মহাত্মা গান্ধীর সাথে কিছুটা সময়

ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর ১৫১তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে “শ্রদ্ধাঞ্জলি” জানিয়ে মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে আমার একটি রূপকধর্মী লেখা খানিকটা এডিট করে আবার রিপোস্ট করলাম।

মহাত্মা গান্ধীর সাথে কিছুটা সময়

শেলী জামান খান

ইউনিয়ন স্কয়ার পার্ক।নিউ ইয়র্কের ডাউনটাউন ম্যানহাটানের খুবই ব্যাস্ততম একটি জায়গায়, একেবারে কেন্দ্রস্থলে এই পার্কটির অবস্থান। এটি একটি খুবই অভিনব পার্ক।পার্কটির চরিত্র যেন আপনভোলা, খাম খেয়ালী স্বভাবের মেয়েদের মত।কখনো খুবই পরিপাটি সাজগোজ। আবার কখনো ভোলাভালা, এলোমেলো। এই পার্কের মানুষগুলো, যারা এখানে সময় কাটাতে আসে তারাও বোহেমিয়ান স্বভাবের।দিন রাত্রির কোন ঠিক ঠিকানা নেই। হয়তো সারাদিন এখানেই বসে আছে। কেউ বসে ঝিমুচ্ছে, কেউ ঘুমাচ্ছে। কেউ প্রেম করছে, কেউ গাঁজা টানছে।কেউ ল্যাপটপে কাজ করে যাচ্ছে, কেউ বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে। কেউ বসে খাবার খাচ্ছেতো কেউ মুখে মেকাপ মাখছে।

ফল, স্প্রিং আর সামারে যেন প্রাণ ফিরে পায় এই পার্ককন্যা।অস্থায়ী তাঁবু আর ভ্যানগাড়ী করে নানা রকম পন্য নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে দোকানীরা।নানা দেশের সব বাহারী পোশাক, প্রসাধনী ও জুয়েলারী বিক্রেতারা। অন্য দিকে বসে অরগানিক সবজি আর নানা রকম তৈরী খাবারের ফেরিওয়ালা।ওদের কাছে পাওয়া যাবে খাঁটি মধু,নানা স্বাদের, নানা বর্ণের চিজ, পিকল।পার্কে ঢোকার মুখেই বসে একদল দাবা প্রেমিক দাবাড়ুর দল।হাতি, ঘোড়া, নৌকো আর সৈন্য সামন্তের বহর সাজিয়ে তারা বসে থাকে। যদি কোন আগ্রহী দাবাড়ুর সাক্ষ্যাৎ মেলে।সব সময়ই চোখে পড়বে ছোটখাট কোন জটলা।কিছু মানুষ কয়েকটি প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে।তাদের প্লাকার্ডে হয়তো লেখা থাকে সরকারের কোন নীতি বা কাজের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ।কিন্তু সেই প্রতিবাদ সরব নয়। নিরব প্রতিবাদ।তারা চিৎকার, চেচামেচি করে পরিবেশ দূষন করে না।কেউ হয়তো রং তুলি নিয়ে কোন একটি গাছের নীচে বসে গেছে।সাদা ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠছে অদূরে বসে থাকা কোন এক অচেনা তরুনীর অবয়ব।ফ্রী হাগ বা ফ্রী চুমু বিতরনের জন্য প্রতিদিনই বিশ্ব প্রেমিক টাইপ দুই একজন তরুন তরুনীর দেখা মিলবেই। এক কোনায়, একটু খোলা চত্তরের মত একটি জায়গা আছে, পানির ফোয়ারার কাছে।সেখানে গাছের নীচে বসে থাকে একদল নারী পুরুষ। গেরুয়া পোশাক পরা, কপালে সাদা চন্দনের টানা মস্ত টিপ।এদের মাঝে দু একজন শ্বেতাঙ্গ নারী বা পুরুষও থাকে।এরা এদের সাদা গায়ের রং আর ভারতীয় পোশাকে ভারতীয় গান গেয়ে সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরা সবাই শ্রীকৃষ্ণের পুজারী।তারা রাধা কৃষ্ণের প্রেম, আর পুজার গান গেয়ে যায় অবিরাম, অবিরত। হরে কৃষ্ণ, হরে…হরে…!

তারপর একটু হেঁটে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে তাঁকে।একজন খুবই সাদাসিধে, স্বল্পবসন পরিহিত, ধূসররঙ্গা, ক্ষিনাঙ্গ মানুষ! সকাল, সন্ধ্যা, রাত, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় তাকে ওখানেই দেখা যায়।ত্রিকোনা ঐ পার্কটিতেই ঠাঁই নিয়ে, মানুষটি তাঁর লম্বা অবসর সময় কাটিয়ে দিচ্ছেন।

যখনই ঐ পার্কে যাই পদচারনারত গান্ধীজীর সাথে এভাবেই দেখা হয়ে যায় আমার। ভারত উপমহাদেশে এমন কোন মানুষ নেই যে মহাত্মা গান্ধীর নাম শুনেনি।অন্যান্য অনেক অনেক দেশের বহু বহু মানুষ ‘গান্ধী’ নামটি শুনলেই চিনে ফেলেন কে এই গান্ধী। গান্ধী নামটি শুনলেই তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশেষ একটি মানুষের বিশেষ একটি রূপ।

অনেকে তাকে বাপু বলেও ডাকতো। গান্ধী স্বল্প বসন প্রিয় মানুষ ছিলেন। ধুতি আর চাদর পরিহিত কালো, ছোটখাটো, শুকনো এই মানুষটা হল ভারতের জাতির পিতা। অহিংস মতবাদ ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রবক্তা।

জানি, নতুন করে এই মানুষটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছুই নেই।প্রতিদিন আসা যাওয়ার পথে এই মহামানুষটির সাথে আমার প্রায়শই দেখা হয়ে যায়।প্রতিবারই আমি তাঁর দিকে তাকাই।কেন যেন তাঁকে না দেখে পারিনা।প্রতিবারই তার স্মিত হাসিমুখটি চোখে পরে।

মহাত্মা কথাটির শব্দগত অর্থ হল, মহান আত্মা যার। সুতরাং যেসব মানুষ জনমানবের কল্যাণে নিজের মহানুভবতাকে তুলে ধরতে সক্ষম তাদেরকে মহাত্মা বলা যায়।মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন তেমনি একজন মানুষ। তাই মানবহিতৈষী এই মানুষটি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী নামে।তাঁকে এই উপাধিটি দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এমনি করেই যুগে যুগে কিছু মানুষ আসেন। তাদের নেতৃত্ব, দর্শন, আর জীবনবোধ পাল্টে দেয় গোটা দুনিয়াকে। পরাধীন মানুষেরা খুঁজে পায় স্বাধীনতার স্বাদ। তাদের জীবনাচরণ, আদর্শ ও নীতিবোধ অনুকরনীয় হয়ে ওঠে। অন্ধকারে তারা আলোর মশাল হয়ে পথ দেখান দিশাহীন মানুষদের।নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নতুন করে ভাবতে শেখান। তেমনি এক কিংবদন্তির মানুষ ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। যার আন্দোলনের সূত্র ধরেই অবসান হয়েছিল ব্রিটিশ শাসন। স্বাধীন ভারতবর্ষে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য। যিনি নিজের জীবন দিয়ে রচনা করেছেন কল্যাণের বাণী।

এমনি একদিন, পার্কের পাশটি ঘেঁষে হেঁটে যেতে যেতে, মন চাইলো গান্ধীজীর সাথে একটু কুশল বিনিময় করে যাই। আমি দুটো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে, কালো রঙ গ্রীলের ছোট্ট পাঁচিলটা টপকে পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়লাম।তারপর মশাইয়ের দিকে তাকিয়ে, তার হাত দুটো ধরে, হেসে হেসে জানতে চাইলাম,

–গান্ধীজী, কেমন আছেন আপনি?
–বেশ আছি, পার্কে বেশ আলো বাতাস আছে। মন্দ না।
–সামারে তো ভালই! কিন্তু শীতে? বরফ ঝড়া দিনগুলোতে?
–হুম, তা ঠিক! তখন খুবই কষ্ট হয়।ওরা পার্কেই আমার থাকার ব্যাবস্থা করলো। কি আর করা। তবে আমিতো বরাবরই এধরনের জীবনেই অভ্যস্ত ছিলাম। স্বল্পাহার, সংযম, আর একবস্ত্র এই নীতির বাইরেতো আমি আর যেতে পারিনা।

আমার মনে পরে গেল, এই মানুষটার জন্ম হয় ২রা অক্টোবর ১৮৬৯ সালে। ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামীদের একজন এবং প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন তিনি। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।সত্যাগ্রহের মাধ্যমেই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল। আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অহিংস মতবাদ বা দর্শনের ওপর। আর সেই দর্শনই ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি। গোটা বিশ্বে মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবেও এটিকে ধরা হয়। ভারতসহ গোটা বিশ্বে তিনি মহাত্মা এবং বাপু বা বাবা নামে পরিচিত।

স্বরাজ বা ভারতকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তার অবদান অনস্বিকার্য। গান্ধী ভারতীয়দের লবণ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডান্ডি লবণ কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন।আর এটাই ইংরেজ শাসকদের প্রতি সরাসরি ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। নিষ্ঠুর শাসকদের বিরোধিতা করার কারনে বেশ কয়েকবার দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতে কারাভোগ করতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহান এই নেতাকে মৃত্যু বরন করতে হয়েছিল।

তিনি উদাস চোখে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, জানতো আমি আমার সাতটি মূলনীতি নিয়েই আমার জীবন কাটিয়েছি।আর সেই নীতিগুলো হল,
সত্য: নিজের জীবনকে সত্য অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলাম। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং নিজের ওপর নিরীক্ষা চালিয়ে সত্যকে অর্জন করেছিলাম।

অহিংসা: যখন আমি হতাশ হতাম, আমি স্মরণ করতাম সমগ্র ইতিহাসেই সত্য ও ভালোবাসার জয় হয়েছে। মনে রেখো, দুঃশাসক ও হত্যাকারীদের অপরাজেয় মনে হলেও শেষ সবসময়ই তাদের পতন ঘটে।

নিরামিষভোজন: নিরামিষ খাওয়ার পক্ষে আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও মাঝে মাঝে আমি যোগ দিতাম।জানতো,নিরামিষ শুধু শরীরের চাহিদাই মেটায় না।এটি মাংসের প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও পূরণ করে।তাই আমি নিরামিষ খাওয়াই বসেছে নিয়েছিলাম।

ব্রহ্মচর্য: স্ত্রীর সঙ্গে প্রণয়ের কিছু পরেই আমার বাবার মৃত্যুর সংবাদ আসে।সেই ঘটনা আমার কাছে দ্বিগুণ লজ্জার হয়ে যায়। এই কারণটি আমাকে ৩৬ বছর বয়সে বিবাহিত থাকা অবস্থায়ও ব্রহ্মচারী হতে বাধ্য করেছিল।আমার কাছে ব্রহ্মচর্যের অর্থ হল চিন্তা, বাক্য ও কর্মের নিয়ন্ত্রণ।

বিশ্বাস: একজন সাধারণ হিন্দু হিসেবে আমি সব ধর্মকে সমানভাবে বিবেচনা করতাম।আমি ব্রহ্মবাদে খুবই আগ্রহী ছিলাম। এবং সব বড় ধর্ম নিয়ে পড়াশোনাও করেছিলাম।

সরলতা: আমি প্রবলভাবেই বিশ্বাস করতাম যে, সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি অবশ্যই সরল সাধারণ জীবন-যাপন করবে।আমি নিজেও দক্ষিণ আফ্রিকায় যাপিত পশ্চিমা জীবনাচরণ ত্যাগ করে এটা প্রমাণ করেছিলাম।আমার জীবনাচরণে ছিল অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ফেলা, সাদামাটা জীবন-যাপন গ্রহণ এবং নিজের কাপড় নিজে ধোয়া।

আমি ছিলাম স্বল্প বসনের মানুষ। আন্তর্জাতিক বৈঠকেগুলোতেও এই পোশাকেই উপস্থিত হতাম।লোকে আমাকে দেখে খুব অবাক হত।অনেকে হাসাহাসিও করতো।

গান্ধীজি এবার আমার দিকে তাকালেন।একটু মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,
–তুমি কী পাকিস্তানী না ভারতীয়?
–আমি এই দুটোর কোনটিই না।
–সে কী? তুমি তাহলে কে?
–আমি বাংলাদেশী!
—বাংলাদেশ? ওহ্ বাংলার কথা বলছো? তা পূর্ব না পশ্চীম?

এবার আমিও হাসলাম। বললাম,

–মশাই, কোন জগতে আছেন, বলুনতো?

ইতিমধ্যেই অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। ২০২০ সালও যাবার পথে। বৃটিশরা এখন নিজের ঘর সামলাতেই ব্যাস্ত। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ,ভারত ছাড়, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন কত আন্দোলনইতো আপনারা ভারতীয়রা করেছিলেন। বৃটিশও গেল, দেশও স্বাধীন হল। একদল “বন্দে মাতরম” বলে ভারতীয় রয়ে গিয়েছিল।আরেক দল “পাকিস্তান জীন্দাবাদ” বলে মুসলিম দেশ হয়েছিল। আরেক দল, যারা হিন্দু বা মুসলিম রাষ্ট্র কিছুই চায়নি, শুধু বৃটিশ হটিয়ে স্বাধীন হতে চেয়েছিল, তারা পড়েছিলেন গেড়াকলে।

