সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-৫)

নুরে আলম মুকতা

তুই একদম বাদ, তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তুই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ। গেলি,না কি….. আরো আরো কিছু। এগুলো সন্তান সন্তত্তিদের সাথে আমাদের প্রাত্যহিক কথা বার্তা! নিজের ঔরষজাত কিংবা গর্ভের সন্তানকে এগুলো বলবেন? পরের কোন ব্যক্তি, বন্ধু বা স্বজনদের কাউকে এমন করে বললে কি প্রতিক্রিয়া হবে ভেবে দেখুন দয়া করে। প্রিয়তম সন্তানেরা আপনার ওপর একদম নির্ভরশীল বলে ওরা সহ্য করে। সহ্য করতে বাধ্য হয়।
জীবনাচারে আমাদের নিজেদের কতটুকু শুদ্ধি দরকার ? আমরা নিজেরা কতটুকু মানুষ হয়ে উঠেছি বিষয়টি আগে নিয়ে আসতে হবে।

প্রিয় বন্ধু আজ চলুন আমাদের সম্বোধনের বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক। আমি আমার শ্যালক শ্যালিকাদের তুই তোকারি সম্বোধন করি। কেন করি একটু জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে মনে হয়। নিজেই শোধরালাম না। আর লোকজনকে কিছু বলবো এটি আমাদের বিধানে নেই। মহানবী সাঃ এর মিষ্টি খাবার গল্পটি আমরা সবাই জানি। আমি একটি বিষয় সবসময় মেনে চলি যে , আমার লেখায় যেন কোন পাঠক বন্ধুকে শিক্ষা দেয়ার মতো কিছু না ঘটে। কারণ আমি তো শিক্ষা দেয়ার কেউ যোগ্যতা সম্পন্ন না। আমি শুধু আলোচনা করতে পারি। নিজেকে শেয়ার করতে পারি। সুযোগ আছে হাত পা গুটিয়ে বসে না থেকে কাজে লাগাই। এমন তো হতে পারে কেউ উপকৃত হলেন। আমি দোয়া পেয়ে গেলাম। যা বলছিলাম, তুই তোকারি কেন করি ? শ্যালিকাদের সাথে দারুন একটি বৈধ ঠাট্টার সম্পর্ক আমি অর্জন করেছি ওদের বোনকে বিয়ে করার সাথে সাথে। আগে কত মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম উদাস দৃষ্টিতে! কাছে ঘেষতেও দিলো না।

বিয়ে করার পর দেখেন কি মজা! একটিতে ডুব দিয়েছি অমনি মায়ের পেটের, চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো আর চুলে চুলে জোড় দেয়া কত্ত সব হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আপনার সেন্সেটিভ জায়গাগুলো স্পর্শ করছে। এ যেন চাঁদের হাটে ডুব দেয়া। বাবা মায়েরা বাঁধা দিচ্ছেন না। বিস্ময়! আসলে এবার আমি সামাজিকভাবে যৌন সম্পর্ক অর্জন করেছি বলে এ অবস্থা। সামাজিক মনস্তত্ত্বটি দেখেছেন? আগে এরকম হলে কি হতো? অবৈধ কোনকিছু ঘটে যেতো বা ঘটতে পারতো। প্লেটোনিক লাভ আমরা যেগুলো বলি তার চেয়ে অনেক বেশি শ্যালিকা দুলাভায়েরা হালালভাবে করেন। কিন্তু সাবধান! মাত্রাতিরিক্ত হারাম। ওই পাঁচিলটুকু আমি যেন না ডিঙিয়ে যাই এজন্য তুই তোকারি শুরু করেছিলাম। আমরা সহোদর ভাইবোন প্রায় সবাই মনে হয় নিজেদের তুই সম্বোধন করি। মারামারি ঝগরা বেধে গেলে কুত্তা, শুয়োর, হারামি বলে গালাগালি করি। আমি একদিন আমার প্রিয় ছোট বোনকে হারামি বলার সাথে সাথে স্বর্গীয় আব্বার আক্রোশের শিকার হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, দেখ, পশুর নাম ধরে গাল দেয়া তো যাবেই না আর হারাম শব্দ থেকে হারামির উৎপত্তি ! এবার তুমি ভাবো তোমার গালটি ঠিক আছে কি না? আমার মেয়ে কি হারাম ? তাৎক্ষনিক আমার জবান বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।
তুই , সম্বোধনটি আমি সহোদরের পর্যায়ে নিতে চেয়েছিলাম। আমার ভাইবোনদের সাথে যেমন থাকে তেমনি রাখতে চেয়েছি। এর বেশি কিছু নয়। ওদের কেউ কেউ এ লেখা পড়ছে। ওরা বিচার করুক বিষয়টি ঠিক আছে কি না।

আমরা তাহলে সন্তানদের কি রকম সম্বোধন করতে পারি ? কোনটি স্বাস্থ্যকর ? মানসিক স্বাস্থ্যকর সম্বোধন কোনটি আমাদের আগে বিচার করতে হবে বন্ধু । আমাদের বাঙলা পন্ডিতদের দোষ আর দায় দিবেন না দয়া করে। একটি ভাষার কারুকাজ আর কৌশল বিবর্তনের ধারায় আবর্তিত হচ্ছে। এমনতো না যে, একটি শহরের নাম জরুরি নির্দেশ দিয়ে পাল্টে দিলাম। এখন না বলুক। কেউ কেউ বলবে। একসময় পাল্টে যাবে। কিন্তু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা একই ভাষাভাষীর সম্বোধন পাল্টানো যাবে? আমার মনে হয় না। কারণ এটি ভাবাবেগ আর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বর্তায়। আমাদের ব্যাকরণে তুই,তুমি,আপনি নির্দিষ্ট হয়েছে সম্বোধনে। এটি বদলানো সহজ বিষয় নয়। তাই এটি মেনে আমাদের প্রায়োগিক ধারাটি ঠিক করতে হবে। আমার সহকর্মী আমার ছাত্রী। আমি প্রটোকল মানতে পারিনি। পরম স্নেহময় সম্পর্ক ওর সাথে আমার। এজন্য তুমিটিই নির্দিষ্ট ওর সাথে। আমরা চেষ্টা করি নিজের সন্তান সন্তত্তিদের তুমি সম্বোধন করার। এটি প্রেমময় ভালোবাসার সম্বোধন। আমি অনুরোধ করছি এটি শুরু করুন। আপনি সামান্য অসহিষ্ণু হলে তুই সম্বোধন করবেন। দেখবেন আর বাজে গালিগালাজ করতে হচ্ছে না সন্তানকে। তুই একটি বিশাল গালি হিসেবে তখন বিবেচিত হবে আপনার প্রিয় সন্তান এর নিকট। দয়া করে পরীক্ষা করে দেখুন।

(চলমান)

আগের পর্ব-সন্তানদের বন্ধু বানাবেন যেভাবে (পর্ব-৪)

লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন