কমল

 

ফাগুন চলে গেছে বসন্ত ছেরে, রেখে গেছে কিছু দখিনা বাতাস।
তখন মধ্যে চৈতি মাস।
রোদ জ্বলে জ্বলে অবিরাম ঝাঁঝালো তাপ,
চারিদিকে আঁচল ছড়িয়েছে ঝিম ধরা দুপুর।
কাঁঠাল পাতার ফাঁক গলে গলে ঝরে পরে মুঠো মুঠো রোদ্দুর।
মৌরি ফুলে লাল রং ধরেছে ঝিঝি ডাকা সেই প্রহরে।
কমল উদাস জানালায় কার আগমন যেন খুঁজে ফিরে মনে মনে।
দূর বনে দু– একবার কোকিলের কুহুতানের সুর বাজে নিস্তব্ধ নিঝুম দুপুরে।
কিন্তু কমলের মন বড় অসান্ত বড় বেশি উতলা কি জানি কিসের তরে।
শীতল পাটির কোলে তল পাখার বাতাসে,
আঁধো ঘুম আঁধো জাগরণে
এলো চুলে দোল লাগে কিছু অবাধ্য সমীরণে।
ধূলো উড়ে যাওয়া সরু পথটা ধরে ধীরে পায়ে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত দেহে অপূর্ব যখন
চন্ডিমন্ডপে এসে দাঁড়ায়
সুনীল আকাশে কোথা হতে যেন দু- একখন্ড
সাদা মেঘ জরো হয়ে প্রশান্তির ছায়া মেলে অপূর্বের শুভ্র মুখের বরাবর ধেঁয়ে।
তারই ফাঁকে ক্লান্ত চিল উড়ে তার খয়েরী ডানা মেলে।
অপূর্ব স্নিগ্ধ মনে কমলের খোলাচুলে আধোঁ মুখোপানে চোখ রেখে
মনে মনে বলে স্নিগ্ধতা দেখে দেখে ,
আমার একজনম চলে যদি যায় যাক চলে নিরবে।
হঠাৎ উত্তপ্ত বাউরি বাতাস কমলের
নীলাম্বরী আঁচলখানি বেখেয়ালে কখন যে বেসামালে ঢেউ খেলে তারই অজান্তেই।
কমলের দিঘল কালো কেশ তার ললাট ছুঁয়ে উশৃংখল হয়ে লুটোপুটি খেলায় মেতেছে দখিনা বাতাসে।
এমনই একক্ষণে ঘুর্ণি হাওয়ায় ঝরা পাতার
ঝনঝন শব্দে চমকে জেগে উঠে কমল অবাক
হয়ে অপুদা তুমি ফিরে এলে যে , যাওয়া হয়নি তবে?
চলেই তো গিয়েছিলে আবার কেন এলে ফিরে!
অপূর্ব মৃদু হেসে বলে কোথায় যাবো তোমায় ছেড়ে,
যেখানেই যাই যতদূর যাই তোমাতেই
ফিরে ফিরে আসবো বারে বারে।
তাই আজও হয়নি যাওয়া আমার।
কথার মুর্চ্ছনায় কমলের শুদ্ধ হৃদয় কেঁপে কেঁপে যায় নিরবে।
প্রচন্ড তাপদাহে কোথা হতে যেন দখিন হাওয়ার জোয়ার যেন ভেসে ভেসে যায় কমলের মনে।
কমল তরি ঘুরি করে মাথায় আঁচল টেনে গড় হয়ে প্রণাম রাখে তার পানে অনতি দূর হতে
অপূর্বের ভদ্র হৃদয়ে পুলকের গান বেজে যায় গুণ গুণ মনে মনে।
অপূর্ব দৃঢ় কন্ঠে বলে কি বর নেবে বল তুমি আজ এই ক্ষণে?
কমল হেসে নত মুখে বলে দাওনা যা দেবে আজ নিবো হাত পেতে,
তোমার আর্শিবাদ হোক আমার আঁধার পথের জোনাক আলো।
জ্বালো তবে সেই মৃদু আলো।
এই বলে কমল হাত পেতে চোখ বন্ধ করে।
অপূর্ব মুগ্ধ নয়নে, তারপর ধীরে কন্ঠে বলে এই কোমলতায় আমি হেরে গেছি বহুবার শতবার আজও হারি বারবার।
কমলের প্রসারিত হাতে হাত রেখে খুব শান্ত ভাবে বলে
আজ এই দ্বিপ্রহরকালে কথা দিলাম এই নির্জনতার নির্জনে ,
এইজনমে আর জনমে থাকি যেন তোমার সনে।
হঠাৎ করে শত সহস্র পাখির গান অজস্র ভ্রমরের গুঞ্জন
প্রজাতি হয়ে ঝরে ঝরে পড়ে তাদের প্রাণের পাশে।
আর সেই অলৌকিক সুর শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনতে পায় নিঃশব্দে এই দুটি শুদ্ধ প্রাণে

 

রত্না আফরোজ – কবি 

আরও পড়ুন