বিবর্তন এবং কিছু আফসোস

হাসিবুর রহমান ভাসানীঃ

ডাকবাক্সগুলো অচল হয়ে পড়েছে তাই গল্পের ডাক হরকরা দীনু আর নিতাইয়ের আবেদনটাও আজ ফুরিয়েছে।

সময় যত গড়াচ্ছে মানুষ তত ডুব দিচ্ছে ভার্চুয়াল জগৎ নামক একটা অদৃশ্য নরকে।
বিশ শতকের শেষের দিকেও যে ছেলেটা গলির ধারে একটা চিঠির জন্য রোজ অপেক্ষা করতো,
সেই ছেলেটাই আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় ইউরোপ আমেরিকার মস্তসব ডুপ্লেক্সে বসে স্কাইপে কথা বলছে তার বাবা মায়ের সাথে কিংবা শেষ বিদায়ের মুহুর্তটায়ও ইমুতে হাত নেড়ে নেড়ে প্রিয় সন্তান বিদায় দিচ্ছে তার বাবা মাকে।

এ যুগে জন্মালে হয়তো ছুটি গল্পের ফটিককে আর মামার বাড়ি গিয়ে মরতে হতো না;ওর হাতে একটা এন্ড্রয়েড মোবাইল দিলেই চলতো।
গেমের নেশায় ফটিক মাখনকে মারার সময়টা আর পেতো না।

গ্লোবালাইজেশন হচ্ছে,দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে কেবল স্পর্শটা হারিয়েছে।
মানুষ ভুলতে বসেছে আপনজনকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দটা;

কানামাছি,গোল্লাছুট আর দাড়িয়াবান্ধার দখলটা আজ নিয়ে নিয়েছে ভাইস সিটি,পাবজি আর মার্ভেল ডিসিরা;

বিষবাষ্পের এ হাওয়া ছড়িয়ে পড়ছে শহর,মফস্বল থেকে অজপাড়াগাঁ অব্দি;
গ্রামীন হাট বাজারগুলোর কদর কমছে,সবাই ছুটছে মলের দিকে।
এদিকে ব্রান্ড নামক যাঁতাকলে পিশে যায় সুবলের মায়ের হাতে বোনা রেশমি চাদরটাও,ক্রেতা নেই তাই উৎপাদন ও বন্ধ।

কেউ কেউ আবার ভার্চুয়াল মজা লুটেও বেশ আনন্দ পাচ্ছে।
নামের পাশে একটা নীল ব্যাজ কিংবা সেলিব্রেটি তকমা পাওয়ার ধান্ধায় গ্রাম্য কুঁড়েঘরে গিয়ে দু’সের চাল দিয়ে সেটার ভিডিও ভাইরাল করলেই মিলছে সুখ্যাতি।

অন্যদিকে ফসলি আবাদ কমে যাচ্ছে,কল কারখানা গড়ে উঠছে; কর্মহীনতা বাড়ছে,মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে গার্মেন্টস গুলোতে,বেতন কমছে; সবকিছু একটা দুষ্ট চক্রের ন্যায় ঘুরছে।

সেদিন কুমারপাড়ার সুভাষ বাবুকে জিজ্ঞেস করছিলাম অনলাইন শব্দটা দিয়ে সে কি বোঝে, উত্তরে বললো:
“আমি নির্বিবাদী মানুষ বাবা অনলাইন টনলাইন বুঝি না,তবে যেটুকু বুঝি তা হলো
আমার বানানো মাটির হাড়িগুলো আর বিক্রি হচ্ছে না;
বউয়ের হাতে বোনা চাটাই নিয়ে মোড়ের ধারে সারাদিন বসে থাকলেও কেউ কিনছে না।
ছেলে রমা বায়স্কোপ নিয়ে এ পাড়া ও পাড়া করলেও আগের মতো আর ভীড় জমছে না।
পেটে ক্ষুধা বাড়ছে,চোখে অন্ধকার দেখছি;রাত্তির বেলা না খেয়ে শুয়ে পড়ছি।”

পাশের বাড়িটায় আগুন লাগছে, কে যেন সাহায্য চেয়ে চিৎকার করছে কিন্তু চারদিকটা ফাঁকা,কেউ নেই;
সবাই ঘুমুচ্ছে,এসি রুমের গ্লাস ভেদ করে ওই চিৎকার গুলো ঠিক কান অব্দি আসছে না।

এখন আর কালু বুলুরা রাতের বেলা গায়ে তেল মেখে চুরি করতে বেড়োয় না;
শুনেছি ব্যংক হ্যাক করে কারা যেন কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে,শেয়ারবাজার ধ্বসে পড়ছে।

চারদিকে নিষ্ঠুরতার খেলা চলছে;
ট্রাম্প পুতিন পাঞ্জা লড়ছে,
কার বোমাটা আগে গিয়ে সিরিয়ায় পৌঁছায়।

এখন আর জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো ‘গাছেরও প্রাণ আছে’ এমন গবেষণায় মানুষ সময় নষ্ট করতে চায় না তার চেয়ে বরং ‘বায়োলজিক্যাল ওয়েপন’ তৈরতে আনন্দ বেশি পায়।

হ্যাঁ,এখনও সন্ধ্যা নামে তবে কেরোসিন বাতির কুপিগুলো আর জ্বলে না;
পূর্ণিমা রাতে জলসা বসে না,পুঁথির গুনগুন আওয়াজটাও আর শোনা যায় না।
কেবল মসজিদ থেকে ভেসে আসা ভারী গলার আজানের শব্দটা দিনদিন ভীষণ করুন সুরে ধরা দিচ্ছে আমার মস্তিষ্কে।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

[বাঁচতে চাওয়া মানুষগুলো,পালিয়ে বেড়ায় রোজ;
চারদিকটা আজ যাচ্ছে পুড়ে,কে রাখছে কার খোঁজ]

আরও পড়ুন