শিশুর বিকাশলাভের প্রধান তত্ত্ব

মনিরা ইসলাম 

আমি ঘুরে ফিরে শিশুর বিকাশ কে কেন্দ্র করে লিখতে পছন্দ করি। কারণ আমার কারিকুলাম বিকাশ ওরিয়েন্টেড কারিকুলাম। বিকাশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে এই কারিকুলাম অনেকের কাছে উপভোগ্য হতে বাঁধা পাবে। তাই হোমস্কুলিং এ আগ্রহী সব অভিভাবকদের শিশুর বিকাশ সম্পর্কে সঠিক জানতে হবে এবং সচেতন হতে হবে।

কারণ শিশুর বিকাশ একটা চলমান প্রক্রিয়া। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এর চলবার শক্তি অব্যাহত থাকা দরকার। কিছু কিছু বিকাশ শিশুর বিভিন্ন বয়সে পূর্ণতা পায়। পূর্ণতা পাওয়া মানে সেটা মজবুত হয়।চর্চা ছাড়া সেটাকে স্হায়ী করা কঠিন। চর্চা বন্ধ করলে বিকাশ দূর্বল হয়ে যায়।

আমরা সবাই মেধাবী সন্তান আশা করি। মেধার জন্য নবজাতকের সাথে কথা বলা একটা উত্তম উপায়। আসলে মায়ের পেটে তিনমাস বয়স থেকে শিশু শুনতে শুরু করে। তার শোনার শক্তি জোরদার করার জন্য এই সময় থেকেই তাকে শোনানো দরকার। পেটের ভিতর থাকা সন্তানের সাথে কথা বলে সুফল অর্জন করেছেন এমন দু চারজন মা কে আমি সরাসরি চিনি (একজন আমি)।

শিশুর সাথে কথাগুলো ছোট এবং মোলায়েম বাক্য দিয়ে তৈরী হবে। এসব বাক্য অবশ্য ” না” শব্দ মুক্ত হতে হবে। “না” শব্দ থেকে পেটের বাচ্চা থেকে শুরু করে জন্ম হবার তিনমাস পর্যন্ত শিশু মানসিক চাপ পেয়ে থাকে। তারপর শব্দের সাথে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠে ‌। এর মধ্যে আনন্দের কিছু নাই।” না” শব্দের বিশ্লেষণ করে তার মধ্যে বাঁধা আবিষ্কৃত হয়। ফলে মানসিক চাপটা একটু মোড় বদল করে।

এখন সে জানে না মানে বাঁধা। সে জানে আমি এটা করতে পারব না। সাথে সাথে তার কিছু করার ভাবনা হয়। যেহেতু “না” বলে আমরা শুধু কাজটা থেকে বিরত করি। আর কোনো কাজ দেই না।তাই শিশু অশান্ত হয়। ছোট বুদ্ধির ছোট মানুষ একা বোধ করে।কি করতে হবে একা বুঝতে পারে না।তাই সে নতুন আরেকটা মন্দ কাজ করে।

শিশু কে কোনো কিছু মুখে দিতে বাঁধা দেয়া আরেকটা না। শিশু মুখে সব কিছু দিয়ে নিজের বোধশক্তি/ উপলব্ধি বাড়ায়। থুথু লাগানোর দোষে সে বাঁধা পায়। একটু চিন্তা করে দেখি সে যদি দুই লাখ টাকা দামের মোবাইল ফোন মুখে দিয়ে বুঝতে চায় এটা শক্ত। এটা মুখে ব্যথা দিবে। এটা ভারী।আমি কষ্ট করে তুলেছি। এটা হাত থেকে পড়ে যায়। এখানে একটুও দোষ হবে না। শুধু থুথু লাগানোর অপরাধে তার কাছ থেকে ওটা কেড়ে নিলে দুটা ক্ষতি হবে। তা হলো(১) সে কেড়ে নিতে শিখলো(২) তার চিন্তায় বাঁধা পড়ল। এই ক্ষতি দুইলাখ টাকার মোবাইলের চেয়ে বেশী।

শিশু একটা বিষয় বেশীক্ষণ দখলে রাখতে পারে না।তার অভিজ্ঞতা অর্জন হলে সে নতুন কিছু করতে চায়। এটা তার সহজাত প্রবৃত্তি। তাই এবার সে আরেক কাজে ব্যস্ত হয়। মোবাইল যেহেতু অনেক দামী এটা তার নজর এবং নাগাল থেকে দূরে রাখা দরকার। মোবাইল থেকে আরেকটা ক্ষতি হলো ব্রেণের ক্ষতি। ব্রেণের স্নায়ূগুলো শিশুর বয়স দশ হ‌ওয়া পর্যন্ত গঠণ হ‌ওয়া শেষ হয়।

জার্মানি তে নথিপত্রের হিসাবে বারো বছরের নীচে বাচ্চাদের মোবাইল ফোন নিষেধ। স্কুলে সেটা কড়াকড়ি থাকলেও পরিবার সে বিষয়ে অসফল।( দূরে থাকা বাচ্চাদের শুধুফোন মোবাইল নেয়ার অনুমতি আছে)। তবে জার্মানি তে তিনবছর বয়সের নীচে বাচ্চাদের টি ভি কার্টুন না দেখানোর সাফল্য অনেক আছে।

আমি বিশেষ যত্নের সাথে এই বার্তাটি প্রচার করি।কারণ শিশুর মস্তিষ্ক কার্টুণের দ্রুততার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তাই ঐ বয়সের শিশু চীৎকার চেঁচামেচি করে শান্তি পায়।আরো আছে আলো এবং মাল্টিকালারের চাপ। এদেশে বেডটাইম কার্টুন আছে। তিন বছরের জন্মদিনের পর বাচ্চাদের আধা ঘন্টা কার্টুণ দেয়া যায়।

আর তিন বছর হবার আগে আছে ঘুমের গল্প ব‌ই( Bed time story) এই গল্পের শেষ এমন করে করা হয় যে সেখানে ঘুমের মোটিভেশন থাকে। এমন ব‌ই লিখে পাঠক পাবো কি, ভাবনা হয়। ফিরে আসি ” না” এবং শিশুর বিকাশ বিষয়ের কাছে।

“না” শব্দ শিশু শুনতে শুনতে বুঝতে শিখে আমি করতে পারব না। শিশু যেহেতু ননভারবাল।সে বলে বুঝাতে পারে না  আমি কি করব , আমি কিছু করতে চাই। শিশু স্হবির না। তার চলবার,করবার শক্তি আছে। সেটা অবদমিত হোক এমনটা সে চায় না।আমরাও চাই না। যে স্ত্রি ঘরের কুটো নাড়বার সুযোগ থাকে না অনেক দাসী বাদির আদরে তিনি
নিয়মিত শপিং মলে ঘুরতে আনন্দ পেয়ে থাকেন।কারণ এক‌ই, শিশুর মত। তা হলো মানুষ বেকার থাকতে পারে না।

শিশুর বয়স নয় মাস/ দশ মাস হতে হতে “না” শোনার একটা ক্লান্তি এবং একঘেঁয়ে চাপ তাকে পেয়ে বসে। সে সেসব থেকে দূরে যাবার পথ খুঁজে।ফলে এই বয়সে এসে অনেক বাচ্চা হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের কোণের ময়লা টেনে মুখে দেয়। তিনমাস বয়সে নিজের কাঁথা মুখে না দিতে পেরে তার মধ্যে যে শূণ্যতা তৈরি হয়েছে,সেই শূণ্যতা পূরণের প্রতিনিয়ত চেষ্টা তাকে নিরলস করে।আমরা দেখি সে শুধু জ্বালাতন করে।

শিশু ছোট মানুষ। এক কথায় চমৎকার। সে একটা সময় চেষ্টা করে আমাদের ” না” এর সাথে মানিয়ে নিয়ে অন্য কিছু করতে। কিন্তু বার বার বাঁধা পেয়ে তার পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। সে প্রতিবাদী হয়।তাই তাকে আমরা বলি বেয়াদব। আসলে বাচ্চাটা এখন কি করবে????

আমি বুঝাতে চেয়েছি যা শিশুকে দেয়া যাবে না তা তার নজর/ নাগালের বাইরে থাকবে। শিশুর সাথে বয়স তিন পর্যন্ত” না” মুক্ত কথা বলতে হবে। তার সমস্ত পরিবেশ নিরাপদ এবং শিশু বান্ধব হবে। তার সাথে ছোট, মোলায়েম এবং কৃত্রিমতা বর্জিত বাক্য দিয়ে কথা বলা হবে। নিয়মিত তাকে জানাতে হবে সে কি করতে পারবে।” আসো আমরা করি” এভাবে না বললে শিশু কমান্ডিং ভয়েস শিখবে। ডিক্টেটর হবে। শিশু প্রতিপালন কি কঠিন নাকি সহজ?

লেখকঃ মনিরা ইসলাম, প্রবাসী লেখিকা, প্রাক্তন ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাক্তন শরীরচর্চা প্রশিক্ষক
,শিশু প্রতিপালন বিশেষজ্ঞ (প্যাডাগগ)

আরও পড়ুন