শাশুড়িও জননী

কবি সুচন্দ্রা মুখার্জী

বানভাসি জীবনের স্রোতে কুড়িয়ে রাখি

কিছু নুড়িপাথর আর ফালি ফালি স্মৃতি
ভরে যায় মনের প্রবাহমান রুকস্যাকে।
হ্যাঁ;শাশুড়ি ও তো জননী
একথাটি একদম ভুলে যাইনি।

বিয়ের পর আমার মাকে ছাড়া স্বামীর মাকেও
মায়ের সম্মান দিয়েছি;ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছি;

সবটুকু সুখ দুঃখ ভাগ করে নিয়েছি।তিনি ও আমাকে
মেয়ের মত আদর দিয়ে কাছে টেনে
নিলেন।কিন্তু ধীরে ধীরে তৈরী হয় দূরত্ব

একটি মেয়ে তার বাড়িঘর পরিবার স্বজন সবাই কে ছেড়ে যখন
অন্য একটা বাড়িতে এসে বসবাস করে
তখন শ্বশুরবাড়ির অনেকেই তাকে অনেক সময় মেনে নিতে পারেনা বা
মানিয়ে নিতে পারেনা।

তখনই শুরু হয় সংঘর্ষ;ঘাত প্রতিঘাত।
কথায় বলে শ্বশুর কখনও বাবা হতে পারেনা;

শাশুড়ি মায়ের মত হয় না;

দেওর তো ভাই নয়;

ননদিনী হলো সত্যি ই রায়বাঘিনী।কতটা সত্য কতটা
মিথ্যা তা একমাত্র নতুন বৌ জানে।
আমি ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টারস ডিগ্রী করেছি বিয়ের পর।
আমার শাশুড়ি গ্রাম্য আর নিরক্ষর।
তাই আমাকে একটু হিংসাত্মক দৃষ্টি তে
প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন।আমাকে প্রতিপদে
লাঞ্ছিত আর নির্যাতিত করতেন।
আমি বিয়ের পর এসে বুঝলাম;এ এক
অন্য বাড়ি;এখানের মানুষ জন আলাদা
এদের সাথে আমাকে অন্যধরণের জীবন কাটাতে হবে;

এই বাড়িকে আমারকরে নিতে অনেক কিছুই ত্যাগ স্বীকার
করতে হবে। এখানে আমার মায়ের
আঁচলের গন্ধ নেই;আদর আব্দার নেই;
প্রতিপদে সাবধানতার সঙ্গে পা ফেলতে
হবে;বুঝেশুনে কথা বলতে হয়।বেফাঁস
কথা বা বেআব্রু হলে চলবেনা। তীর্যক
কটুক্তি ছিল;তীক্ষ্ণ চাহনি ছিল আর
তুচ্ছতাচ্ছিল্য ছিল।
তবুও শাশুড়ি কে মায়ের মর্যাদা দিয়েছি।

এক মাকে ছেড়ে আর এক মায়ের কাছে এসেছি।

টুকরো সম্পর্ক জোড়াতালি লাগিয়ে একটা প্রদীপ
থেকে ঝাড়লণ্ঠন সাজিয়ে দিয়েছি।
একবছর কেটে গেল।আমি
হাসিমুখে সব যন্ত্রণা সহ্য করেছি।মা
বলে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।
একদিন শাশুড়ি আমার কাছে কান্নায়
ভেঙ্গে পড়ে মনের যাবতীয় আবেগ
উজাড় করে দিলেন।তিনিও তাঁর গ্রামের
শ্বশুরবাড়িতে প্রবল কষ্ট আর নির্যাতন
সয়ে এমন পাথর হয়ে গেছেন।সেইজন্য
আমার প্রতি প্রতিহিংসাপরায়পন।এই
রহস্য টুকু বুঝতে বাকী রইলনা।শাশুড়ি
বিগত জীবনে যে লাঞ্ছনা অবমাননা আর অত্যাচার সয়েছেন

তার প্রতিশোধ তোলেন নিজের পুত্রবধূর উপর।

এই গূঢ় সত্যটা সবাই জানে কি?
কিন্তু আমি অনেক গভীরভাবে ভেবে
দেখলাম আমার অসহিষ্ণুতা আমার
পরাজয়।একজন বঞ্চিত নির্যাতিতা
নারী আমার কাছে সহানুভূতি আর
সহমর্মিতা চাইছে।তাই মানবিকতার
খাতিরে আমি মাকে ভালোবাসা আর
নিঃস্বার্থ প্রেম দিলাম।উনিও আমার
প্রতি সদয় হলেন।
যে সন্তান কে উনি গর্ভে ধারণ করে বড়
করে তুলেছেন সে আমার স্বামী তাই

আমার একটা কর্তব্য থেকেই যায়।
মা ছেলের অটুট এই সম্পর্ক। বিশাল
মহীরুহ কে মৃত্তিকার জঠর থেকে উপড়ে ফেলা যায়না বরং দুগ্ধস্রোতা
স্রোতোস্বিনী নামিয়ে আনব।একটা
পরিবার;আর সম্পর্কগুলো অক্ষত থাক।

সব নির্ভর করে ঐ অন্যবাড়ি থেকে আসা মেয়েটির উপর।

তার অফুরান অবদান।
ক্রমে আমি স্বামীর সঙ্গে তার কর্মসূত্রে
বিদেশগামী হলাম।আমি ও পুত্রের মা
হলাম।সবটুকু উপলব্ধি করলাম।
শাশুড়ি একা হয়ে গেলেন।তবে শেষদিন
অবধি আমার মঙ্গল কামনায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

শেষ কয়দিন উনি আমার প্রকৃত মা হয়ে উঠলেন।
মুখে ছিল অমিয়মধুর হাসি;জীবনের
সলতে ফুরিয়ে এলে নিভু নিভু প্রদীপ
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোকে জড়িয়ে ধরে।

আমরা পালাতে পারিনা হারাতেও পারিনা।

ভালোবাসা পরিযায়ী নয়;
Do not be a beggar of love;

Be a donor of love.
মা আজও তোমার আদরের ঘ্রাণ পাই;
আমি জানি তোমার অপার্থিব শরীর
দিয়ে আমাকে আঁকড়ে আছ তুমি !
প্রাণভরে শাশুড়ি কে একবার মা বলে
ডেকে দেখ……..

কবিঃ কবি ও সাহিত্যিক, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন