আমার শিক্ষিকা

– হাসিবুর রহমান ভাসানী

গত বছরের জুলাইয়ে আমি একদিন কলেজে বসে  লেকচার শিডিউল তৈরি করছি।
হঠাৎ দুপুরবেলা পিয়ন আফজাল এসে বললো স্যার বাইরে আপনার সাথে একজন দেখা করতে চায়।
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম কে ?
ও বললো,জানিনা স্যার এক বৃদ্ধ মহিলা এসে আপনার নাম বললো।
– আর কিছু বলেনি ?
– স্যার,উনি নাকি ওনার এক নাতিকে আমাদের কলেজে ভর্তি করাতে চান।
– তো কলেজের নিয়মাবলী মেনে ভর্তি করাক,
আমাকে চাই কি জন্য ?
– বললো,আপনার সাথে কথা বললেই আপনি তার নাতিকে ভর্তি করিয়ে দিতে পারবেন।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
দেখেছোই তো কত ব্যস্ত।
সকাল থেকে একবার নাস্তার ব্রেকও পাইনি।
নতুন ব্যাচ আসবে কিছুদিনেই;
শিডিউল তৈরি করতে হচ্ছে, লেকচার চেক করতে হচ্ছে।
আর এটা তো নতুন কিছু নয়,
রোজই এমন ২-৩ জন করে আসে।
এসএসসির রেজাল্ট ৪ পয়েন্টেরও কম অথচ এখানে ভর্তি করানোর জন্য কতো সুপারিশ,
অনুনয় বিননয়;
যেখানে ভর্তি ফর্মেই দেয়া আছে ৪.৫০ এর কম পয়েন্টের কেউ আবেদন করতে পারবেনা।
তারপরেও কেনো যে এসে ভীড় করে তারাই ভালো জানে।
এর ঘন্টা তিনেক বাদে আফজাল এসে আবারও বললো যে,
স্যার উনি এখনও যান নি।
আপনার সাথে দেখা করে তবেই যাবেন।
কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম,
– আচ্ছা,তুমি আপাতত যাও;
আমি যাওয়ার আগে দেখা করে নেবো।

ভুলক্রমে বাসায় চলে এলাম,কিন্তু ওনার সাথে আর দেখা করা হলোনা।
রাত্রিবেলা হঠাৎ খেয়াল হলো যে,আমি তো ওকে বলছিলাম ওনার সাথে দেখা করে নেবো।

তৎক্ষনাৎ আফজালকে কল দিলাম।
জিজ্ঞেস করাতেই ও বললো স্যার সন্ধ্যে পর্যন্ত উনি কলেজ গেটের পাশেই বসে ছিলেন।
তারপর চলে গেছেন।
আমি ওকে ধমক দিয়ে বললাম,
আমাকে কি আর কল দিয়ে জানানো যেতো না।
ও বললো স্যার আপনাকে শুধু শুধু বিরক্তিতে ফেলতে চাইনি।
রেগে ফোনটা রেখে দিলাম।

এর মাস ছয়েক পরে হঠাৎ কলেজের ঠিকানায় আমার নামে একটা চিঠি এলো।
চিঠিটার খামে আমার স্কুলের নাম লেখা
‘দক্ষিণ লবণগোলা উচ্চ বিদ্যালয়’
ভেতরে ছাপানো একটা সাদা কাগজে লেখা আগামী মঙ্গলবার এই স্কুলের শতবর্ষ পূর্ণ হবে।
এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।আপনি বিশেষভাবে আমন্ত্রিত।
ওই রাতেই আমি আমার মাধ্যমিকের কয়েকটা বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে আমাদের ব্যাচের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী ই এ অনুষ্ঠানে যোগ দেবে,মোটামুটি একটা রি-ইউনিয়নের মতো হতে যাচ্ছে।
আমার নম্বর ওদের কারোর কাছেই নেই
তাই আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে নি।

যাইহোক,ওদেরকে আমি কনফার্ম করে দেই যে আমি আসতেছি।

শহরে উঠেছি আজ প্রায় ১৩ বছর।
আজকাল আর গ্রামে একদমই যাওয়া হয়ে ওঠেনা।
শেষবার গিয়েছিলাম তাও বছর ছয়েকের বেশি হয়ে গেছে।
সবমিলিয়ে এ অনুষ্ঠানটা ঘিরে খুব উৎসাহ কাজ করছিলো।

যথারীতি অনুষ্ঠানের দিন সকালেই স্কুলে পৌঁছাই, বন্ধুদের সাথে প্রায় দেড় যুগ পরে দেখা;
তাই আবেগটাও সামাল দিতে পারছিলাম না।

অনুষ্ঠান শুরু হলো কুরআন তেলাওয়াত এবং গীতাপাঠ দিয়ে।
এরপর জাতীয় সংগীত এবং মোনাজাত।

মঞ্চের এক কোণে চেয়ার পেতে আমরা কয়েকজন বসে আছি।
তখন মোনাজাত চলছিলো।
এ স্কুলেরই নতুন ধর্মীয় শিক্ষক মাইকের সামনে হাত তুলে মোনাজাত করছেন;
আমিও অন্য সবার মতোই মোনাজাতে নিমগ্ন ছিলাম।
কিন্তু হুজুরের একটা কথায় হঠাৎ চমকে উঠি।
উনি বলছিলেন,আল্লাহ এ স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষিকা নাসিমা বানু ম্যাডামকে তুমি জান্নাতবাসী করো,তার কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দাও।

আমার শরীরে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠলো।
মোনাজাত শেষে বন্ধু ফয়সালকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে,ম্যাডাম তিন মাস আগে হার্ট এট্যাকে মারা গেছেন।

তখনই অনুষ্ঠান রেখে আমি ওনার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই।
এখান থেকে আধঘন্টার দূরত্ব।
গ্রামের রাস্তা তাই গাড়ির চলাচলও খুব একটা নেই। অগত্যা পায়ে হেঁটেই যেতে হলো।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে কিছু কথা জানিয়ে রাখি,
আমি যখন খুব ছোটো মানে আমার বয়স
পাঁচ কি ছয় হবে তখন থেকেই কোনো এক অজানা কারনে আমার মা বাবা আলাদা হয়ে যান।
আমি আর আমার ছোটোবোন দাদির কাছেই বড় হয়েছি।
যখন ছোটো ছিলাম তখন বাবা প্রতিটা রোজার ঈদে আমাকে নতুন জামা প্যান্ট কিনে দিতেন
আর সেগুলো একবার পড়েই আমি উঠিয়ে রাখতাম কোরবানির ঈদে পড়ার জন্য।
এরপর যখন একটু বড় হলাম তখন থেকে বাবা আমাকে ঈদের পোশাক দেয়া বন্ধ করলেন।
তবে আমার ছোটো বোনকে কিনে দিতেন।
এ নিয়ে আমার কখনও কোনো অভিযোগ ছিলোনা;
কারণ বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে রোজগার করতেন।
পারিবারিক এমন দৈন্যদশা দেখেই আমার বড় হওয়া।

একবার ঈদের ছুটি শেষে স্কুল খুললে প্রথমদিন সবাই সবার নতুন জামাকাপড় পড়ে আসে;
ওইদিন কেবলমাত্র আমি একাই স্কুল ড্রেস পরে যাই।
আর ঈদ পরবর্তী সময় বলে শিক্ষকরাও স্কুল ড্রেস না পড়ায় কাউকে কিছু বলতো না।

নাসিমা ম্যাডাম আমাদের সমাজ পড়াতেন।
ক্লাস শেষে উনি আমাকে ডাকলেন।
জিজ্ঞেস করলেন,এবার ঈদে কি কি কিনেছি।
হয়তো আমাকে দেখে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন বলেই এমন জিজ্ঞাসা।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম,তারপর উত্তর দিলাম ‘কিছুনা’
এরপর কথায় কথায় জানতে পারলেন যে,
আমার মা আলাদা থাকেন।
সেদিন থেকেই ম্যাডাম আমার প্রতি একটা অন্যরকম স্নেহময় দৃষ্টি দেয়া শুরু করলেন।
পড়াশোনায় তাগিদ দিতেন,নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন।
স্কুলের পাশের দোকানটায় বলে দিয়েছিলেন যাতে আমার কাছে কোনো খাবারের দাম না রাখে,ওগুলো ম্যাডাম পরিশোধ করবেন।

ম্যাডামের এই সামান্য ভালোবাসাটুকুর মাঝে আমি সত্যিই সেদিন একটা মাতৃস্নেহের আবেদন খুঁজে পেয়েছিলাম।

এরপরের দুটো বছরে প্রতিটা ঈদে ম্যাডাম আমাকে একটা করে নতুন জামা কিনে দিতেন।

জানিনা, ক’জন ছাত্র তার শিক্ষকের থেকে এতটা ভালোবাসা পায়।
তবে আমি সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন।
ওনার কাছে আমি তাই চিরঋণী।

ম্যাডামের বাড়িতে পৌঁছালাম।
ওনার বড় নাতির সাথে আলাপ হলো।
হাতের ইশারায় ওনার কবরটা দেখালেন।
দক্ষিণ পাশের পুরানো বাঁশঝাড় সংলগ্ন।
আমি আস্তে আস্তে ওনার কবরের পাশটায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
একপাশে একটা রক্তজবা ফুলের গাছ,তিনটে আনারসের চারা,আর অন্যপাশটায় মাথা তুলে দাঁড়ানো ঘন বাঁশের সারি।
আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা শুয়ে আছেন এই চির সবুজের মাঝখানে।
আসার পথে ওনার নাতি আমার হাতে একটা চিঠি দিলেন,
হলুদ খামে মোড়ানো।
বললো,চিঠিটা নাকি আমার জন্যই।
ফেরার পথে চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করলাম,

স্নেহাস্পদ শিহাব,
আশা করি অনেক ভালো আছিস।
একটা বিশেষ কথা বলার জন্য তোকে লিখছি।
জুলাই মাসের নয় তারিখে আমি একবার গিয়েছিলাম তোর কলেজে।
নাতিটাকে ওখানে ভর্তি করাবো ভাবছিলাম।
অনেক চেষ্টা করেও তোর সাথে দেখা করতে পারি নাই।
তাও দেখে ভালো লাগলো যে,তুই অনেক উন্নতি করেছিস।
তোর কাছে তো আর এখন যে কেউ যেতে পারে না।কত রকমের পাহারাদার থাকে।
আমি তোর গার্ডের কাছে ইচ্ছে করেই আমার পরিচয় দেই নি।
ভাবছিলাম তুই হয়তো দেখা করবি কিন্তু…
থাক;
তোর জন্য দোয়া রইলো।
জীবনে আরও অনেক উন্নতি কর।
ইতি
নাসিমা বানু
প্রাক্তন সহকারী শিক্ষিকা
দক্ষিণ লবণগোলা উচ্চ বিদ্যালয়।

কিছুক্ষণের জন্য হা হয়ে রইলাম।
চিঠিটা পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই চোখ থেকে জল বেয়ে পড়ছিল।
‘যে আমাকে এতোটা স্নেহ দিয়ে গড়ে তুললো,
তার প্রতি নিজের এহেন অকৃতজ্ঞতা’এটা ভেবে
খুব বেশি অনুশোচনা হতে লাগলো।
এরপর আর অনুষ্ঠানে যাইনি।
সোজা চলে এসেছি নিজের জায়গায়।
আর আফজালকেও বলে দিয়েছি,এরপর থেকে আমার সাথে কেউ দেখা করতে এলে
তাকে যেন সরাসরি ই আমার রুমে পাঠিয়ে দেয়।

হাসিবুর রহমান ভাসানী কবি, সাহিত্যিক ও মেডিকেল ছাত্র।

আরও পড়ুন