পায়ের তলায় খড়মঃ ভ্রমণের গান শুনি

এম আর রাসেল 

বই পড়াকে নিত্য দিনের কর্মে অন্তর্ভূক্ত করেছি। নতুন বছরে এখন পর্যন্ত প্রতি দিনই এই কর্ম সফলভাবে সম্পন্ন করেছি।

বছরের শুরুটা হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা “পায়ের তলায় খড়ম” পাঠ দিয়েই শুরু হয়েছে। এরপর আহমদ ছফার প্রবন্ধ সমগ্র(৩য় খণ্ড) পড়তে শুরু করেছি। আজ পায়ের তলায় খড়ম বইটি নিয়ে কিছুমিছু কথা বলতে চাই। 

“পায়ের তলায় খড়ম” ভ্রমণকাহিনী নির্ভর বই। তুরস্কের ইস্তাম্বুল ও যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস ও সুইডেনের স্টকহোম ভ্রমণের গল্প এ বইয়ে স্থান পেয়েছে।

প্রথমেই বলে রাখি যারা গুরুগম্ভীর ও তথ্য নির্ভর কাহিনী জানতে চান তাদের এই বই না পড়াই উত্তম। কারণ লেখকের ভাষ্য তিনি ভ্রমণকাহিনী লেখায় মোটামুটি ব্যর্থ।

তিনি লিখেছেন, ‘কোথাও বেড়াতে গেলে নিজের ভালো লাগার অংশটিই আমার লেখায় প্রাধান্য পায়। শহরের বিশেষত্ব বা রহস্য ব্যাখ্যায় আমি ব্যস্ত হই না। একটি শহর বুঝতে হলে দিনের পর দিন থাকতে হয়৷ দুই দিন থেকে ভ্রমণকাহিনীর লেখক লেখতে পারেন ‘ইস্তাম্বুলে আটচল্লিশ ঘণ্টা’ কিংবা ইস্তাম্বুলে ‘দুই হাজার নয়শ আঠাশ মিনিট’। আমি কখনো লিখব না।’

পুরো বই জুড়ে দর্শনীয় স্থানগুলোর রঙিন ছবির যোগ বইটিকে ভিন্ন একটি মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি লেখক ও উনার পরিবারেরও কিছু ছবি রয়েছে।

ইস্তাম্বুলের টপকাপি প্যালেস অটোমান সুলতানদের বাসস্থান ছিল। প্রায় ৬০০ বছর অটোমানরা দাপটের সহিত বিশাল ভূ-খণ্ড শাসন করেছেন। লেখকের মতে, ‘অটোমান ডায়নাস্টির কারণেই জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমান স্বর্ণযুগের সমাপ্তি হয়।’

টপকাপি প্যালেস ও এখানে অবস্থিত ধনরত্ন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পবিত্র নির্দশন সংগ্রহশালার কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মূসা (আ) এর লাঠি, হযরত ইউসুফ(আ) এর পাগড়ি, নবিজি(সা) এর পায়ের ছাপ, চিঠি, পাদুকা, আলী (রা) এর তরবারি প্রভৃতি। এই মিউজিয়ামেই রয়েছে পৃথিবীর তৃতীয় বড় হীরা ‘দ্য স্পুন’। সবচেয়ে দামী হীরা হল কোহিনূর, দ্বিতীয় দামী হীরার নাম ‘দ্য হোপ’।

টপকাপি প্যালেসের হারেম নিয়ে লেখক বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। সেখানে ঘুরে ঘুরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনেছেন। এর জন্য তিনি অন্য দর্শনীয় স্থানে যেতে পারেন নি। বই এ উল্লিখিত নাম গুলো জেনে নেয়া যাক। হায়া সোফিয়া, নীল মসজিদ, হিপোড্রাম, মিশরের আবলিস্ক, সারপেনটাইন কলাম ইস্তাম্বুলের দর্শনীয় স্থান৷

লস এঞ্জেলস এর ভ্রমণ বর্ণনায় তিনি ফরেস্ট লন কবরখানা, গ্রিফিথ মানমন্দির, ডিজনিল্যান্ড, গ্র‍্যান্ড ক্যানিয়ন, ইরি হ্রদ, রকি পর্বতমালা, হোটেল স্টানলি, এম্ফিথিয়েটার, ব্যালান্সড রক প্রভৃতি স্থানের কথা বলেছেন।

স্টকহোম ভ্রমণে তিনি সুইডেন নিয়ে মজার কিছু তথ্য যোগ করেছেন। সুইডেনের মানুষদের উপর ঠান্ডার বিচিত্র প্রভাব রয়েছে৷ প্রতি বছর প্রচণ্ড শীতের সময় অনেক তরুণ তরুণী স্বেচ্ছামৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫০০। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মদ্যপান করা হয় সুইডেনে। মানুষ মারার অস্ত্র তৈরিতে এদের দক্ষতা সীমাহীন। দুইটি বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি, কিন্তু যুদ্ধের সুফল নিয়েছে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি করে।

স্টকহোম থেকে লেখক আইসল্যান্ডেও গিয়েছিলেন৷ সেখানকার এক রেসিপি হল মূত্র হাঙ্গর৷ নাম শুনেই এর রন্ধনপ্রণালীর বর্ণনা আন্দাজ করা যাচ্ছে। কতই বিচিত্র এই দুনিয়ার মানুষের রুচি!!!

লেখক হলেন গল্পের জাদুকর। এই বইয়েও তার ব্যতয় ঘটে নি। গল্পের ছলে তিনি তিন দেশের অনেক স্থানের সাথেই পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। লেখক মনে করেন, ‘সৌন্দর্য কাগজে কলমে ব্যাখ্যা করা যায় না। সৌন্দর্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।’

ভ্রমণ মানেই অবারিত সৌন্দর্যের তরীতে সওয়ারী হওয়া। এই সৌন্দর্যের টানে ভ্রমণ পিয়াসু মানুষ বিশ্বময় ছুটে চলে। মনের কোণে আমিও খুব যতনে একটা স্বপ্ন পুষে রেখেছি। ফিনিক ফোটা জোছনা রাতে একদিন গৃহত্যাগী হব। গুণগুনিয়ে গাইব ভূপেন হাজারিকার সেই গান…

আমি এক যাযাবর
আমি এক যাযাবর
পৃথিবী আমাকে আপন করেছে
ভুলেছি নিজের ঘর…

 

আরও পড়ুন