বই পর্যালোচনাঃ জীবন যেখানে যেমন

আরিফ আজাদ

খুব ছোটবেলা থেকেই আমি গল্প-পাগল। যেখানেই গল্পের গন্ধ পেয়েছি, সেখানেই ডুবিয়ে দিয়েছি চোখ। গল্প পড়তে, গল্প শুনতে আমার দুর্নিবার আগ্রহ। আমার মনে পড়ে শৈশবের কথা। জোসনা-ভরা রাতে উঠোনে মাদুর পেতে আমরা গোল হয়ে বসতাম। আমাদের মাঝে কখনো গল্প-কথক হিশেবে থাকতেন আমার দাদী, কখনো-বা আমার জেঠু। মাঝেমধ্যে বাবাকেও পাওয়া যেতো। তারা পুরোনো দিনের রাজা-রানীর গল্প, রাক্ষস-খোক্কসের গল্প, জ্বীন-ভূতের গল্প বলে আসরে মোহ সৃষ্টি করতেন। কোন কোন গল্প শুনে বিষাদে ছেঁয়ে উঠতো আমাদের মন। আবার কোন কোন গল্প শুনে গায়ের রক্ত হিম হয়ে যেতো ভয়ে। গল্প আমাদের মাঝে যে অনুভূতিই তৈরি করুক— গল্প শোনার ব্যাপারে আমরা ছিলাম একেবারে নাছোড়বান্দা।

সেই থেকে হয়তো—

গল্প আমার জীবনের একটা অনুষঙ্গ-ই হয়ে দাঁড়ালো। মানুষকে গল্প শোনাবার এক তীব্র আকর্ষণ, সুতীব্র বাসনা আমার মাঝেও প্রবল হয়ে উঠে। আমার লেখা প্রথম বই ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ সম্ভবত সেই আগ্রহ আর বাসনার এক যৌথ সম্মিলন। সাজিদ সিরিজে আমার আলোকপাতের বিষয়গুলো অনেক বেশি কাঠখোট্টা। সেই কাঠখোট্টা বিষয়বস্তুকে গল্পাকারে উপস্থাপনের ভূতুড়ে চিন্তা নেহাত গল্প-পাগল না হলে কি সম্ভব হতো?

প্রচলিত আছে— সাহিত্য হলো সমাজের দর্পণ। একটা সমাজ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই সমাজের মানুষগুলো কি ভাবছে, কীভাবে ভাবছে, সেই সমাজের তরুণেরা কোন পথে আছে, জোয়ানরা কীভাবে দিন পার করছে, বৃদ্ধরা কীভাবে ছিলো, সভ্যতা বিনির্মাণে সেই সমাজের অবদান কতোখানি— সাহিত্যের মাঝে তাবৎ সবকিছুর দেখা মিলে। কারণ, সাহিত্য ধারণ করে সময়কে আর সাহিত্যিকেরা সময়কে বন্দী করে যান কাগজের ফ্রেমে।
বলা বাহুল্য, বাংলা সাহিত্য হিশেবে আমরা যা পড়ি বা পড়ে এসেছি, তাতেও যদিও-বা সময়ের একটা চিত্র ফুটে উঠেছে, কিন্তু নিদারুনভাবে যা অনুপস্থিত থেকে গেছে তা হলো— এদেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষের জীবনাচার। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ যে ধর্মমতে বিশ্বাসী, যে ধর্মবিশ্বাস এখানে বহুযুগ ধরে শেকড় গেঁড়ে আছে, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়— সেই জীবনাচার, সেই বিশ্বাসের বিষয়বস্তু আমাদের বাংলা সাহিত্য সমাজে স্থান পায় নি।
সাহিত্য কল্পনা-নির্ভর, কিন্তু কল্পনার সূত্রপাত হয় বাস্তবতা থেকে। চারপাশের মানুষের জীবনাচার, জীবনপদ্ধতিই হলো সাহিত্যের মূল নিয়ামক। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ্যনীয় যে— আমাদের সাহিত্য সমাজে আমাদের চারপাশের সেই জীবনাচার, সেই জীবনপদ্ধতি অনেকাংশেই ব্রাত্য।

মানুষকে প্রেম-ভালোবাসা শেখাতে ব্যস্ত থাকা আমাদের সাহিত্যিক সমাজ কোনোদিন এই জীবনাচার, এই জীবনপদ্ধতির ভিতরে ঢুকে দু’কলম লিখবার তাড়না কেনো যে অনুভব করেন না— সেটাই বড় আশ্চর্যের।

আরেকটা ব্যামোর কথা বলি— এদেশে মোটা দাগে যাদের আমরা সাহিত্যিক বলে চিনি, তাদের কাছে ইসলামি জীবনাচার সমৃদ্ধ যে সাহিত্য, সেই সাহিত্য কখনোই ‘বাংলা সাহিত্য’ নয়, সেটাকে তারা বলেন ‘ইসলামি সাহিত্য’। কেবল ইসলামি অনুষঙ্গ, ইসলামি জীবন-ব্যবস্থাকে সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলতে গেলেই সেই সাহিত্যকে তারা ধরেবেঁধে বাংলা সাহিত্যের গণ্ডি থেকে বের করে দিচ্ছেন!

অথচ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন স্বরস্বতী পূজোর বন্দনা করে কোন গল্প লিখে, কিংবা বুদ্ধদেব বসু যখন ‘মহাভারতের পথে’ নামক বই লিখে, অথবা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের লেখায় যখন গভীরভাবে ফুটে উঠে সমাজতন্ত্রের সুর— আমরা কিন্তু তখন তাদের বাংলা সাহিত্য থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিই না। আমরা বলি না ওটা ‘হিন্দু সাহিত্য’ কিংবা ‘কমিউনিস্ট লিটারেচার’, আমরা বরং তাদের আরো মহান, আরো উদার হিশেবে গণ্য করি। কেবল সাহিত্যের মধ্যে ইসলামি দর্শন ঢুকলেই আমাদের যাবতীয় আপত্তি— ওটা বাংলা সাহিত্য নয়, ওটা ইসলামি সাহিত্য।
বাংলা সাহিত্যের দুনিয়া থেকে এই খবরদারির অবসান কবে হবে?

এই খবরদারির অবসানের একটা রাস্তা আমি চিনি— অনেক বেশি ইসলামি জীবন-দর্শন নির্ভর সাহিত্য রচনা করা এবং সেই সাহিত্যগুলোকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দেওয়া। সাহিত্যের মাঝে এতোদিন যেখানে অবাধ মেলামেশার কথা থাকতো, আমরা সেটাকে হালাল মেলামেশার গল্প দিয়ে ঢেকে দেবো। ইসলামি জীবনাচারের সকল অনুষঙ্গ নিয়ে আমরা গল্প লিখবো, কবিতা লিখবো, লিখবো উপন্যাস। তাহলেই, আমাদের এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো একদিন বিশাল ঢেউ হয়ে সমুদ্রের কূলে আছড়ে পড়বে আর সেই ধাক্কার রেশ বিস্তৃত হবে অনেকদূর, ইন শা আল্লাহ।

বলা যায় এমন একটা চিন্তা থেকেই ‘জীবন যেখানে যেমন’ গল্পের বইটির সূত্রপাত। ইসলামি জীবন-দর্শন নিয়েও যে গল্প লেখা যায়, ইসলামকে উপজীব্য করেও যে রচনা করা যায় সাহিত্য— এই বোধটা জাগ্রত করবার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াসের নাম ‘জীবন যেখানে যেমন’।

বইতে বেশ অনেকগুলো গল্প আছে। আমি চেষ্টা করেছি গল্পগুলোকে গতানুগতিকতার আবহ থেকে যথাসম্ভব দূরে রেখে এমন এক ধারা তৈরি করতে একজন গল্প-পাঠককে যেমন গল্পের আনন্দে দেবে, অন্যদিকে ইসলামি জীবনাচারের ব্যাপারেও একজনকে করে তুলবে শ্রদ্ধাশীল।

জীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে গল্প লিখবার চেষ্টা করেছি। গল্পে কখনো পিতা, কখনো সন্তান, কখনো স্বামী আর কখনো নিরেট বন্ধু হিশেবে জীবনকে দেখাতে চেয়েছি। জীবনের বহু দিকের গল্প যেহেতু আছে, তাই গল্পগ্রন্থটির নামকরণ করেছি ‘জীবন যেখানে যেমন’।

সাজিদ সিরিজের বাইরে এটি আমার প্রথম একক মৌলিক গল্পগ্রন্থ। প্রথম কাজ হিশেবে এতে ভুলত্রুটি থেকে যাবে এটাই স্বাভাবিক। সেই ভুলগুলো একান্ত আমার নিজস্ব ভেবে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবার এবং সেগুলো সংশোধন করবার সুযোগ পাবো—এটাই কাম্য। গল্পগুলো কতোখানি গল্প হয়ে উঠেছে কিংবা বইটি সাহিত্যমানে কতোখানি উত্তীর্ণ সেই আলাপ বোদ্ধা মহলের জন্য তোলা থাকুক।

মহান রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে করজোড়ে ফরিয়াদ— তিনি যেন আমাদের ভুলগুলো মাফ করে দেন এবং আমাদের কাজগুলোকে অনন্ত জীবনে নাযাতের উসিলা বানিয়ে দেন, আ-মিন।
‘জীবন যেখানে যেমন’ বইয়ের ‘লেখকের কথা’ থেকে…

লেখকঃ জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও জীবন যেখানে যেমন বইয়ের লেখক 

আরও পড়ুন