মাতৃগর্ভে শিশুর সংক্রমণ

হাসিবুর রহমান ভাসানী

‘Vertical Transmission’ এ শব্দটার সাথে আমরা অনেকেই কমবেশি পরিচিত। এক কথায় বলতে গেলে গর্ভবতী মা থেকে তার সন্তানের মধ্যে যেসব রোগ ছড়ায় অথবা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় তার মধ্যকার যেসব রোগ সন্তানের মধ্যে পরিবাহিত হয়।এই পরিবহনটাই হচ্ছে ভার্টিকাল ট্রান্সমিশন।

গর্ভবতী মা থেকে তার সন্তানের মধ্যে পরিবাহিত রোগের সংখ্যা খুবই কম। তবে যদি সত্যিই গর্ভের বাচ্চা একবার সংক্রমিত হয়,তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাচ্চার ওপর তার একটা বড়সড় প্রভাব পড়ে। আজকে ভাইরাসজনিত কয়েকটা রোগ নিয়ে কথা বলবো,যেগুলো দিয়ে গর্ভবতী মা থেকে তার সন্তান সংক্রমিত হতে পারে।

১)সাইটোমেগালো ভাইরাস(CMV):

এ ভাইরাসটি আপনার শরীরে ৩-১২ সপ্তাহ সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল থাকলে এর পরিণাম বেশ ভয়াবহ হয়ে উঠবে। যেমন আপনার চোখ,যকৃত,খাদ্যনালী,ফুসফুস এগুলো আক্রমণ করতে পারে। সাধারণত লক্ষণগুলে হচ্ছে:
অবসাদগ্রস্থতা,অল্পমাত্রায় জ্বর,ক্ষুধামন্দা,মাংসপেশিতে ব্যথা, গলাব্যথা,মাথাব্যথা এবং লিম্ফ নোড বড় হয়ে যাওয়া।এ রোগে আক্রান্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই বাচ্চার উপর খুব একটা প্রভাব পড়ে না,
তবে বেশকিছু ক্ষেত্রে ভ্রূণের মৃত্যু,প্রধান স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা(CNS),বধিরতা, চোখের সমস্যা(অন্ধ,ক্ষীণদৃষ্টি) এবং বাচ্চার মাথা স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট(Microcephaly) হতে পারে।
সিএমভি প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকরী ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়নি।

২)রুবেলা ভাইরাস(জার্মান মিজেলস/হাম):

এ ভাইরাসে সংক্রমণের ফলে শরীরে লাল র‍্যাশ, জ্বর(৩৮.৯°সে. এর কম),সর্দি,মাথাব্যথা,চোখ সামান্য গোলাপি বর্ণ ধারণ করা,লিম্ফ নোড বড় হয়ে যাওয়া এগুলো দেখা যায়। এ ভাইরাসটির সুপ্তাবস্থা ১২-২৩ দিন। গর্ভবতী মায়েদের রুবেলা আক্রমণের ফলে তার অন্তরীণ বাচ্চার উপর বেশ প্রভাব পড়ে।যেমন,বাচ্চার মাথা স্বাভাবিকের তুলনায় ছোটো হওয়া(মাইক্রোকেফালি),বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীতা,বধিরতা, চোখে ছানি পড়া,হার্টে সমস্যা(PDA,Septal Defect) এবং ভ্রূণের মৃত্যুও ঘটতে পারে। রুবেলা প্রতিরোধের জন্য এম.আর. ভ্যাক্সিন রয়েছে
যেটি শিশু জন্মের নয় মাস পর দিতে হয়। মূলত ৯মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের দেয়া হয়।৯ মাস পর্যন্ত মাতৃশরীর থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডি শিশুদের সুরক্ষা দিয়ে থাকে(৬-৯মাস)।

৩)পার্ভো ভাইরাস বি ১৯:

এর আক্রমণে শরীরে র‍্যাশ এবং জয়েন্ট ব্যাথা হয়ে থাকে।লক্ষণের উপর ভিত্তি করে এটাকে
5th Disease ও বলা হয়।কারণ ভাইরাসঘটিত ৫টা রোগেই কেবল শিশুদের শরীরে র‍্যাশ দেখা দেয়।এটি সেই তালিকায় পঞ্চম। এ ভাইরাসে আক্রমণের কয়েক সপ্তাহের মাঝেই লক্ষণ প্রকাশ পায়।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি লক্ষণ প্রকাশ করে না।২০-৩০ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা কোনোরূপ লক্ষণ ছাড়াই এ ভাইরাস বহন করে,তবে শতকরা তিন ভাগ গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর আকার ধারণ করে এবং ফলশ্রুতিতে গর্ভপাত,ভ্রূণের মৃত্যু,রক্তস্বল্পতা এবং বাচ্চার শরীরে মাত্রাতিরিক্ত ফ্লুইড জমে যেতে পারে।

৪)এইডস:
এইডস আক্রান্ত মা যদি তার সন্তানকে বুকের দুধ পান না করান তবে সেক্ষেত্রে তার সন্তান আক্রমণের সম্ভাবনা ১৫-৩০% এবং যদি তিনি তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান তবে সে সম্ভাবনাটা বেড়ে দাঁড়ায় ২০-৪৫% এছাড়া যদি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সচেতনভাবে বাচ্চা জন্মদান করেন তবে সে বাচ্চার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২% এরও কম।

৫)হেপাটাইটিস বি ও সি:

এটি সাধারণত গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মা থেকে ভ্রূণে সংক্রমিত হতে পারে না। তবে সন্তান জন্মদানের সময় নবজাতক আক্রান্ত মায়ের রক্তের সংস্পর্শে আসায় তারও সংক্রমিত হওয়ার খুব বড় একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে নবজাতককে জন্মের ১২ ঘন্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকার প্রথম ডোজ এবং .৫ মিলি. হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবিউলিন(HBIG) প্রদান করা অত্যাবশকীয়। একইসাথে জন্মের ৬ মাসের মধ্যে শিশুকে ভ্যাক্সিনের সবকটি ডোজ প্রদান করতে হবে।(তথ্যসূত্র;হেপাটাইটিস বি ফাউন্ডেশন,ইউএসএ)

মূলত প্লাসেন্টা(অমরা/গর্ভের ফুল) বাচ্চার শরীরের রক্তের সাথে মায়ের শরীরের রক্তকে মিশতে দেয় না যাতে করে বাচ্চার শরীরে মায়ের থেকে কোনো রোগ সংক্রমিত হতে না পারে।

গর্ভবতী মায়ের শরীরের রক্ত প্লাসেন্টার মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে সেখান থেকে অক্সিজেন,গ্লুকোজ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান নাভীরজ্জু/নাড়ির মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে পৌঁছায়।

এছাড়াও প্লাসেন্টা(গর্ভের ফুল) মায়ের শরীর থেকে IgG অ্যান্টিবডি বাচ্চার শরীরে নিয়ে যায় যাতে করে জন্ম পরবর্তী সময়ে বাচ্চা রোগ ব্যাধির হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে।

লেখকঃ কলামিস্ট ও মেডিকেল ছাত্র

 

আরও পড়ুন