মধ্যরাতে প্রণয়চিহ্ন

হাসান ওয়াহিদঃ

তুমি ওইখানে থাকো। ওই শাদা বাড়িটাই।
তোমাদের জানলায় ভারি পর্দা ঝুলছে।
দেয়ালে লাগানো এয়ারকুলার, ঝাপসা ছবি,
টেবিলে ম্লান রজনীগন্ধা চিরপরিচিত নিভৃত
ঘরে নতুন স্পষ্টতর প্রতিবেশ গড়েছে।
শাদ্বল লনে ঘুমিয়ে আছে বুড়ো স্পানিয়েল
কুকুর। তোমাকে বড় একটা দেখা যায় না।

২.
আজ দেখলাম অপরাহ্নে। শাদা
শাড়ির আঁচলে মুখ নিচু করে তোমার পথ চলা।
তোমার নির্ঝরিত চুলে, বাঁকা ঘাড়ে, শত বছরের
চেনা ছবির মতো ঝরে বিকেলের শেষ সূর্যালোক।
পবিত্র সন্ন্যাসিনীর মতো দেখাচ্ছিল তোমাকে।
রাস্তার দু’ধারের সবুজ গালিচার মতো ঘাসগুলো
একটু স্নেহ পাবার জন্যে যেন উন্মুখ থাকে। ওদের
পিঠ, কাঁধ, কব্জি, আঙুলভাঙা দেহে একটু মমতা
বিলোবে? এভাবে হাঁটো বলেই বোধহয় আমাকে
চোখে পড়ে না। আজও পড়ল না।

৩.
তুমি আমার থেকে যতই দূরে থাকো, যতই
সুরক্ষিত থাকতে চাও, অনেকের কাছ থেকে কিন্তু তত দূরে নও। ঝকমকে তলোয়ারের মতো শানিত
তুমি রাস্তায় হাঁটো। রোমিও-রা তোমার পানে ছুঁড়ে
দেয় শিস্, মুখে ছিটোয় শিশিরের ফোঁটা।
ওদের লোলুপ আলো-জ্বালা দৃষ্টি পড়ে
তোমার সারা দেহে।

৪.
সোয়া ন’টায় ঘরে এসে মাকে না জাগিয়ে ঠান্ডা
ভাত, বিস্বাদ তরকারি, হলুদ ডাল খেয়ে
বিছানায় এলাম। আজ বড্ড কুয়াশা পড়েছে।
জোনাকি ঝিঁল্লিতে কাঁপা, গভীর আঁধার ঘেরা
এই কুয়াশায় আড্ডায় বসে দু’এক ছিলিম ধরলেই
পৃথিবীর হৃদয়ের বড় কাছাকাছি আসা যায়,
ভালোবাসায় একাকার হয়ে যায় পৃথিবী।
তখন হৃদয়ের গভীরে নীলময় যন্ত্রণার বাঁশি থেমে
যায়। বৈরাগ্যের উজ্জ্বল রশ্মি ফোটে এই
অগ্নি-আঁধারে। আজ রাতে লাল পর্দাটা সরিয়ে
তুমি কী একবারও জানলায় এসে দাঁড়াবে?
যদি দাঁড়াও, তবে আমার বিশ্বাস—
তুমি সব টের পাবে।

৫.
পরশুদিন দেখেছিলাম তোমাদের পাবলিকা স্টারোলেট গাড়িতে তুমি কোথাও যাচ্ছো।
দাঁতে ঠোঁট চেপে মৃদু হাসছো।
বড় ভালোবাসায় আগলে নিয়ে গেল তোমাদের
সবুজ পাবলিকা স্টারোলেট গাড়িটা।
ন্যু’মার্কেট গিয়েছিলে? নাকি ঢাকা ক্লাবে?
আমার শূন্যতাপূর্ণ চোখে প্রশ্নচিহ্ন সর্বদা
যেখানেই থাকো —তোমার বার্তা চাই।

৬.
এখন রাস্তার চারদিকে শুধু চোখে পড়ে দুর্দান্ত
রাগি ও বিরক্ত মানুষের মুখচ্ছবি। গাছের
পাখিরাও স্তব্ধ। আমার ঘুটে পোড়ানো ধোঁয়া লাগা
চোখে চিত্রার্পিত সম্মোহন। তুমি দেখো, একদিন
ঠিক ঠিক রাস্তার মাঝখানে তোমাদের চলন্ত
গাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে বলব—‘আমাকে গ্রহণ করো’ কিংবা ‘আমাকে ধ্বংস করো’। বৃষ্টপাতে
বা ঝড়ে বা কুয়াশায় সেই সুসময় এলে তখন ওই
দুই শব্দের পৃথক কোনো মানে থাকে না।

৭.
স্বপ্নের গভীর ছিঁড়ে মধ্যরাতে চমকে হঠাৎ ঘুম
ভাঙল, ‘—মা! আমায় ডাকছিলে?’
মা জেগে অস্পষ্ট আকুল বুকে, অবাক গলায়
বলল,’—না তো!’
বিশীর্ণ মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল,’ঘুমো। ‘
অনেকক্ষণ ঘুম আসে না। মারও। বলে,’—কোথায়
কোথায় থাকিস দিনভর; আত্মীয়-কুটুমদের
একটু খোঁজ নিবি। আমি মরলে যে কেউ আর
তোকে চিনবে না!’
‘—কারা? কোথায় আছে?’
বিষঘ্ন স্বরে মা বলে যায়,’—মালিটোলায় তোর
ছোট ফুফু, গেন্ডারিয়ায় ন’ মামি….’ শুনতে
শুনতে চোখ বুজে যায়। তখন আর মাছি ওড়ার
শব্দ কানে আসে না।
রাস্তার দেয়ালে ভয়ঙ্কর সব যুবতীদের ছবিওয়ালা
পোস্টার মনে পড়ে না। বিকিরণরত সূর্যকিরণ,
জেল্লাওয়ালা পর্দার পিছনে অপেক্ষাতুর
স্ত্রীলোক, বসন্তে ফুলের উৎসব, শুভ্র শাঁখে বাজা
গোধুলির কান্না সবকিছু আমার চোখের বিভ্রমে
হারিয়ে যায়। অপরাহ্নের আলোয় ফুটপাতে
আমার বিশ্বসিত ছায়ার উপর দিয়ে হেঁটে চলা
তুমিও তখন আমার শিলীভূত চোখে
অচেনা মানু্ষ।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন