জীবনের কাছে ফিরে আসা

 

আমার বাগানের পাতাগুলোকে দেখলেই
‌‌ কষ্ট হতো আমার।
নানাপ্রকার গাছের বাহারি পাতা কখনো কখনো আমার কাছে বিবর্ণ মনে হতো;
ওদের সবুজ রংটা
যেন হয়ে উঠেছিল ‘কষ্টদায়ক সবুজ’!
তেলতেলে ধোঁয়া আর ধুলোবালির মেশানো আস্তরণ যেন রুদ্ধশ্বাস করে রাখতো
প্রতিটি ফুলকে প্রতিটি পাতাকে!
ওরা আমার জন্য আনন্দ আর অক্সিজেন ছাড়বে কি, নিজেরাই তো ধুঁকে ধুঁকে কোনমতে বেঁচে ছিল
মলিন বদনে,
পাতাদের মুখে যেন আমি কখনো হাসি দেখিনি!

রাস্তার পাশে বাগান,
ফুল ও ফলের নানা গাছে ভরা, কিন্তু
কারো মুখে যেন আলোর উদ্ভাস ছিলো না!
না ফলের মুখে, না ফুলের মুখে,
পাতাদের তো শুধুই কান্না-ভারী চেহারা!
ওদের কষ্ট দেখে আমারও দুঃখ হতো খুব আর অপেক্ষা করতাম কখন বৃষ্টি আসবে!
চাতকের মতো আকাশের দিকে
হা-পিত্যেশ তাকিয়ে থাকতাম,
আর ভাবতাম,
বৃষ্টি-স্নাত হয়ে মলিনতার আড়াল থেকে
কখোন বেরিয়ে আসবে ওদের চঞ্চলতা,
দেহজুড়ে দ্যুতির মতো যৌবন;
যেভাবে, সদ্য নেয়ে আসা দেহগুলো
নানা পোশাকের আড়ালেও
সজীবতার প্রভা ছড়াতে থাকে!

ক’দিন আগেও আমি ও আমার বাগান
বড্ড অসহায় ছিলাম, ভাই রে!
এখন সেদিন আর নেই।
করোনাভাইরাস এসে থমকে দিয়েছে পৃথিবীকে, কোনরকম যুদ্ধ ছাড়াই স্থবির হয়ে গেছে সমগ্র গ্রহ, মানুষগুলো গৃহবন্দী হয়ে গেছে,
গাড়ি-ঘোড়ার চলাচল নিতান্তই কম,
জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে কোথাও
পেট্রোল পোড়ায় না আর কোন ইঞ্জিন।
বাতাসে ধোঁয়া আর ধুলো নেই!
বাগানে গেলেই বুঝতে পারি ফুল-পাতাগুলো
মন ভরে শ্বাস নিচ্ছে যেন।
প্রতিটি পাতার গায়ে যেন সবুজের উল্লাস!
এই সবুজ হাসিতে মুখ রাঙ্গিয়ে তাকিয়ে থাকার সবুজ!
সারাক্ষণ হালকা মেজাজে মাথা নেড়ে নেড়ে পাতাগুলো যেন খলবলিয়ে হাসছে।
প্রতিটি ফুল যেন গালে টোল ফেলে রঙ্গের বাহাদুরিতে মত্ত হয়ে আছে,
কেবলি হাসছে কেবলি দুলছে আর গুনগুনিয়ে গান গাইছে ভ্রমরের সাথে।
রঙের উৎসব নিয়ে কোথা থেকে এসে গেছে বর্ণিল প্রজাপতি গুলো,
ঢাসা পিঁপড়ে, শুয়োপোকা আর সব পোকামাকড়েরা বড্ড প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে আজকাল!
ছোট ছোট পাখিদের এডাল ওডাল ইদানিং চোখে পড়ে বেশ।

নিঃশব্দ পরিবেশে পাখিদের কিচিরমিচির ডাক চতুর্দিক থেকে ভেসে আসে,
ভোরে বিকেলে রাতে!
ঝিঁঝিঁ পোকারাও নির্ভয়ে ডাকে।
আমার পড়ার টেবিলে বসে আমি ঘুঘুদের ডাক শুনতে পাই।
এই শ্রুতি-সুখ তো অভাবনীয় আমাদের ঢাকা শহরে!
ক’দিন আগে
কোকিলের ডাক শুনে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম;
কত বছর পর এমন শহরে বসে চিনতে পারলাম
এটাই কোকিলের ডাক!

করণা মহামারীতে আপনজন হারানোর জ্বলজ্বলে বেদনা আমারও আছে বুকের ভেতর,
তবু
ইদানিং কেন জানি মনে হচ্ছে
আমার আল্লাহ্ বড্ড ভালোবেসে সুক্ষ শাসনের ভঙ্গিতে আমাকে প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে দিলেন,
আমার শত লোভ, অনর্থক ব্যস্ততা এবং
অজানা মোহের শত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে,
মানুষের প্রতি পশুপাখি আর বৃক্ষের প্রতি
আমার শত অবিচারের অপরাধ মাফ করে দিয়ে,
তিনি আমাকে জীবনের স্বাদ এবং স্থিতির ভেতর ফিরিয়ে দিলেন,
আমার বিবেককে জাগ্রত করে দিলেন,
দুর্দিনে মানুষের দিকে সহায়তার হাত বাড়ানোর সুযোগ দিলেন
অন্যকে ধৈর্য ও সত্যের পরামর্শ দেয়ার মওকা দিলেন, জীবন নিয়ে আমাকে নতুন করে ভাবতে দিলেন, মৃত্যুকে স্মরণ করে জীবনকে বুঝেশুনে সৃষ্টির কারণটাকে বুঝে চলার মতো মন তৈরী করার জন্য একটা ঝাঁকুনি দিলেন,
আচম্বিতে আমার অসহায়তা আমার অক্ষমতা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়ে।

এখন ভাবলে লজ্জা হয়,
ক’দিন আগেও জীবনের ঘোরের ভেতর আমি যেন ভুলেই গিয়েছিলাম
আমারও একদিন মৃত্যু হবে,
শেষ হবে এই পৃথিবীর এই জীবনের হিসেব নিকেশ!
ওসব কথা
আর পর-জীবনে স্বস্থির জন্য চিন্তাশীল হওয়ার কথা আমার মনেই পড়েনি,
বালুচরে খেলায় মত্ত অবুঝ শিশুদের মতো।

 

আশরাফ আল দীন- কবিও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন