হতে পারেন না। গলায় চন্দন কাঠের মালা। মুখে সদা হাসি। আম্মা আমাদের এরকম নমস্কার বিনিময় দেখেনি এর আগে কোনদিন। এ দোকানে ও আমার সাথে প্রথম। অন্য সব কাজ ফেলে দাদা আমাদের কাজ সারতে শুরু করলে আমরা অন্য জরুরত সারতে গেলাম। আমি আর তখনি মাকে কিছু বললাম না।

এদিক ওদিক একটু ঘুরে ফিরে এলাম দাদার কাছে। দীর্ঘ শরীর, গায়ের রং ফর্সা। দাদা জাতপাতের ধার ধারেন না। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে চলছি বলে দাদার পরিবার সম্পর্কে বেশ জেনেছি আমি। আর্যের ছাপ আছে দাদার দেহে, নৃবিজ্ঞান তাই বলছে।
মায়ের স্যান্ডেল নেয়ার সময় অভূতপূর্ব ঘটনার অবতারনা হলো । আমি যেহেতু মাকে সাথে নিয়ে গিয়েছি পারিশ্রমিক নেয়ার বিষয়ে ঘোর আপত্তি দাদার। এবার আমি বেকায়দায়। দাদা এমন একটি কথা বলে দিলেন, যেটি শোনার প্রস্তুতি আমার ছিলো না।

আমি কি মায়ের কাছে আমার শরীরের মজুরী নেবো গো দাদা! এত অধম আমি? এ টাকা আমি মায়ের সামনে নিতে পারবো না। মায়ের গর্ভের কসম , মা তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো। ছোট্ট শিশু বিস্মিত !

তোমাদের দুধের দাম আমি শোধ দিতে পারবো না মা । পুনর্জন্ম হবে কিনা জানিনা। মানুষ নাও হতে পারি। এ জনমে অনেক ভুল করেছি। আর ভুল করতে চাই না। দাদা মায়ের দিকে হাত জোড় করে ফরিয়াদির মতো। শিশু সহ আমি বিস্মিত ! আমার কথা সরছে না। বাকরুদ্ধ হয়ে মারাত্নক অপরাধবোধ আমাকে জর্জরিত করতে শুরু করেছে। আমি আফসোস করছি কেন মামুনিকে আমি সাথে এনেছি? আমার সৎ উদ্দেশ্য তুমি সফল করো আল্লাহ। মূহুর্তে দোয়া করতে শুরু করলাম।

মা আমার দুজনের দিকে দেখে কিছুই বলতে পারছে না। আমি বললাম,আম্মা ইনি তোমার কাকাবাবু হন। তুমি একবার অনুরোধ করোত। মা কথা বলে উঠলে আমারা দুজনই অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। রাস্তার অসংখ্য মানুষের অগোচরে ঘটেছিলো অবিস্মরণীয় বিষয়। ছোট্ট মা বলেছিলো, কাকা আপনি দয়া করে টাকা নেন। আব্বু কষ্ট পাবেন। আপনার রোদে অনেক কষ্ট হচ্ছে। বাড়িতে তো কেউ অপেক্ষা করছে আপনার রোজগারের জন্য। শেষ পর্যন্ত দাদা টাকা নেননি। কিন্তু আমি শান্তি পেয়েছিলাম ভিন্ন কাজ করে । ওটা এখানে না বলাই শ্রেয়।

পেশা আর মানুষের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা বাড়ানোর সুযোগ আমাদের যাপিত জীবনে যথেষ্ট পাওয়া যাবে। আমরা তো আর রাজা বাদশাহ না যে দূত পাঠিয়ে দরবারে ডেকে আনবো। হাঁটে ঘাটে মাঠে চলতে চলতে মানুষ পেয়ে যাবো। কুশল বিনিময় করে কথা বললেই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ জন্মাবে।

আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তান আর যাই হোক অমানুষ যেন না হয়ে যায়। আমি চেষ্টা করি বন্ধু। আপনারাও চেষ্টা করে দেখুন দয়া করে। চেষ্টা করুন। আপনার সন্তানের মানবিক গুণাবলি বিকশিত হবে। পাল্টে যাবে ওর আচরণ। সকল শ্রেনী পেশার মানুষের প্রতি আমাদের সন্তানের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা তৈরি হলে বাবা মায়ের প্রতিও ভালোবাসা বেড়ে যাবে।

(চলবে)

আগের পর্ব-সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-২)

লেখক: সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

 

আরও পড়ুন