মির্জা গালিব : সাহিত্যের দুনিয়ায় উর্দু আওয়াজ

।। নবাব আব্দুর রহিম ।।

 

তার আসল নাম মির্জা মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ বেগ খান। লিখতে শুরু করেছিলেন আসাদ নামে। কিন্তু দেখলেন একই নামে অন্য কেউ লিখে চলেছেন, তখন নাম ধারণ করলেন ‘গালিব’। গালিব মানে বিজয়ী। সত্যি সত্যিই তিনি বিজয়ী হয়েছেন অন্য কবিদের উপর। হয়েছেন উর্দু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। উর্দু আর গালিব অঙ্গাঙ্গী। তাকে বলা হয় ‘আলমে আদাব মে উর্দু কি আওয়াজ’ বা সাহিত্যের দুনিয়ায় উর্দু আওয়াজ।

 

১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর মোঘল হিন্দুস্তানের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তার সময়কাল ছিল মোঘল সালতানাতের মাগরিব ওয়াক্ত। বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের শাসন শেষ হয় তার শৈশবকালেই। দ্বিতীয় আকবর শাহ ও বাহাদুর শাহ জাফরের সময়েই তিনি সাহিত্য চর্চা করেছেন। এই সময়টার তাহকিক করার প্রয়োজন নাই। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পরিস্থিতি তখন তৈরি হচ্ছিল।

 

সাহিত্য যে সমাজের প্রতিচ্ছবি তার বাস্তব নমুনা মির্জা গালিব। অবশ্য গালিবই নয়, স্বয়ং বাহাদুর শাহ জাফরসহ সে কালের যেকোন মোঘল কবিই ছিলেন দুঃখ-যন্ত্রণা আর বিচ্ছিন্নতা কাতর। গালিবের অসংখ্য কবিতায় এর প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। তার ভাষায় তিনি যেভাবে বেঁচে ছিলেন, সেভাবে কেউ বাঁচে না।
‘ইস সাদগী পে কওন না মার জায়ে এ খুদা
লাড়তে হে, অওর হাথ মে তলওয়ার ভি নাহি’
কিন্তু একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা, যন্ত্রণাকাতর হলেও গালিব হতাশ ছিলেন না। তিনি আশার আলো খুঁজেছেন সবসময়। জালিমদের মুখোশ উন্মোচনও করেছেন কবিতায়। তার লেখনীতে উঠে এসেছে সেই দুঃসময়ের চিত্র, যখন সবাই নিজেকে বিক্রি করে দিচ্ছিল।

 

“কেমন কোম্পানি বাহাদুর এসেছে! কোথাও কোন শহর বিক্রি হচ্ছে, কোথাও কোন রিয়াসাত বিক্রি হচ্ছে, কোথাও সৈন্যদের টুকরো বিক্রি করা হচ্ছে, কেনা হচ্ছে। এ কেমন সওদাগর এসেছে এই দেশে? সারা শহর রকমারি দোকান হয়ে গেছে! ঘরে যে বিক্রি করার এত কিছু ছিল তা জানাই ছিল না। জমিন থেকে বিবেক সব বিক্রি হচ্ছে, সব বেচা হচ্ছে।”
১৮৫৭ সালের ইনকেলাবের পর তাকে আটক করা হয়। তার শাগরেদ মুনশী হরগোপালকে দেয়া একটি চিঠিতে এর মজার বিবরণী আছে। তিনি লিখেছেন—
“১৮৫৭ সালের ১১ মে কয়েকজন গোরা ছাদ থেকে লাফিয়ে আমার ঘরে আসে। আমাকে, আমার বাচ্চাদের আর কিছু নেককার পড়শীকে আটক করে কর্নেল ব্রাউনের সামনে নিয়ে যায়। রাস্তায় আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘মুসলমান?’ আমি বললাম, ‘আধা মুসলমান।’ জানতে চাইলো আধা মুসলমান কিভাবে। আমি বললাম, ‘শরাব পান করি। শুয়োর খাই না।”
বিষয়টা সম্ভবত কথাটার মতো এত ছোট নয়। সিপাহি বিপ্লবের প্রধানতম কারণগুলোর একটি হচ্ছে শুকরের চর্বি। ১৮৫৬ সালে ভারতীয় সৈন্যদের ভিতরে এমফিল্ড রাইফেল বিতরণ করা হয়। এই রাইফেলের চর্বিমিশ্রিত কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে রাইফেলে পুরতে হতো। জনরব ওঠে যে এই কার্তুজের চর্বিতে ছিল শুকর ও গরুর চর্বি। এর ফলেই হিন্দু-মুসলমান সিপাহিরা বিপ্লবে জড়িয়ে পড়ে।

 

‘দীওয়ান এ মির্জা গালিব’ গালিবের, উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তার সমকালীন কবি ছিলেন মোমিন খাঁ মোমিন। মোমিনের বিখ্যাত শের ‘তুম মেরে পাস হোতে হো গোয়া / জাব কোয়ি দুসরা নাহি হোতা’ -এর বিনিময়ে নিজের পুরো দিওয়ান দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন গালিব। ১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে ইন্তিকাল করেন তিনি।
২৭.১২.২০২১
লেখকঃ কবি ও লেখক
আরও পড়ুন