আপনাদের তৈরি করা সেই রাজনৈতিক দাবার চালে আমরা সাধারন মানুষগুলো এখনও যে গুটি হিসেবেই ব্যাবহৃত হচ্ছি।আপনি মোহনদাস থেকে ‘মহাত্মা’ হয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘কায়েদে আজম’ হয়েছিলেন। বড় বড় নেতাদের চালেই পাকিস্তান হয়েছিল। হিন্দুর কোপে মুসলিম মরল।মুসলিমের কোপে হিন্দু মরল। নেতারা শান্তি, শান্তি বলে খুব চেচাল। অবশেষে আমরা আরেকদল, নানা ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে, জিন্নাহর চাল থেকে বেড়িয়ে পাকিস্তানী থেকে বাংলাদেশী হলাম।

–বাহ্! একেবারে খাঁটী বাঙালি বুঝি?তাই বুঝি বাংলাদেশ নাম হয়েছে?
–হুম, বাঙালিতো বটেই। তবে পূর্বের।পশ্চীমের বাঙ্গালিরা আমাদের সাথে নেই।
–তবেতো তোমরা এখন সুখেই আছ, তাইনা?
–সুখ? শুধু খাঁটি বাঙালি হয়েও আমাদের মনে আজও শান্তি নেই গান্ধীজী। এখনও ঐ যে ধর্ম, এটাই কাঁটার মত আমাদের মনে, ও মাথায় গেঁথে আছে যে। তাই আজও আমরা মুসলিমরা সুযোগ পেলেই তলোয়ার নিয়ে হিন্দু খতম করছি। আর হিন্দুরাও খাড়া হাতে জয় মা কালী বলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
গান্ধীমশাই এবার একটু ভীত স্বরে ফিসফিস করে জানতে চাইলো,
–বল কী? আজও? তাহলে তোমাদের ওপারের পশ্চিম বাংলার ওদের অবস্থা কী? আমার ভারত মাতা সুখে আছেতো?

আমি এবার একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,
–ভারতমাতা? মশাই, আপনার ভারতীয়রাতো এখন দেশমাতাকে ভুলে গরুমাতাকে রক্ষা করার কঠিন ব্রত হাতে নিয়েছে। এখন সেখানে গরুখেকো মুসলিম নিধন যজ্ঞ চলছে। গরু জবাই করলেই মুসলিম জবাই হচ্ছে।

গান্ধীজী দেশভাগের সময়কার সেই ভয়াবহ সব সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় দাঙ্গাগুলোর স্মৃতি মনে করে হয়তো শিউরে উঠলেন।বিষন্ন মুখে বললেন,
–এই যে তুমি বললে, এটা ২০২০ সাল চলছে?এত বছর পরেও কোন পরিবর্তন এলো না?
–হ্যা, তাইতো চলছে।আমরা মানুষরা সহজে বদলাই না।আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না।
–আজও দাঙ্গা, আজও কাটাকাটি, আজও লড়াই চলছে!এসব কী শোনালে আমায় বলতো? এতগুলো বছর চলে গেছে। অথচ এখনো সেই হানাহানিই চলছে।

বললাম, গান্ধীজী, করোনা মহামারীর খবর জানেনতো নিশ্চয়ই? পুরো পৃথিবী জুড়েই এখনও খুব হচ্ছে। সাবধানে থাকবেন। আর মাস্ক ছাড়া কাউকে কাছে একদম ঘেঁষতে দেবেন না। আপনি নিজেও মাস্ক পরবেন সবসময়।

-হ্যা, জানি না আবার! লকডাউনের সময়টাতে একদম একা হয়ে পড়েছিলাম কিনা।বড্ড মন খারাপ হোত। তোমাকেও বহুদিন দেখিনি।

-শুনুন, করোনা সহসা যাচ্ছে না। এই দেখুন না, সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হল বলে।

-শোন মেয়ে, আর আমায় এভাবে এসে জাগিও না। মানুষ জাতির সবাই সুখে আছে, শান্তিতে আছে এটা ভেবেই আমি শান্তি পেতে চাই। এসব খবর আমাকে বড় কষ্ট দেয়….!
তুমি এক কাজ কর ভাই, যাবার আগে আমায় আবার পাথর করে দিয়ে যাও, প্লিজ! দয়া কর….!

আমি ব্যাথিত মনে গান্ধীজীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। মনের কষ্টে বেচারী আবার সেই কালো পাথরের মূর্তি হয়ে গেল!তার স্নিগ্ধ হাসিটি যেন আবার ফিরে এসে তার মুখে স্থায়ী হয়ে গেল!

মনে মনে ভাবলাম, এমন সুদিন কী কখনো আর আসবে?যেদিন এই ধর্মীয় হানাহানী বন্ধ হবে? মানুষ আর মানুষের হাতে প্রাণ হারাবে না। নির্যাতিত হবে না।
আর কতকাল আমরা শুধুই মানুষ হবার জন্য অপেক্ষা করব? ধার্মিক নয়, শুধুই আলোকিত মানুষ!

লেখকঃ শেলী জামান খান, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন