বুক রিভিউঃ কেউ জানে না

আরিফ মিলনঃ

বইয়ের নাম : কেউ জানে না
লেখকের নাম : এবিএস রুমন
ধরণ : গল্পগ্রন্থ/ গল্পোপন্যাস
প্রচ্ছদ : আশিকুর রহমান
প্রকাশক :  বদরুল মিল্লাত (নহলী)
প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০১৯
মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা মাত্র

একটি মায়ের গল্প আর একটি বাবা-মেয়ের গল্প মিশে গেল আরেকটি গল্পের সাথে। মিলে গিয়ে হয়ে গেল গল্পপোন্যাস। যেমন করে নদীর ত্রিমোহনা ভিন্ন ভিন্ন গতিপথের নদীর মিলনস্থলের স্বাক্ষী হয়ে থাকে।

বইয়ের প্রথম গল্পের নাম ‘মা।’ যেখানে একজন পতিতা নারীর মা ডাক শুনতে চাওয়ার করুণ আর্তি ফুটে উঠেছে। কিন্তু পরের ছেলের মুখে মা ডাক শুনতে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এর উপরে তিনি পতিতা। যার মুখে শুনতে চাওয়া হয়, সেই তো সবকিছু নয়। পারিবারিক ও সামাজিক শাসন বারন আর কিশোর মনের সংকোচের ঘেরাটোপে কখনো মা বলা হয়ে উঠেনি।

দ্বিতীয় গল্প তালিশ উদ্দিন ও তার মেয়ের গল্প। মা ছাড়া মেয়ে তিথি। বাবা-ই তার মা। বাড়ি ছাড়া থাকবেন না বলে যে তালিশ উদ্দিন চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলেন, তিনিই মেয়েকে ঠেলে পাঠালেন পড়াশোনা করত— রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু স্ত্রীর মত মেয়েকেও হারালেন হঠাৎই। সড়ক দুর্ঘটনায়। তবুও জীবন বহমান। মেয়ের অনুপস্থিতিতেও মেয়েকেই যেন খুঁজে পান, তার দান করে যাওয়া হ্নদপিন্ড ও চোখের মধ্য দিয়ে। মেয়ের চোখ দিয়ে আলো দেখে অন্য কেউ। তবুও তো মেয়ের চোখ। সেজন্যেই লেখক বলেছেন, “এ এক অদ্ভুত বেঁচে থাকা। এ এক অদ্ভুত বাঁচিয়ে রাখা।

বইয়ের নামই শেষ গল্প। যেখানে উঠে এসেছে একটি বৃদ্ধাশ্রমের কথা; একজন সুফিয়ার কথা আর একজন শারমিনের কথা। বয়োবৃদ্ধ এই দুই নারীর জীবন হয়ত পড়ে থাকে বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে, লনে কিন্তু মন যেন পড়ে থাকে নিজ সেই বাড়িতে, সন্তান সন্তুতির কাছে। যেখানে আজ তাদের কোনো অধিকার নেই। হয়ত তারা সেখানে বেমানান। শিক্ষায় কিংবা আচার অনুষ্ঠানে।

শাহরিয়ার উদ্দিন। ডাক নাম শুভ। হ্যা সেই শুভ। প্রথম গল্পের মিনু মায়ের টেপু। সুফিয়ার একমাত্র সন্তান। দ্বিতীয় গল্পের তিথির ভালবাসা। আর শেষ গল্পের আজকের নামকরা লেখক। শাহরিয়ার উদ্দিন। যেখানে মিলিত হলো তিন গল্পের মোহনা

যার মন কোনো একদিন অন্য কারো মাকেও মা বলে ডেকেছিল। তারই মা সুফিয়া আজ বৃদ্ধাশ্রমে। শারমিন একদিন বলেছিল, “অনেক বেশি পাপ করলে মানুষ মেয়ে হয়ে জন্মায়। তার চেয়ে বেশি পাপ করলে সে হয় মা।”

নিজের সবকিছু থেকে গুটিয়ে নেয়া সুফিয়া সেদিন কোনো উত্তর করেননি। মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া চিঠিতে তিনি বলেছেন, “আমার কী মনে হয় জানো? মনে হয়, অনেক বেশি পাপ করলে মেয়েরা মা হয়। তারচেয়ে বেশি পাপ করলে সে হয় মা, তথাকথিত যোগ্যদের মা কিংবা বিখ্যাত কোনো লেখকের মা।”

একজন মায়ের আহাজারি বিঁধেছিল শারমিনের মনে প্রাণে। নিজের দুঃখ হার মেনেছিল অন্তপ্রাণ সুফিয়ার কষ্ট গাঁথা নিকট অতীতের কাছে।

তাইতো শাহরিয়ার যখন মায়ের কবর জিয়ারত করতে এসে শারমিনের সাথে দেখা হলো, তখন তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। সেই ছুঁয়ে যাওয়া পা তিনি ধুয়ে তারপরে ঢুকলেন গোরস্থানে। বিস্মিত শাহরিয়ার বলল, “খালাম্মা, আপনার পা তো পরিষ্কারই ছিল, তাও ধুলেন যে?”

গল্প এখানেই শেষ হলো যখন শারমিন বললেন, “হু ধুলাম, কারণ কোনো অপবিত্র ছোঁয়া নিয়ে আমার পবিত্র বন্ধুটাকে দেখতে যাব না।”

#পাঠ_অনুভূতিঃ বইটা শেষ করা হয়েছে বেশ কয়েকদিন। কিন্তু লিখব লিখব করে লিখা হয়ে উঠছিল না। সেক্ষেত্রে স্মৃতির মরিচিকায় এই বই পাঠের অনুভূতি কিছুটা ফিকে হয়েছে বৈকি। তবে নিরপেক্ষ ভাবে বললে বলতে হয়, বইটি সুখপাঠ্য।

তবে এর একটা অন্যতম দূর্বল দিক রয়েছে। বিশেষত তিনটা আলাদা আলাদা গল্পকে শেষ গল্পের মধ্য দিয়ে একসূত্রে গেঁথে দেয়া হয়েছে। প্রথম গল্পের সাথে এর একটা যোগসূত্র থাকলেও “তিথি” গল্পের সাথে এর কোনো প্রকার সংযোগ নেই।

মিনু মায়ের সেই টেপু তথা শুভকে আমরা শেষ গল্পে শাহরিয়ার উদ্দিন নামে পেয়েছি। যে কি-না বর্তমানে একজন বড় লেখক। মা গল্পে শুভকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায়।

কিন্তু তিথি গল্পে শুভ বা অন্য নামে একইরূপ কোন চরিত্রকেই দেখা যায়নি। তিথি গল্পটা মূলত একজন পিতা এবং তার মেয়ের। অথচ শেষ গল্পে তিথি ও শুভ’র মধ্যে প্রেম ছিল বলে একটা ব্যর্থ সংযোগের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। লেখক যে ব্যতিক্রম আইডিয়া নিয়ে এই বইটি আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে প্রয়াস পেয়েছেন, তা এই একটি কারণে দূর্বল হয়ে যায়।

লেখকের সেন্স অব হিউমার প্রকট এবং লেখায় হুমায়নীয় ভঙ্গিমার সুস্পষ্ট উপস্থাপন লক্ষণীয়। যেটা আমার কাছে ভাল লেগেছে। লেখক এবিএস রুমনের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

আরও পড়ুন