বই পর্যালোচনাঃ একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়

সানজিদা ইয়াসমিন

বইঃ “একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায় ”
লেখকঃ রউফুল আলম

রউফুল আলম স্যার সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে অর্গানিক কেমেস্ট্রিতে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছন। এরপর সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটির স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব প্যানসেলভ্যানিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।

উনার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও গবেষনা বিষয়ে গভীরভাবে জানার সুযোগ হয়েছে, এবং গভীর জ্ঞান রয়েছে, তা এই বই টা পড়লেই বোঝা যাবে।
উনি যে একজন লেখক, এবং বৈজ্ঞানিক তা লেখক পরিচিতি তেই আছে।তবে আমার মতে উনি একজন পরিকল্পক,সুচিন্তক। এবং সমগ্র দেশ কে দাঁড় করানোর জন্য যে গবেষনা করেই বইটি লিখেছেন। তা এই বইটি না পড়লে বোঝা সম্ভব না।

এবার আসি বই সম্পর্কে,একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায় বইটি পড়ে মনে হচ্ছে অনেক দেরীতে পড়লাম। আরো আগে পড়া উচিত ছিল। আরো আগে কেন পড়লাম না এমন মনে হচ্ছে। এই বইটি অবশ্যই পাঠ করার মত বই। যা সবার পড়া উচিত।

আমি বই পড়ার সময় দাগ দিয়ে পড়ি, যে লাইনগুলো বেশি হৃদয় কাড়ে। তবে এই বইটি পড়তে পড়তে আমি দাগাইতে পারছিলাম না, কেননা প্রতিটি লাইনই সুখপাঠ্য যে কোন লাইন দাগাবো আর কোনটা দাগাব না বুঝতে পারছিলাম না। প্রতিটি প্রবন্ধের প্রতিটি লাইন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশপ্রেম, দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, স্নিগ্ধ ইচ্ছে শক্তি, নিজের দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে দাড় করানোর আকুলতা, দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, জ্ঞানপিপাসা না থাকলে এত সুন্দর একটা বই লিখা সম্ভব না। একটি দেশ যেভাবে দাঁড়াবে তার সর্বোচ্চ পরিকল্পনা ও রুপরেখা এই বইয়ে নিহিত। 

একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায় ৬৩ টি প্রবন্ধ নিয়ে রচিত একটি বই। যে বইয়ের প্রতিটি প্রবন্ধ, প্রতিটি লাইন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বই থেকে কিছু কিছু প্রবন্ধের কয়েকটি করে লাইন তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
কর্মে হোক জন্ম জয় প্রবন্ধে,
দারিদ্র্য নিয়ে হা- পিত্যেশ করে,দারিদ্র্য কে জয় করতে ভয় পায়।
আমার কাছে যারা এই দুঃখ করে, তাদেরকে আমি পাথর থেকে ভাস্কর্য হওয়ার কথা বলি। পথের ধারে পড়ে থাকা পাথরকেও লক্ষ করে না,অথচ সে পাথর দিয়েই যখন ভাস্কর্য তৈরি করা হয়, মানুষ সেটি শিল্পের চোখে দেখে।

দেশটা যেভাবে হেরে যায় প্রবন্ধে, দুনিয়ার সবকিছু তৈরি করে মেধাবীরা, আর মেধাবীদের তৈরী করে শিক্ষকেরা।শিক্ষকেরা হলেন কারিগরদের কারিগর।

সজাগ হও, হে তারুন্য প্রবন্ধে,

তুচ্ছ মানুষের পিছনে স্লোগান দিয়ে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় নষ্ট না করে, নিজের স্বপ্ন তাড়া করা অনেক উত্তম। মানুষ শুধু বিজয়ীর কথা শুনতে চায়। তোমার কি নেই, সেটা শুনতে কেউ বসে নেই। যা নেই তা নেই। যা আছে, তা দিয়েই সংগ্রাম করো।

সম্ভাবনাকে জাগতে দিন প্রবন্ধে,

পরিবারের “মেন্টাল সাপোর্ট ” মানুষের উদ্যম ও প্রচেষ্টা বহুগুণে বাড়ায়।অন্য যে কিছুর চেয়ে এটা ঢের গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন প্রবন্ধে

দক্ষতা অর্জনের নেশা থাকলে, সময়ই তোমাকে পৌঁছে দেবে লক্ষ্যে।
কত ভিন্নভাবে একটা বিষয়কে ভাবা যায়, ব্যাখ্যা করা যায়।জ্ঞানের জন্য জ্ঞানী খোঁজো, জ্ঞানীর আলয় খোঁজো।

কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন? প্রবন্ধে,
একুশ শতকে একটি মেধাবী মনই একটি দুর্গ।
শব্দ চয়নে তুমি হয়ে যাও এক শ্রেষ্ঠ লেখক।
ক্যামেরা হাতে তুলে ধরো পৃথিবীর অন্যায়। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে তৈরি করো সহস্র প্রাণ।
তোমার মায়ের কথা ভাবো। কতদিন তোমার কথা ভেবে তিনি কেঁদেছেন। তোমার কীর্তিতে সুখের অশ্রুতে ভিজবে তোমার মা- বাবার মুখ।
তোমার গৌরবের সৌরভে মোহিত হবে বিশ্ব। নিজে জাগো, জগৎ জাগাও। সোনালি যৌবনকে অন্ধকারে ছুড়ে দেওয়ার আগে বহুবার ভাবো।

নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ প্রবন্ধে,
যাকে শোভা পায় যেখানে সেখানেই রাখো।
সশরীরে উপস্থিত থেকে, নোবেল প্রাইজ অনুষ্ঠান দেখার এক বিরল সুযোগ হয়েছিল আমার। দেখলাম, নোবেল বিজয়ীরা সবার শেষে হলে ঢুকলেন। এটাই নিয়ম। কারণ, তাঁরা যখন হলে ঢোকেন, তখন সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। এমনকি দাঁড়াতে হয় রাজা( Swedish King) ও রাজপরিবারকে। যদি রাজা সবার শেষে হলে ঢুকতেন, তাহলে নোবেল বিজয়ীদের দাঁড়াতে হতো। কিন্তু সেটা তো হতে পারে না। যাঁরা জগতের রাজা, তাঁরা একটি রাজ্যের রাজার সম্মানে দাঁড়াতে পারেন না। সেজন্য শেষোক্ত নিয়মটি করা হয় নি।নোবেল বিজয়ীদের জন্য রাজাকে দাঁড়াতে হবে।
যে জাতি যেটির মুল্যায়ন করে, সে জাতি সেটিই পায়। আমরা দেশভর্তি নেতা পেয়েছি। পশ্চিমের দেশগুলো পেয়েছে পৃথিবী বদলে দেওয়া মানুষ।

অন্তর বাহিরে দাসত্বের রজ্জু প্রবন্ধে,

দাসত্বের রজ্জু থেকে নিজেকে মুক্ত করো।অন্যের দাস হয়ে থাকার চেয়ে আপন ভুবনে রাজা হওয়া শ্রেষ্ঠতম।

একটা মশা তোমার চেয়েও ক্ষুদ্র, তবে তোমার ঘুম হারাম করে দিতে পারে। মানুষ ক্ষুদ্র হয় তার কর্মে ও ভাবনায়। বড়ও হয় কর্মে ও ভাবনায়।
সত্য সুন্দরের জন্য কন্ঠ তোলো। দেশের জন্য দাঁড়াও।

শিক্ষার আলোয় জাগুক স্বদেশ প্রবন্ধে,

শিক্ষা যদি হয় একটা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষাঙ্গনগুলো হলো সে মেরুদণ্ডের কশেরুকা।
একটা দেশ যখন শিক্ষাকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করে, সে দেশ সহজে রুগ্ন হয় না। শিক্ষাকে রুগ্ন রেখে কোনো সমাজ দাঁড়াতে পারেনি।

সম্ভাবনার দুয়ারে আছ দাঁড়িয়ে প্রবন্ধে,

শেখার জন্য, যোগাযোগের জন্য , তথ্য জানার জন্য ইন্টারনেট এক সম্ভাবনার নাম।
ইন্টারনেটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাও। ইন্টারনেট হলো রুপকথার সে দুয়ারের মতো, যার দুদিক দিয়েই প্রবেশ করা যায়। একদিক দিয়ে প্রবেশ করলে আলোকিত আনন্দভুবন।

আলোকিত সমাজের মুলমন্ত্র প্রবন্ধে,
মানুষ যখন আলোচনা করে তখন তার দৃষ্টি খোলে।
আলোচনা হতে হয় নিঃসঙ্কোচ এবং নির্ভয় চিত্তে । চিত্তে দিধা নিয়ে আলোচনা হয় না। সেটার নাম কথাবার্তা।

আরগুমেন্ট ছাড়া জ্ঞান হলো জড়- অসাড়! যুক্তির তর্কে যে সমাজ বেয়াদবি’র ট্যাগ দিয়ে চাপিয়ে রাখে, সেখানে বিয়াদবই থাকে – আলোকিত মানুষ থাকতে পারেন না।

নিজেকে আবিষ্কার করো প্রবন্ধে,

নিজেকে যাচাই না করে, নিজেকে পরখ না করে শুধু একমুখী ঝোঁকে, ঝাঁকের পালের সঙ্গে দৌড়ান সেটা দুঃখজনক। আমাদের দেশে যে বিসিএস জ্বর এসেছে, সেখানে সম্ভাবনার খুন হতে আমি দেখেছি।
কেউ যদি নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা না করে নিজেকে সঁপে দেন, তাহলে তিনি বহুজনকে বঞ্চিত করেন।

জাগরনের কাল প্রবন্ধে,

একজন মানুষকে পুরো দেশ বদলে দিতে হয় না। প্রত্যেকে যদি নিজেকে বদলানোর ব্রত নিয়ে লেগে থাকে, সেটাই অনেক বড় দেশপ্রেম।

ডিজিটাল ইগনোরেন্স প্রবন্ধে,
আমি চোখ বন্ধ করে যদি মনে করি দুনিয়াটা অন্ধকার, তাহলে আমি নিজেই অন্ধকারে রইলাম।

চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি প্রবন্ধে,

জ্ঞান কে আমরা নিয়মের মধ্যে বেঁধে রেখেছি। মেধাকে বেঁধে রেখেছি জিপিএ এবং রেজাল্টের ফ্রেমে।

হৃত কৌতূহলী মগজ প্রবন্ধে,
মানুষের আগ্রহের চেয়ে সুন্দর ও বিশুদ্ধতম আর কিছু নেই।
বিষ্ময়হীন, কৌতূহলহীন, প্রশ্নহীন মানুষেরা হয় নৈরাশ্যবাদী
জিনিয়াস মাইন্ড প্রবন্ধে,
মানব সভ্যতার অনন্যসাধারন সৃষ্টিগুলো এসেছে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে।

পরিশেষে একটা কথায় বলতে চাই,
দেশের প্রতি যদি ভালোবাসা থাকে, তাহলে দেশকে উন্নত দেশে পরিনত করতে হবে। আর তার জন্য হলেও প্রত্যকের পড়া উচিত ” একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায় ” বইটি । কেননা বইটিতে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে, সুখপাঠ্য করে দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর সমস্যার সমাধান। দেশকে উন্নত করার পরিকল্পনা। এমনকি নিজের মনও বিকশিত এবং প্রশস্ত হবে।

আরও পড়ুন