আজ চাঁদ দেখা গেলে…

 রেজওয়ান আহমেদ

শিব বাবার মন্দির। আমার পেছনেই। সবে ৩৪। আরো সামনে দোতলা একটা বাড়ি – ১৩৪, ক্ষেত্রকুঠি, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট। এরকমই ঠিকানাটা।
ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। দেশে বইমেলার মাস। ঢাকা নিউমার্কেটের এক নম্বর গেটের দুপাশে পত্রপত্রিকার পসরা সাজিয়ে বসে। ওখানেই একবার দেশ পত্রিকার একটা পূজোসংখ্যা হাতে নিই। বেশ পুরনো সংখ্যা। বই বা পত্রিকা যাই হোক, সূচিপত্র না ঘেঁটে আমি কিনি না। এটার সূচিপত্রের দশা কিম্ভূতকিমাকার। কোনোটার শিরোনাম আছে, লেখকের নাম নেই। কোনোটার আবার তার উল্টো। ইন্টারেস্টিং! ইন্টারেস্ট বাড়তে লাগল। মোটাসোটা পূজোসংখ্যার সেই সূচি এভাবে পুরোটাই পড়ে শেষ করতে আমার দুমিনিট লাগল। চোখ আটকে গেল যেখানে, সেখানে লেখা ‘স্ত্রী —- মানে ইস্ত্রি?’ যথারীতি লেখকের নামের জায়গাটা সযতনে কাটা। পৃষ্ঠা নম্বরমতো লেখা খুঁজে বের করে দেখি ছাপায় শিবরাম চক্রবর্তীর পাশে প্রথম বন্ধনীতে ঐ ঠিকানা লেখা বলপয়েন্ট কলমে।
এতদাঞ্চলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার প্রমাণ মেলে রোড আর স্ট্রিটের এন্তার অস্তিত্বে। পুরনো ঢাকার বুক চিরে যেমন চলে গেছে জনসন রোড, ইংলিশ রোড, নর্থসাউথ রোড, উর্দু রোড… তেমনি পুরনো কলকাতার বুক জুড়ে আছে আর্মহার্স্ট স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট, কলুটোলা স্ট্রিট – এরা। বোধকরি ব্রিটিশরাই রোড আর স্ট্রিটের চুলোচুলি লাগিয়ে দিয়ে গেছে।
নামমাত্র দামে কেনার আশায় দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানি হাঁকিয়ে বসল তিনশো টাকা একদাম, কোনো দামাদামি নাই। খোদ কলকাতায়ই এর দাম একশোর নিচে। সূচিপত্রে কাঁচি চালালেও শ্রীযুক্ত রাধাবিনোদ দে মূল্যের স্থানটিতে কাটাছেঁড়া করেননি – কাঁচি অথবা বলপয়েন্ট কলমে। কাটাছেঁড়া নয় – সাদা কালিতে একেবারে দশাসইভাবে ঢেকেছে ওরা। ওরা নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের ব্যবসায়ী। পুরনো ঢাকার হলে বিশ্বাস করা যেত। সবাই পুরনো ঢাকার নয়। সারাদেশের কমবেশি সব এলাকার লোকেরাই এখন নীলক্ষেত-নিউমার্কেটকেন্দ্রিক ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার মোক্ষম বটিকা সততার বিসর্জন। এই ছেলের দোকানে আমি সেদিনই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত শেষবার। ও আমাকে খাতির করবে কেন? খাতির পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে না থেকে একশো টাকার দুটো আর পঞ্চাশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বই নিয়ে হাঁটা দিলাম। রিক্সা নিতে হবে। পাঁচশো টাকা বের করলে তিনশো টাকাই রাখত। মনে আছে, রিক্সাভাড়া মেটাতে সেদিন কী ঝামেলাটাই না পোহাতে হয়েছিল। রিক্সাওয়ালা ৫০০ টাকার নোটই ভাঙাতে পারে না। দুপুররোদে উদ্ভ্রান্ত আমি শেষে একটা এক হাজার টাকার নোট সেধে বসেছিলাম। দুপুরের খাবার না খেয়ে সে টাকা দিয়ে অনেকটা ঝোঁকের মাথায়ই ওটা কিনে আনা। কখনো কখনো পেটের খিদে মেটানোর পয়সায় মনের খিদে মেটানো যেতেই পারে। তবে রুমে এসে খিদে নষ্ট হয়ে গেল – পেটেরও, মনেরও। না চাপালাম চুলোয় খাবার, না ওল্টালাম সেই পূজোসংখ্যার পৃষ্ঠা।
দিনপনের পরের কথা। সিলিং ফ্যানটায় ময়লার শেষ নেই। রুমটাও গোছগাছ করতে হবে। কাজে লেগে পড়লাম। ফ্যানটা ঝেড়েমুছে বিছানার কাছে গিয়ে তোষক উল্টেই একটা ফাইল পেলাম। আমার রুমে, আমার তোষকের নিচের ফাইল যে আমারই তাতে আর সন্দেহ কী?! খুলে চক্ষুস্থির। ইন্ডিয়ার ভিসার মেয়াদ আছে আরো মাসপাঁচেক। দেখে আমার পাঁচটা লাফ দিতে ইচ্ছে হলো। বহুদিন টাকার অভাব চলতে চলতে হঠাৎ কোনোদিন ওয়ালেটের কোনো অবহেলিত পকেটে ততোধিক অবহেলিত পাঁচশো টাকার এক-দুটো নোট পেয়ে গেলে বোধকরি এমনই লাগে। আমার অবশ্য টাকার অভাব নেই। অভাব ভিসার। সেদিন রিক্সায় বসে বসে উত্তেজনায় শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম ভিসার মেয়াদ আছে কি নেই ভেবে ভেবে। রুমে এসে ভিসাই খুঁজে না পেয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে গেছিলাম। গুছিয়ে রাখা স্বভাব যার, তার কিছু সেরে রাখা মানে হারিয়ে ফেলাও হয়ে যেতে পারে। যাই হোক, ওটা হারায়নি বলেই আজ আমি মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের ১৩৪ নম্বর ক্ষেত্রকুঠিতে বসে লিখছি – সেই আনন্দভ্রমণের কথা অথবা এক নিরস নিরানন্দ গৃহবন্দি ঈদের কথা। হ্যাঁ, আজ এই ভারতভূমিতে ঈদ।
কলেজ স্ট্রিট থেকে বইপত্র কেনার ভূত মাথায় বহুদিন ধরেই। পরম ভালোবাসায় সে ভূত পুষে রাখা। শুধু ভিসা নামের একটা ছাপানো কাগজের অভাবে বর্ডার ক্রস করতে না পারার যন্ত্রণায় শুধু আমি নই, ভূতটাও পুড়ছে। সে আগুনে জল ঢাললাম ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এক রাতে। বেনাপোলের আনুষ্ঠানিকতা সারতে সকাল আর ধর্মতলায় নামতে সূর্য প্রায় মাথার ওপরে। বাংলাদেশের মোবাইল নম্বরের ১১ ডিজিট উচ্চারণে যতটা আরাম, ওদের দশ ডিজিট উচ্চারণে ততটাই ঝামেলা লাগে আমার কাছে। মনে হয় বাঙলা-ইংরেজি মিলিয়ে বলতে বলতে অভ্যাস হয়ে গেছে নিজের দেশে। নিজের দেশে কাকটাকেও আপন লাগার সূত্রে হয়তো এটা স্বাভাবিক। এই নাম্বারটা পূজোসংখ্যার সেই প্রথম বন্ধনীর ঠিকানায় লেখা ছিল। দেশ থেকে ইচ্ছে করেই কল দেইনি। অথবা মনেই পড়েনি ভিসার বেদনায়। শিব বাবার মন্দির পেছনে ফেলে কল দিলাম। বেজে গেল। আবার দিলাম। এবার একজন ধরল। অল্পবয়সী মনে হলো। বাংলাদেশ থেকে আসছি শুনে আমাকে সামনের সেই দোতলা বাড়ির দিকে এগোতে বলে ফোন রেখে দিলেন।
একটা চিলতে বারান্দা। এখান থেকে ট্রামলাইন দেখা যায় নিচে তাকালে আর সারবাঁধা তিনটি সুপুরি গাছ ওপরে দুলছে। চারমিনার হাতে নিয়ে রুম থেকে বারান্দায় এলেন লোকটা – শ্রীযুক্ত রাধাবিনোদ দে। দোতলায় এ রুমে ঢুকে আসন পেতে বসলেই যেটা সবার আগে চোখে পড়ে সেটা একটা স্যুটকেস। তাতে বাঙলা এবং ইংরেজিতে আলাদাভাবে তার নামই লেখা। তাহলে তার ঠিকানাই ছিল প্রথম বন্ধনীর ভেতর। লোকটা দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার। এখানে এই মেসে এগারো বছর ধরে আছে। মায়া পড়ে গেছে। তাই ছেড়ে দেয়া হয়নি। মায়ার একটা জিনিস ত গিয়ে পাশের দেশের ফুটে ছেড়ে দিয়ে এসেছেন। তার কী হবে? প্রথমটা বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন মিস্টার দে। দেশ পত্রিকার কথা বললাম। শুধু দেশ পত্রিকা নয়, বিদেশে আরো কয়েকটা শখের বই ছেড়ে আসতে হয়েছে শুধু দেশে ফেরার ভাড়ার সংস্থানে।
পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকব বললেও তারা আমার কাছ থেকে কোন টাকা রাখবে না বলে সাফ জানিয়ে দিল – আপনার যদ্দিন চাই থাকুন না! এমন পাগলাটে লোক এই ব্যস্ত কলকাতায় পাওয়া কঠিন। আন্তরিক আপ্যায়ন পেয়েও কোনো এক দুর্বোধ্য চক্ষুলজ্জা নিয়ে সে রাতে চোখ বুজলাম।
পরদিন কলেজ স্ট্রিট ঘুরে বেশ কিছু বই কিনে ফিরলাম। কফি হাউস হয়ে আসলাম। পরদিনই কলকাতা ছাড়ার কথা থাকলেও কলকাতা আমাকে ছাড়ল কই? মিস্টার দে, ভবতোষ ওঝা, গণেশ কামারদের সাথে আমার মিলে গেল ভালোই। যাই যাই করতে করতে মার্চ মাস শেষ হয় হয়। এমন একদিন রাতে আমার বাস। সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে তখন ভারতভূমিতে করোনা ভাইরাসের বয়স।
দুপুর নাগাদ কলকাতা থেকে দূরপাল্লার বাস বন্ধ হলো। পায়ে হেঁটে নব্বই কিলো পাড়ি দেব – সিদ্ধান্ত নিলাম। মিস্টার দে বাধা দিলেন। এই বিদেশে আমাকে এভাবে ছাড়বেন না। তারা সকলে যার যার গ্রামে ভেঙে ভেঙে চলে যাবেন তবুও আমার কোনো ব্যবস্থা হবে না। যতটুকু ব্যবস্থা করার তা মিস্টার দে করে গেলেন – এক মাস চলার মতো ফেসমাস্ক আর কিছু নগদ রুপিভর্তি একটা খাম।
মন খারাপ হলে জাকারিয়া স্ট্রিটে কাওয়ালি শুনতে যেতাম মাঝে মাঝে। আর ইফতারের পর বসতাম কফি হাউসে। পরের এই শহর গত একমাস আমাকে আপন পুত্রের মতো করে পেলেপুষে যত দিন যাচ্ছে – কেমন দূরে ঠেলছে‌। আপন মনে হয় শুধু কফি হাউসের চেয়ার টেবিলের ফাঁকে-ফোকরে সদাব্যস্ত ছারপোকাগুলোকে। শরীরে কামড় বসিয়ে অপেক্ষা করারও ফুরসৎ নেই ওদের। বিদেশে যেমন, দেশে সরদার কলোনির মেসেও ওরা তেমনই। গত কিছুদিনে আমার ঠিকানা পাল্টেছে, ওয়ালেটের মুদ্রা পাল্টেছে, পরিবেশ পাল্টেছে, পাল্টেছে ইফতার-সেহরির উপকরণের নাম – পাল্টায়নি শুধু খয়েরি-কালো আর্থ্রোপোডার অত্যাচারী ভালোবাসা।
পুরনো কলকাতার স্ট্রিটে স্ট্রিটে স্ট্রিট ফুডের পসরা উঠে গেছে স্ট্রিট থেকে। করোনার ছোবল থেকে নিজে বাঁচতে, দেশকে বাঁচাতে মরিয়া সবাই এখানে। মিস্টার দেকে যতটুকু চিনেছি এতদিনে তার থেকে বেশি করে চিনেছি তার দেশপ্রেম – নাহয় এরকম অবস্থায় আমাকে একা রেখে যেতেন না। সঙ্গে করে গ্রামে নিতেন চব্বিশ পরগণায়।
আজ আমার কাছে সবমিলিয়ে ৪৯২ রুপি আছে। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে – দ্যাখো আমাদের বিনিময়ে সুখ কিনতে পারো কিনা। সুখের দোকান বন্ধ। কফি হাউসের ছারপোকার দল সপ্তাহকালের বেশি মানুষের রক্ত না পেয়ে মরে গেছে। ঘুম ভেঙেছে আমার। তবু মুক্তারামের এই তক্তারাম ছেড়ে উঠে শুক্তারাম খেতে যেতে মন টানছে না। আরেকদফা ঘুমোব – উঠব দুপুর গড়ালে।
আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ – এরকম কোনো শিরোনামও যদি ছাপার অক্ষরে পড়া যেত, মনকে বোঝাতে পারতাম, অথবা রমজানের ঐ রোজার শেষে… । র‌্যাডক্লিফ লাইনের তোপে সে সুযোগটুকুও নেই। শুধু কাওয়ালি ভেসে আসছে জাকারিয়া স্ট্রিটের। এই কোয়ারেন্টাইনে বোধহয় তাও কোনো একটা চারদেয়ালের কাঠামোয় বন্দি। র‌্যাডক্লিফ লাইন ত তাও ভিসা পাসপোর্টে জয় করা যায়, করোনা জয় করা কীভাবে সম্ভব?
পাঞ্জাবির পকেটে হয়তো শেষ চারমিনারটা আছে। ঈদ মোবারক!
গল্পকার –
শিক্ষার্থী ও গবেষক,
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন