বুক রিভিউঃ পালামৌ’ বৃত্তান্ত

১৮৫৮ সাল এবং ১৮৬৫ সাল বাঙলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্ববহ। সাত বছরের ব্যবধানে দুটো উপন্যাস প্রকাশিত হয় – ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এবং ‘দুর্গেশনন্দিনী’। সার্থকতা বিচারে ‘দুর্গেশনন্দিনী’র কাছে ধোপে টেকেনি ‘আলালের ঘরের দুলাল’ যদিও ভাষা চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল টেকচাঁদ ঠাকুরের। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশের দেড় দশকের মাথায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ছয় কিস্তিতে প্রকাশ পায় ‘পালামৌ’ – প্রথম সফল বাঙলা ভ্রমণকাহিনী। এর ভাষারীতিতে বঙ্কিমের কাঠিন্য পাওয়া যায়নি মোটেই। টেকচাঁদ ঠাকুরের শব্দচয়নের সাথে কিছুটা মিল পাওয়া গেলেও ভাষিক বাস্তবতায় সংকলনটি অনেক বেশি প্রাণবন্তই বলা যায়।

পালামৌ আধুনিক ভারতের ঝাড়খন্ড প্রদেশে পড়েছে। এখন আমরা দেখি ঝাড়খন্ডে বাঙলা ভাষা প্রচলিত। এ ভাষায় যে আঞ্চলিকতার ছাপ, তা প্রমিতি থেকে অনেকখানি বাইরের। দেহাতী বাঙলা বলা যেতে পারে। অনার্য আদিম অধিবাসীদের বাস এসব জায়গায়। বর্তমান সময়ে যা কিছু সভ্যতার ছোঁয়া লেগেছে, আগে তা ছিল না। ‘পালামৌ’ রচনাকালেই লেখক এর মনোমুগ্ধকর বিবরণ দিয়েছেন কোল জাতির জীবনধারার প্রেক্ষিতে‌। আর্যদের কাছে পরাজিত হয়ে অস্তিত্ববাদের দার্শনিক সত্যের প্রমাণ রেখে তারা হয়ে গেছে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের অধিবাসী। তারপর থেকে শুধু বঞ্চনার গল্পই লিখে চলেছে তাদের অস্তিত্ব। প্রসঙ্গক্রমে সাঁওতালদের টিকে যাওয়া এবং রেড ইন্ডিয়ানদের বিলুপ্তির পেছনের কারণ অনুসন্ধান করার প্রয়াস পেয়েছেন।

বাঙলা সাহিত্যের রসতত্ত্বের প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান পরিস্কার করতে গিয়ে মধ্যযুগের কবিদের দস্তুরমতো সমালোচনা করেছেন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। মধ্যযুগের কাব্যে নায়িকার রূপবর্ণনা কৌশলে যা কিছুই থাক, বোদ্ধামহলে তা অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এ প্রসঙ্গে লেখক নিজের ব্যাপারে বলতে গিয়ে নিজেকে বাৎসল্যরসের সাহিত্যিক হিসেবেই তুলে ধরেছেন বলা যায়। শেষ পর্যন্ত যদিও দু-পাঁচটাকা দান করে প্রয়োজনীয় বাৎসল্য প্রকাশে ব্যর্থই ছিলেন লেখক।

সাধু ভাষারীতির অসারতা নিয়ে ইঙ্গিত করেছেন লেখক। অবশ্য ‘পালামৌ’ পুরোটাই সাবলীল সাধুরীতিতেই লেখা ভ্রমণকাহিনী। এ রচনারই দ্বিতীয় কিস্তিতে “বন্যেরা বনে সুন্দর; শিশুরা মাতৃক্রোড়ে” – এর মতো লোকশ্রুতি মেলে। বলাবাহুল্য, লাইনটি তাঁরই লেখা। কোলরা কৃষ্ণত্বে স্বদেশেই মানানসই – এ প্রসঙ্গে কথাটা লিখেছেন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

শিশুমনোবৃত্তি নিয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যালোচনা এসেছে এ রচনায়। শিশুর অনুকরণপ্রিয়তা, ভাইবোনের মধ্যকার বাৎসল্য তাঁর দক্ষ বিবরণে প্রাণ পেয়েছে। প্রাণ পেয়েছে সদ্য বিবাহিতার মৃতপ্রায় চঞ্চলতা ধীরস্থির হয়ে যাবার প্রাণময় বর্ণনায়।

পালামৌ যাবার পথে হাজারিবাগের অভিজ্ঞতায় এসেছে এক পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধের বিচক্ষণ গৃহমালিকানার বোধ। কলা চুরি ঠেকাতে চোরের শাস্তির পাশাপাশি কলার হিসেব প্রবর্তন করেন যিনি, তিনিই আবার আলোর অপর্যাপ্ততা দূর করতে আপাত অপব্যয় করে তিনটি সেজ বরাদ্দ দেন ছেলেদের পড়বার জন্যে। জীবন ধারণে অধিকারসচেতনতার কী অদ্ভুতরকমের বোধ!

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরবর্তী প্রজন্মের ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সংগত কারণে এঁদের ভাষায় রয়েছে অনুমিত ব্যবধান। তবুও পাঠকমন ধারণা অথবা কল্পনা করতে চায় – ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের বীজমন্ত্র ‘পালামৌ’য়ে নিহিত। দাবিটা হাস্যকর মনে হলেও একেবারে বিচিত্র নয় এমন হওয়াটা। প্রসঙ্গত ‘আরণ্যক’ বিভূতিভূষণের চাকরিজনিত ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ফসল।

রেজওয়ান আহমেদ
শিক্ষার্থী-গবেষক,
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (৬ষ্ঠ আবর্তন)
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন