যন্ত্রণাদায়ক পৈশাচিকতা আমরা আর কামনা করি না

 ।। নুরে আলম মুকতা ।।

“দন্ডিতের সাথে দন্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ যে বিচার; যার তরে প্রাণ কোন ব্যথা নাহি পায় তারে দন্ডদান প্রবলের অত্যাচার।” -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বুয়েটে আবরার হত্যাকান্ড ” ঘটনাটি জানার পর আমি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। নিজে নিজে পুড়ছিলাম। আত্মদহন যাকে বলে। আমার কাছে মনে হয় , এমন কিছু বিষয় আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে যা ভয়ানক রকমের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু কিশোরদের মনোজগতে বিশেষ কোন ঘটনা রেখাপাত করলে সবিশেষ ক্ষতি হতে পারে। আমার যে দর্শনটি মাথায় ঘুর ঘুর করে তা হল, আমি চাইছি আমার ছেলে মেয়ে মানুষ হয়ে উঠবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে আমি পড়ে গেলাম বা ওরা মুখোমুখি হল যে সরে আসা বিপদ হল ! তখন কী হবে ?

আল্লাহ মাফ করুন যেন এরকম পরিস্থিতির শিকার কেউ না হন। বুযেটে আবরার হত্যাকান্ড ঘটে যাবার পর আমার সন্তান আর শিশু কন্যার অনেক প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারছিলাম না। কারণ, আমার কন্যা শিশুটির ভাই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। আমি খেয়াল করেছিলাম আমার সন্তানের মনে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ আর বোবা কান্না ভর করেছিল। উত্তরণের রাস্তা পাচ্ছিলাম না। গিন্নিকে আন্তরিক ধন্যবাদ যে, উনার পরামর্শে কিছুটা হলেও মানসিক ঘোর কাটাতে পেরেছিলাম। আবরার আর ওর পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষ মোনাজাত করে শান্তি পেয়েছিলাম।

একজন আবরার হত্যাকান্ড যে পাশবিকতার নির্মম বলি হয়েছিল তা কোনদিন ভুলে যাবার নয়। আবরারদের জন্য কত স্বপ্ন আর আবেগ কাজ করে তা পাশবিকতায় পূর্ণ কোন চরিত্র কল্পনা করতে পারে না। বুয়েট শুধু আমাদের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। সর্বোচ্চ দেশ প্রেমের প্রতিষ্ঠানও। মনীষীরা যথার্থ বলেছেন, সর্বোচ্চ শিক্ষা আর মেধা মননশীলতার সাথে দেশ মাতৃকার নাড়ীর যোগ রয়েছে।

একটি উচ্চ বিদ্যাপীঠ সর্বমত সহিষ্ণুতার সর্বোচ্চ মানদন্ড আমরা আশা করতেই পারি। কিন্তু আশার বীজ অংকুরেই বার বার বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা পৈশাচিকতায় মর্মাহত হচ্ছি। তাহলে এর উৎস খোঁজা আর এটি বন্ধ করার জন্য আমাদের কাল বিলম্ব আত্মহত্যার সামিল হবে।

আবরার হত্যাকান্ডের রায় ঐতিহাসিক মাইলফলক। আমরা চাই এ মেসেজটি এবার পৌঁছে যাবে পাশবিকতা আর নয়। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পশুত্বের শৃঙ্খল মুক্ত হবে ।

ডিজিটাল যুগে তো আমরা সংবাদ প্রবাহ বন্ধ করতে পারছি না। মা আমায় বলেছিল, আব্বু আবরার ভাই হত্যাকান্ডের বিচার হলে তুমি আমাকে জানাবে। আমি কথা দিয়েছিলাম। নিয়তির পরিহাস। ওর মা আগেই দেখে ফেলেছে। আমাকে এ দুঃসংবাদ বহন করতে হয়নি। ঘটনা পরিক্রমা এবার নির্মম।

রাজনৈতিক নৃশংসতার করুণ পরিনতি ! ০৮ ডিসেম্বর, বুধবার সকাল দশটা , রাজনৈতিক নৃশংসতার করুণ পরিনতি! ২০ আসামির মৃত্যুদন্ড! তাও আবার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চ মেধাবী ২০ জন শিক্ষার্থীদের! কন্যা শিশু বার বার বলেই যাচ্ছে, আব্বু ওদের বাবা মা ভাই বোনের কী হবে ?

আমি জানি না মা। শুধু এটুকু প্রার্থনা করতে পারি এ জাতির জীবনে ২০১৯ সালের ০৭ অক্টোবর আর যেন না আসে। আবরারের মতো দারুণ নক্ষত্রের আর যেন অকালে বিদায় নিতে না হয়। বর্বর পৈশাচিকতা যেন আমাদের জাতিকে যেন গ্রাস না করে আর।

এ অভিশপ্ত দিনটি মুছে দেয়ার জন্য সম্মানিত মনোবিজ্ঞানী আর সমাজবিজ্ঞানী বন্ধুদের করজোড়ে মিনতি জানাই গবেষণা করে বের করুন কেন এ হিংসা আর অবক্ষয়ে আমরা পতিত হলাম? দ্রুত এ কাজ করতে না পারলে আমাদের আরও কাঁদতে হতে পারে। আমি নিশ্চিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারকও কেঁদেছেন এ বিচারের রায় ঘোষণা করার আগে আর পরে। তিনিও মানুষ, না হয় কোন প্রিয় সন্তানের বাবা।

 

লেখকঃ লেখক, শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী 

আরও পড়ুন-সন্তানদের বন্ধু বানান (পর্ব-৭)

যন্ত্রণাদায়ক পৈশাচিকতা আমরা আর কামনা করি নাযন্ত্রণাদায়ক পৈশাচিকতা আমরা আর কামনা করি নাযন্ত্রণাদায়ক পৈশাচিকতা আমরা আর কামনা করি না

আরও পড়ুন