সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ভুল পরিকল্পনা ও স্রস্টার মহাপরিকল্পনা

মোঃ কামরুজ্জামান জেমস

৫ লক্ষ টাকা দিয়ে জমি কিনলেন। ২০ লক্ষ টাকা দিয়ে বাড়ি বানালেন। ৩০ লক্ষ টাকা দিয়ে পুকুর কাটলেন। ৪০/৫০ হাজার টাকা দিয়ে স্ত্রীর গলার হার বানিয়ে দিলেন। ১০ হাজার টাকা দিয়ে কাপড় কিনে দিলেন। ৫ হাজার টাকা দিয়ে সন্তানকে জুতা কিনে দিলেন।৷ আপনি তাকে কিছুদিন পরপর পোশাক কিনে দেন। আপনার জমিতে দেওয়ার জন্য সার ঠিকঠাক কিনেন। কিন্তু যখন আপনার সন্তান আপনার কাছে কোন বই কেনার কথা বলে তখন বলেন, “এখন অভাব। তোর মাস্টারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নিবো।”

আবার মাস্টারের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “বইগুলো কয়েকদিন পরে কিনে দিলে চলবে না?”
মাস্টার লজ্জায় বলে ফেলে, “সমস্যা নাই। কয়েকদিন পরে দিলেই চলবে।”

আপনি জমি কেনা, বাড়ি করা, স্ত্রী, সন্তানের জন্য পোশাক কেনা, পুকুর কাটানো কয়েকদিন পর করলেন না? ওসব কাজ কয়েকদিন পর করলে চলবে না? হ্যাঁ, আপনি আপনার কাজ কয়েকদিন অপেক্ষা করতে পারলেন না। আর সন্তানের বই কিনে দেওয়ার সময় অপেক্ষা করতে বলেন। কারণ আপনার লজ্জা নাই। আপনার সন্তান মানুষ হোক তা আপনি চান না।

আপনার সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে আপনি গড়িমসি করেন। আপনি ভেবেছেন, আপনি বেতন দিতে গড়িমসি করে খুব লাভবান হবেন? না, অবশ্যই লাভবান হবেন না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দুইভাবে-

১) আপনি সন্তানকে প্রতারণা / জালিয়াতি/ অন্যের হক নষ্ট করার পথ দেখাচ্ছেন অথবা দেখাতে সহযোগিতা করছেন।

২) তাকে অমানুষ বানাচ্ছেন। সে কখনো নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ হবে না। কারণ মানুষ ঠকালে আল্লাহ তাকে ঠকায়।

আপনার সন্তান কার কাছে টিউশন পড়ে। তার টাকা দিচ্ছি, দিচ্ছি, মেরে খাব এসব বলে দিলেন না। দিন শেষে মনে করছেন, “আমার চেয়ে চালাক আর কেউ নেই। আমার তাকে টাকা দিলে ১/২ হাজার টাকা দেওয়া লাগতো। এই টাকা আমার বেচে গেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সন্তান আপনার গাজাখোর, বা মদখোর কিংবা ইয়াবা সেবনকারী। তা রচেয়ে যদি ভালো হয় তবে সিগারেটখোর।

আপনি আপনার সন্তানের পরীক্ষার ফি বা ফরম পূরণের বা রেজিষ্ট্রেশন এর টাকা কম দেওয়ার জন্য প্রিন্সিপাল বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে ঘুরছেন। এতে কিছু টাকা কম পেলেন কিন্তু আপনি ও আপনার সন্তান তাদের কাছে ছোট হয়ে গেল। তাতে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেন কিন্তু নৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন।

আপনার সন্তান ছেলে ও সে একটা। তাই তাকে বাইক কিনে দিলেন ১/২ লক্ষ টাকা দিয়ে। আবার সাথে ২০/২৫ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন কিনে দিলেন।অথচ টিউশনির ১/২ হাজার টাকা দিলেন না। আপনি মনে করছেন, ” সেই শিক্ষক গরীব হয়ে যাবেন। “না, সেই শিক্ষক হয়তো সাময়িক অভাবে পড়তে পারেন কিন্তু ক্ষতির মধ্যে পড়লেন আপনি নিজেই। কারণ আপনার একমাত্র ছেলে শুধুমাত্র আপনার জন্য অমানুষ হয়ে যাবে।

আপনি ঘুষের টাকা, সুদের টাকা, চুরির টাকা, চুরি করতে সাহায্য করে প্রাপ্ত টাকা, অন্যের জমি প্রতারণার মাধ্যমে গ্রহণ করা টাকা, অথবা অন্য কোন উপায়ে অর্জিত টাকা জমি ক্রয়ের মাধ্যমে বা ক্যাশ আকারে বা বাড়ি ঘর বা অন্য কোন উপায়ে রেখে গেলেন কিন্তু সন্তান আপনার মানুষ হলো না। তাহলে আপনার অবৈধ আয়ে আপনার সন্তান একদিকে যেমন মানুষ হলো না, অপরদিকে, আপনার অনুপস্থিতিতে সে মেয়েবাজি করে, তাস খেলে, বিড়ি, সিগারেট খেয়ে, মদ, গাজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল খেয়ে আপনার সব সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলবে।

আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, “আসলে আপনি কার জন্য এতো পরিশ্রম করছেন?”যদি উত্তর হয় “আপনার সন্তানের জন্য। তাহলে তার পেছনে আপনার টাকা বিনিয়োগ করতে এতো দ্বিধা কেন? তার বেতন দিতে, বই কিনে দিতে, টিউশনির টাকা দিতে আপনার গড়িমসি কেন? আপনার কাছ থেকে টাকা চাওয়ার অপেক্ষা করেন কেন?”

আপনার বাসার বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, ডিস বিল এসব দেরিতে দেন না কারণ দেরিতে দিলে হয় জরিমানা লাগবে, না হয়, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে তাই। আর আপনার সময়মতো টাকা না দিলে স্কুলের সাথে, শিক্ষকদের সাথে আপনার ও আপনার সন্তানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আপনি তা বুঝেন না?

তা বুঝবেন কেন? পরে অমানুষ হয়ে গেলে বলবেন, “আমার সন্তানকে আপনি মানুষ বানাতে পারেন নি। কিন্তু আপনার সন্তানের মানুষ হওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন আপনি নিজেই।

আপনার সন্তানকে মানুষ করেন। দেখবেন তার চাহিদা কম হবে। আচার ব্যবহার সুন্দর হবে। আপনার বাধ্য হবে। আপনার সুযোগ সুবিধা বুঝবে। আপনার বিপদে পাশে থাকবে। আপনার আলাদা ক্যাশের প্রয়োজন হবে না বৃদ্ধ বয়সে। অসহায় অবস্থায় আপনার সেবা যত্ন করবে। দেখাশোনা করবে। ভাত কাপড় তো দিবেই। আর মারা যাওয়ার পর আপনার জন্য দোয়া করবে। শুধু আপনার সন্তানই দোয়া করবে না, তার সন্তানদের এমনকি সন্তানদের দোয়া করতে বলবে।

আপনি এখন বেছে নিন সন্তানকে মানুষ করবেন কি অমানুষ করবেন। আমার বিশ্বাস, সবাই সন্তান মানুষ করবেন। তাই তার প্রয়োজন আগে মিটিয়ে পারলে জমি কিনেন, বাড়ি বানান, পুকুর কাটান, আরো অন্যান্য কাজ করেন। দেখবেন আজ যা বিনিয়োগ করছেন কিছুকাল পরে তা বহুগুণে ফেরত পেয়েছেন। তখন খুব আনন্দিত হবেন। আপনার আনন্দময় জীবন কামনা করছি।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন