ধর্ষক বিরোধী তবে পুরুষ বিরোধী নই

-ইসরাত জেরীন শান্তা

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা আমার কন্ঠ মানেই কিন্তু পুরুষবিরোধী কণ্ঠ নয়।
আমি যদি এই আমাকে ভালোবেসে থাকি, তাহলে শুরুটা আমি আমার থেকেই করি।
এই যে আমি পৃথিবী দেখছি,
পৃথিবীর আলো-বাতাস সবটার স্বাদ পাচ্ছি,
এ আমির সৃষ্টি রহস্য কী?
মায়ের গর্ভে আমার জন্ম,
পৃথিবীতে আমার আগমন,
আমার ভরণপোষণ, সুনিশ্চিত জীবনপ্রদান,
আমাকে সুন্দর ভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য
যার অবদান সবচাইতে বেশি–
সে আমার জন্মদাতা পিতাই সত্যি।
যে তার জীবনের সর্বস্ব দিয়ে,
নিজের সুখ বিলাসিতাকে বাজি রেখে
আমার জন্য সুখের জীবন খুঁজলেন— আমার প্রাণপ্রিয় সে বাবাও কিন্তু একজন পুরুষ ।

এরপর যদি বলি খুব কাছ থেকে দেখা আমার পিতৃতুল্য চাচাদের কথা।
ছয় ভাইয়ের ছোট কোন বোন না থাকায়,
হয়তো তাদের পরিবারের একমাত্র কন্যার আদরের মালিকানার পাশাপাশি
তাদের ছোট বোনের জায়গাটিও দখল করে নিয়েছিলাম।
সেই ছোট্টবেলা থেকে এখনো পর্যন্ত
তাদের মুখের মধুর সম্বোধন
আমার প্রাণ জুড়িয়ে দেয়।
আমার ছোট ছোট আবদার পূরণ,
বলা না বলা শখ মিটানো,
আমাকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দান,
হোক জ্বরের মুখে বা প্রথম সন্তান গর্ভকালীন সময়ে কিছু খেতে চাওয়ার ইচ্ছা পূরণ,
এসএসসি থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা–
ভোরে ফোন করে ডেকে দেয়া থেকে শুরু‌ করে
পরীক্ষার হল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া,
ঈদ উৎসবে আমাকে নতুন কাপড়ে সাজিয়ে তোলা,
জন্মদিনে বেলি ফুলের মালা উপহার দেয়া,
ছাত্র বয়সে হাতের মুঠোয় পাঁচশো বা হাজার টাকার নোট গুঁজে দেয়া,
সার্বিক দিক দিয়ে আমার মঙ্গল কামনায়, আমার পিতৃতুল্য, বন্ধুসুলভ চাচারা–
তারাওতো পুরুষ।

ছোট্ট আমিটা খেলতে ভীষণ ভালোবাসতাম। আর সেই খেলার সব আয়োজনের
যোগান দিতেন আমার একমাত্র মামা।
গ্রামের কোন মেলা মানেই আমার জন্য
এতো এতো খেলনা, পুতুল, হাড়ি, পাতিলের আসর জমানো।
মামার গলা ধরে কত যে নদীতে সাঁতার কেটেছি, শাপলার ডাল ছিঁড়েছি,
তার কোন হিসেব নেই।
আমার বাল্যকাল কে এতো সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা মানুষটি–
সেও তো একজন পুরুষ।

নিজ ছোট ভাই ও ফুপাতো ভাইসহ
পাঁচ ভাইয়ের অনেকটা মধ্যমণি হয়ে
আমার বেড়ে ওঠা।
তারাই আমার খেলার সাথী,
ভালো-মন্দ সবকিছু সাক্ষী,
আমার নিরাপদ বাল্যকালের অতন্দ্র প্রহরী। আমার সেই বন্ধুসম ভাইগুলো—
তারাও যে পুরুষ।

এবার যদি বলি ছেলেবন্ধুদের কথা;
তাদের কখনো আমি স্বার্থপর হতে দেখিনি, তাদের দেখিনি আমার অপকার করতে,
তাদের চোখে দেখেছি আমি
কখনো বন্ধুত্বের প্রবল মায়া,
কখনো প্রচন্ড ভালোবাসা,কখনো হয়তো প্রেম,
বা কখনো  আমাকে নিয়ে তাদের গর্ব,
বা কখনো আমার প্রতি সম্মানবোধ।
থাকুক কাছে বা দূরে,
সে ছোট্টবেলা থেকে আজ অবধি তারা সর্বদাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী।
আমার অতিপ্রিয় বন্ধুগুলো– তারাও পুরুষ।

জীবনের মানে না বুঝেই,
যার প্রতিটি কথাকে মন্ত্রের মতো মেনে নিয়ে, জীবন যাপন করতে শুরু করেছিলাম,
যার দেখানো পথে এগিয়ে সুখের সাথে সখ্যতা গড়েছিলাম,
নিজেকে আলোকিত করার সুযোগ পেয়েছিলাম,
সেই মানুষটি— তিনিও কিন্তু পুরুষ।

এখন বলি আমার আপন মানুষের কথা,
আমার জীবনসঙ্গীর কথা।
সেই যে পনেরো শেষে ষোলোর শুরুতে
তার জীবনের সাথে জড়িয়ে গেলাম,
আমার কৈশোর,যৌবনের সবটা পথ পেরিয়ে আজো আমাকে তার ভালোবাসার ছায়ায় রেখেছেন সর্বক্ষণ,
আমার প্রতিটা সিদ্ধান্তে তাকে পাশে পেয়েছি, জীবন যুদ্ধে আমরা সহযোদ্ধা হয়েছি।
এসএসসি পাস করা বধুকে
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী করতে
যিনি হেয়ালিপনা  করেননি বিন্দুমাত্রও।
কখনো গান চর্চা বা কাব্যচর্চায় অনুপ্রেরণা হয়ে পাশে থেকেছেন অহর্নিশ।
আমার তিল পরিমাণ ক্ষতিতেও যিনি আপোষহীন।
আমার প্রতি প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস,সম্মান—
সব নিবেদনে সদা যিনি চিরন্মুখ, তিনিও পুরুষ।

আমার নাড়িছেঁড়া ধন,
যারা আমার মৃত্যুর পরেও আমার পরিচয় বহন করে বেড়াবে,
আমার অপূর্ণ স্বপ্নগুলো হয়ত পূরণ করতে পারবে,
যারা আমাকে মাতৃত্বের স্বাদ দিয়েছে,
ধন্য করেছে আমার জীবনকে,
সে আমার সন্তান দুটো — তারাও একদিন হয়তো সুপুরুষ হবে।

এমনই আরো অনেকেই আছেন
যারা নানান ভাবে, নানান সময়,
আমার চাইতে অধিক বেশি আমার ভালোর প্রতি যত্নবান ছিলেন,
ভালো কিছু হোক আমার–সর্বদাই চেয়েছেন।
তাদের বেশিরভাগই তো পুরুষ ছিলেন।

তাইতো ধর্ষকদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা আমার কন্ঠ,
কখনোই পুরুষবিরোধী কণ্ঠ নয়।
মূলত ধর্ষকদের আমি কখনো পিতা বলি না, ভাই বলি না, পিতৃস্থানীয় কারো সমতূল্য মনে করিনা।
ধর্ষকদের আমি বন্ধু বলি না, প্রেমিক বলি না, স্বামী বলি না, সন্তান বলি না,
তাদের কখনোই আমি পুরুষ বলি না,
কখনোই না।

ইসরাত জেরীন শান্তা কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন