জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুলঃ স্কুলকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম

আয়েশা সিদ্দিকা

গ্রামের একটি পুরোনো স্কুলকে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখবে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সেই সংগ্রামের দিকটিই ফুটে উঠেছে। হুমায়ূন আহমেদের ছোট্ট পরিসরের এই উপন্যাসটি এক বসাতেই যেমন শেষ করা যায় তেমনি অনুভূতিতে গভীরভাবে দাগ কেটে যাবে। এবং এর ঘোর রয়ে যাবে অনেক সময়। বইটির শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত না পড়ে ওঠা দুঃসাধ্য ব্যাপার হবে পাঠকের কাছে। হুমায়ূন আহমেদের এই বইটি ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়।

নীলগঞ্জের একজন ব্যক্তির নামে স্কুলের নামকরণ করা হয় যার নাম ছিল জীবনকৃষ্ণ রায়। উনি অনেক ধন-সম্পদের মালিক ছিল। একদিন হঠাৎ করেই তার মনে হলো যে “খালি হাতে জন্মেছি, খালি হাতেই মরতে হবে”। তাই তিনি তাঁর সব সম্পত্তি দান করে দেন এবং একটা স্কুল বানান। সেই স্কুলটির নামই দেওয়া হয় “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল”।

এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মূলত এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফজলুল করিম। যার ধ্যান ধারণাই শুধু স্কুলকে ঘিরেই। বলা যায় তিনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান শিক্ষক আবার স্কুলের প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসা, ছাত্রদের প্রতি রয়েছে বাৎসল্য।এই স্কুলকে ঘিরেই রয়েছে তার মর্মান্তিক স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মিলিটারিরা এ স্কুলে ক্যাম্প বসায়। কিন্তু স্কুলের হিন্দু নাম তাদের পছন্দ হলো না। নাম পরিবর্তন করে রাখতে চায় একটা মুসলিম নাম ” কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী হাইস্কুল”। ফজলুল করিম সাহেব তার বিরোধিতা করলে তাকে বিবস্ত্র করে স্কুলের চারপাশে ৫০ বার চক্কর দেওয়ায় ।

স্কুলের অবকাঠামোগত অবস্থা খুব শোচনীয় ছিল শিক্ষকদেন বেতন দিতে না পারা। তার ওপর স্থানীয় মন্ত্রী সিরাজ সাহেব গ্রামে ‘নীলগঞ্জ হাইস্কুল’ নামে একটি উন্নত স্কুল দেন। যার ফলে নতুন স্কুলের জৌলুশে অনেক ছাত্র শিক্ষক সেখানে চলে যায়। আর ছাত্র কম থাকায় বন্ধ হয়ে যায় একটি সরকারী অনুদানও।

চারদিকেই যখন অন্ধকার ফজলুল করিম স্যার তখনও আশার প্রদীপ দেখতে পান এস. এস. সি পরীক্ষার্থী বদরুলকে নিয়ে ।ফজলুল করিম স্যারের ধারণা যদি বদরুল বোর্ড স্ট্যান্ড করে তবেই স্কুলটা টিকে যাবে। শুরু হয় এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে নতুন যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মাহাবুব স্যার, অংক স্যার বিনয় বাবু সাথে না থাকলেও তার সারথি হয়েছিলেন ধর্ম স্যার ইরতাজউদ্দীন এবং শহর থেকে আসা মেধাবী স্যার মামুন।

কিন্তু সমস্যা হলো শেষ পরীক্ষার আগের দিন বদরুলের ভীষণ জ্বর হয়। শেষ পর্যন্ত কি সে পরীক্ষা দিতে পারে? ফজলুল সাহেবের আশার প্রদীপটা কি নিভে যায় নাকি জ্বলে ওঠে? নতুন স্কুলের জৌলুশে পুরোনো স্কুল বিলুপ্ত হয়?

জানতে ছোট্ট উপন্যাসটি পড়ে ফেলুন যারা এখনো পড়েন নি।

পছন্দের কিছু লাইনঃ
১. সরকারী অফিসাররা দেখি শব্দটা প্রচুর বলে কিন্তু কিছু দেখেনা।

২.মঙ্গল সব সময় অমঙ্গলের পেছনে থাকে।

৩.ব্যক্তিগত কাজেতো আর স্কুলের জিনিস ব্যবহার করা যায়না, স্কুলের সময়ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যায়না।

৪.প্রচন্ড রাগ নিয়ে কঠিন কথা ঠিক না। কঠিন কথা বলতে হয় ঠান্ডা মাথায়। খুব ঠান্ডা মাথায়।
৫.সত্য আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। অসত্য বিশ্বাস করি, কারণ অসত্য বিশ্বাস করানোর জন্য শয়তান আমাদের সবসময় প্ররোচিত করছে।

৬.ভয়ের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক আছে। আদর করে কোলে বসিয়ে শিক্ষা হয়না।

৭.ভালো স্কুলের পূর্ব শর্ত হল ভালো শিক্ষক। দালান কোঠায় স্কুল হয় না। স্কুল হয় শিক্ষকে।

৮.স্বার্থ ছাড়া মানুষ সচরাচর কষ্ট করতে রাজি হয়না।

৯.সারভাইভেল ফর দি ফিটেস্ট। যে ফিট সে টিকে থাকবে। যে আনফিট তাকে চলে যেতে হবে। এটা জগতের কঠিন নিয়মের এক নিয়ম।
১০. একজন ভালো শিক্ষক ১০০ হাতির সমান।

১১.পল্লীগ্রামের সমস্যা একটা থাকে না। পল্লীগ্রামের সমস্যা থাকে একহাজার একটা।

১২.ইমার্জেন্সির সময় কোন আইন কানুন থাকে না। সাধারণ সময়ের সাধারণ আইন। জরুরী সময়ের জরুরী আইন।

১৩.প্রতিষ্ঠান কখনো বড় হয় না। প্রতিষ্ঠানের পেছনে মানুষরা বড় হয়।

১৪. মানুষ গল্প তৈরি করতে পছন্দ করে।

সংক্ষিপ্ত পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ

উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ডের একটি উক্তি-

“মাঝারি মানের শিক্ষক বলেন, ভালো শিক্ষক বুঝিয়ে দেন, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক করে দেখান, মহান শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন”।

ফজলুল করিম স্যারকে আমার মহান শিক্ষক বলেই মনে হয়। এমন শিক্ষকের প্রতি শুধু শ্রদ্ধাই আসে। ( আমার জীবনে আমি মাঝারি, ভালো,শ্রেষ্ঠ সব শিক্ষকেই পেয়ে গেছি। মহান শিক্ষকের জায়গায় শ্রদ্ধেয় শাহাদাত হোসেন স্যারকেই রাখতে চাই)

উপন্যাসের সাথে যেন বর্তমানেরও অনেক মিল আছে। নতুন নতুন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কিন্তু তেমন শিক্ষক আর নেই। ফজলুল করিম স্যারের মতো কর্তব্যপরায়ণ স্যার কজনেই বা আছে। যে অল্প কয়েকজন আছে তাঁদের জন্যই হয়তো এখনো শিক্ষার্থীরা আলোর মুখ দেখে, জ্ঞান আহরণে উন্মুখ হয়ে ওঠে, অনুপ্রাণিত হয়, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকে সর্বোপরি সমাজ টিকে যায়।

লেখকঃ কলাম লেখক 

আরও পড়ুন