সন্তান লালন পালনে যে ভুলগুলো করবেন না (পর্ব ৩)

জিনাত জিনু

লেখাপড়ার উদ্দেশ্য কি শুধুই ভালো নাম্বার পাওয়া? যে কোনো স্থান অধিকার করা?

ঘটনা -১ঃ

আজমান ক্লাস ওয়ানে পড়ে।নিয়মিত স্কুলে আসে,রুটিনমাফিক পড়াশুনা করে,ক্লাস পারফরম্যান্স খুব ভালো, পরীক্ষার ফলাফলও ভালো। স্কুলের সবার অনেক প্রিয়। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অংকে এক নাম্বার কম পেলো কিন্তু বাকি বিষয়গুলোতে একশত পয়েছে।খাতা দেখার পর আজমানের মা অংক মিসকে ফোন দিলেন।মিস আজমানের নাম্বার একটু বাড়ানো যায় না? মিস বললেন -কিভাবে বাড়াবো, ও যে ভুল করছে সেখানে নাম্বার কম পেয়েছে। এখানে কিচ্ছু করার নেই।আজমানের মা অনুরোধ করলেন মিস ও ১ম না হতে পারলে খুব কষ্ট পাবে, অনেক কান্নাকাটি করবে।কিছু করা যায় না মিস।

ঘটনা ২ঃমাহিব কেজির ছাত্র। সে প্লে থেকেই ১ম হয়ে আসছে।অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার সময় তার ডেঙ্গু হলো।তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো।পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ে সে হাতে স্যালাইন সমেত স্কুলে হাজির।সে পরীক্ষা দিবে।শিক্ষকরা বুঝালো এবার সে পরীক্ষা স্থগিত করুক।সুস্থ হলে আবার পড়বে।কিন্তু অভিভাবকদের কথা হলো-পরীক্ষা না দিলে মাহিব পিছিয়ে যাবে, ১ম হতে পারবে না।সে অনেক জেদ করছে সে পরীক্ষা দিবেই।হাতে স্যালাইন ঝুলিয়ে ছোট্ট বাচ্চাটা পরীক্ষা দিলো।পরীক্ষা শেষে হাসপাতালে ফিরে গেলো।

ঘটনা ৩ঃ রাহী ক্লাস টু তে পড়ে।তার ক্লাসের অন্যান্য ছাত্রদের চেয়ে তার পারফরম্যান্স খুবই খারাপ।বিত্তশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় মা বাবা তার জন্য তিনজন টিউটর রেখেছেন। কিন্তু তার সমস্যা হলো সে সারাদিন পড়াশোনা মধ্যে থাকলেও কোনো পড়া মনে রাখতে পারে না।প্রতিবার ক্লাস টেষ্ট বা সেমিস্টার ফাইনালের পর দেখা যায় সে ৫০ শতাংশ নাম্বার পেয়েছে। তাই প্রতিবার রেজাল্টের পর সে বাসায় মার খায়, বকুনি শোনে।আগে রেজাল্ট খারাপ হলে ভয় লাগতো,সবসময় মার খেতে খেতে আর ভয় লাগে না।

উপরের চিত্রগুলো আমাদের সমাজের খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা স্কুলে ভর্তির সময় নামকরা স্কুল দেখে ভর্তি যুদ্ধে নামী।বাচ্চা সুযোগ পেলে গর্ব করে বলি সবাইকে। কোনো ক্লাসের পড়া শুরু করার সময় পুরো সিলেবাসটা দেখি না।শিক্ষককর্তৃক নির্ধারিত অংশটুকু তোতাপাখির মতো বাচ্চাকে মুখস্ত করাবো,বার বার লিখাবো,কোনোভাবেই যেন কম নাম্বার না পায়।বাচ্চা ১ম,২য়,৩য় হলেই আমরা খুশি।না পেলে নাম্বার বাড়ানোর চেষ্টা, বাচ্চাকে নির্যাতন করা,অনেক টিউটর রাখা সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে ইচ্ছুক।
কিন্তু আমরা কি এভাবে ভাবি?
১. ক্লাস অনুযায়ী সন্তানের মৌলিক বিষয়গুলোতে  স্বচ্ছ ধারণা আছে কি?
২.কোন্ কোন বিষয়ে সে আগ্রহ পাচ্ছে আর কোন্ গুলোতে দূর্বল? কেন দূর্বল?
৩.তাকে ভালো রেজাল্ট করার জন্য যে চাপ প্রয়োগ করছি তা নেয়ার মতো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা তার আছে তো।
৪.১ম হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার অনুশীলনীর প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা।
৫.আমাদের মান-সম্মান বা ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আমার সন্তান পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে নাতো।
৬.অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা তাকে আত্মহননের পথে নিয়ে যাচ্ছে না তো?

তাই সচেতন অভিভাবক হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানের মানসিকতায় কোনো পরীক্ষায় বিশেষ স্হান লাভ করার বিষয়টি আসতে দিবো না।কারণ আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু স্হান লাভ করা নয়,বরং পাঠ্য বিষয় ও বাহ্যিক বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা।সীমাবদ্ধ শিক্ষা সাময়িক ফলাফল ভালো হতে সহায়তা করে কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও সফল মানুষের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায়।

(চলবে)

আগের পর্বের লিংক-সন্তান লালন পালনে যে ভুলগুলো করবেন না (পর্ব-২)

লেখকঃ শিক্ষক  ও কলামিস্ট 

আরও পড়ুন