আসা যাওয়ার গল্প

হাসিবুর রহমান ভাসানী

বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম।কাউকে কিছু না জানিয়ে সোজা কুমিল্লায়।
তারপর সিমটাও বদলে ফেলি।এতসব হয়েছে শুধুমাত্র একটা ফোনকলের দরুন।আসলে ঐদিন আমি দুলাভাইয়ের সাথে মার্কেটে গিয়েছিলাম বিয়ের বাজার সদাই করার জন্য।হঠাৎই একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে।

–হ্যালো,কে বলছিলেন..?..হ্যালো..হ্যালো..
অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিললো না।
অগত্যা কলটা কেটে দেই।
এর কিছুক্ষণ পর আবারও একই নম্বর থেকে কল আসে।রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা পরিচিত কন্ঠ ধরা দিলো।
–মামুন আমি শিল্পী।
আমি কিছুক্ষন চুপ করে রইলাম,তারপর জিজ্ঞেস করলাম,
–ওহ..কল দিয়েছো কেনো ?
আমাকে না তোমার দরকার নেই,তুমি তো তোমার মায়ের পছন্দের ছেলেকেই বিয়ে করতে যাচ্ছো।ও এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
-সরি মামুন,আমার ভুল হয়ে গেছে।এবারের মতো প্লি..ই..জ মাফ করে দাও।তুমি কোথায় তোমার সাথে একবার দেখা করতে চাই..?

আমি আর কিছু না বলেই কলটা রেখে দেই।চাইলেই হয়তো বলতে পারতাম যে আমার এক সপ্তাহ পরেই বিয়ে,
কিন্তু কেনো যে বললাম না সেটা নিজেও জানি না।আমাদের সম্পর্কটা ছ’মাসের।আমি কুমিল্লাতেই চাকরি করি আর ওওখানেই একটা ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করে।মাসখানেক আগে হঠাৎ ওকে বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়।ছেলে ভালো চাকরি করে তাই ওর বাবা মা সানন্দেই রাজি হয়ে যায়।আমি ওকে বলছিলাম আমার কথা ওর বাসায় বলার জন্য।কিন্তু আমার ছোটো চাকরি শুনেই ওর বাবা মা নাকচ করে দেয়।
আমাদের মধ্যে যোগাযোগটাও কমতে থাকে।একসময় খবর পাই ওকে ছেলেপক্ষ এসে আংটি পড়িয়ে গেছে।
কিছুদিন ডিপ্রেশন এ ছিলাম তারপর ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে আসি।বাড়ি আসতেই মা আর ভাবি বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা শুরু করে দেয়।
আমিও খুব একটা দ্বিমত পোষণ করিনি।আর তারই ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত।

শিল্পীর কলটা পেয়ে আমার পুরানো প্রেম যেন আবারও জেগে ওঠে।ওর প্রতি একটা অদ্ভুত সহানুভূতি কাজ করছিলো।
আর এটাই ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।ওইদিন সন্ধ্যাবেলা সবার চোখ এড়িয়ে আমি বাড়ি ছাড়ি।রাতে অনেকবার বাড়ি থেকে কল আসায় সিমটাও বদলে ফেলি।পরদিন সকালে কুমিল্লায় পৌঁছাই।দুপুরের দিকেই শিল্পীর সাথে একবার দেখা করি।
ও আমাকে বললো,
-আমি খুব করে চাইছিলাম যাতে ওখানে আমার বিয়েটা না হয়।যেদিন আংটি পরিয়ে গেলো,তারপর থেকে ওই ছেলের সাথে আমার দুদিন কথা হয়।তাকে আমাদের সম্পর্কের কথা বলায় সে নিজের থেকেই সরে গেছে।আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।

ওর ওইদিনের কথাগুলো শুনে সত্যিই নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়েছিল।ওর সাথে রাগ করে এদিকে বিয়ে করা বা ওর থেকে দূরে যাওয়ার জন্যও বেশ অনুশোচনা হতে লাগলো।এরপরের মাস দেড়েক একদম সব ঠিকঠাক ছিল ।আগের মতোই কথা হতে লাগলো,সপ্তাহে দুই তিন দিন দেখাও হয়।এদিকে বাড়িতে কল দেয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না।তাও একদিন মাকে কল দিয়ে বললাম মা আমি এখন বিয়ে করতে পারবো না।

এরপর একুশে ফেব্রুয়ারির দিন আসলে ওর সাথে একবার দেখা করি,ওটাই ছিলো আমাদের শেষ দেখা।
কিছুদিন বাদে ও আবারও আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।এবার আর রাগ সামলাতে পারলাম না।
সোজা ওর বাড়িতে চলে যাই।ও তখন এ বাড়িতে নেই।
ওর বড় ভাই আমাকে বেশ হুমকি ধামকি দিতে লাগলো।বললো,শিল্পীর বিয়ে হয়ে গেছে।
আমার মাথার যেন বাজ পড়লো।
আমি আর অতিরিক্ত কিছু না বলে ওখান থেকে চলে আসি।
পরে যা জানতে পারলাম তা হলো,
যারা ওকে আংটি পরিয়ে গেছে,পরবর্তী সময়ে সেই ছেলের নামে বেশ অপকর্মের কথা শুনলে ওর পরিবার তার কাছে মেয়ের বিয়ে দিতে কিছুটা পিছপা হয়।যে জন্য মাঝখানের এই বিলম্বটা,যদিওবা এরপরেও ওই ছেলের সাথেই শিল্পীরবিয়ে হয়।
আর এর ফাঁকে এই ভদ্রমহিলা আমার সাথে কিছুদিন অভিনয় করে গেলেন।

যাইহোকদুমাস পর ঢাকা হয়ে আবারও বাড়ি ফিরছি।এমভি সুন্দরবন নামক লঞ্চের দোতলায় চাদর বিছিয়ে ডেকের উপর আসন গেড়ে বসলাম।চারদিকে অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করছে।দোতলার সিঁড়ির পাশেই একটা ১৩-১৪ বছরের বাচ্চাকে শোয়ানো হাতে ক্যানোলা লাগানো স্যালাইন চলছে।পাশে ওর মা বসে আছেন। ২-৩জন মানুষ ওর দিকে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আছেন। আমি কিছুটা আগ্রহ নিয়ে ওখানে গেলাম।একদম জীর্ণ কঙ্কালসার দেহ।
ওর মাকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে ছেলের।বললো

-ক্যান্সার,
-তো ওকে নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছেন কেনো..?
-ডাক্তার ফেরত দিয়েছেন।
(বুঝতে পারলাম,অন্তিমকাল বেশ নিকটেই;হয়তোবা ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ)। এরপর আবার নিজের জায়গায় চলে আসি।

রাত দশটার দিকে হঠাৎ ছেলেটার চোখ মুখ বাঁকিয়ে যাচ্ছিলো।ওর মা চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করলো।কেউ একজন পাশ থেকে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বার দুয়েক বললেন,
-এখানে কেউ কি আলেম আছেন ? কেউ কি কোরআন শরিফ পড়তে পারবেন ?
একটু পর একজন হুজুর পাওয়া গেল।ভদ্রলোক ছেলেটার পাশে বসে কুরআনের কিছু অংশ/আয়াত মুখস্থই পড়ে যাচ্ছিলেন।
চারদিকে লোকজনের ভীড় জমে যাচ্ছে।ওর মাকে অন্য এক মহিলা ধরে আছেন।
সান্ত্বনা দিচ্ছেন যে,

-ভাবি কিচ্ছু হবে না।আল্লাহ আছেন।
এদিকে লঞ্চের সিকিউরিটি স্টাফরা একটু পর পর লাঠি দিয়ে লোকজনকে তাড়াচ্ছেন।উচ্চস্বরে হাঁকছেন ‘এখানে কেউ ভীড় করবেন না’
বুঝতে পারছিনা,মানুষের এতো মৃত্যুদৃশ্য দেখার আগ্রহ কেন?একটু পরে ছেলেটা মারা যায়,তখন রাত সাড়ে দশটা বাজে।
ওর মা আরও দুজন পুরুষ মানুষ(মামা,ভাই)একসাথে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো।
সে রাতে পুরো লঞ্চ ওদের কান্নায় ভারী হয়ে গিয়েছিল।
জীবনে বহুবার লঞ্চ ভ্রমণ করেছি কিন্তু এমন অপ্রতিকার ঘটনার সম্মুখীন আগে কখনোই হই নি।
কেউ একজন বললো,
-মৃত মানুষের মাথার নিচে বালিশ রাখতে হয় না।
ওর মামা আবার মাথার নিচ থেকে বালিশটা সরিয়ে দিল।একটা চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলা হলো ওর দেহটাকে।আমি এরপর ঘুমিয়েই পড়েছিলাম।
রাত ৩ টার দিকে আচমকা ঘুম ভেঙে যায়।ওদিকে তাকিয়ে দেখি ওর মামা আর ভাই দুজনেই লঞ্চের এক পাশে হেলান দিয়ে ঘুমুচ্ছেন।
কেবল ওর মা মৃত ছেলের মাথাটা কোলের মধ্যে নিয়ে তখনও কাঁদছিলেন।

হঠাৎ করে মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ে গেলো।মা আমাকে বিয়ে করাবেন;কতোখানি আনন্দ আহ্লাদ নিয়ে মেয়ে দেখলেন,
বিয়ে ঠিকও করলেন।আর আমি,যে কিনা সবকিছু তছনছ করে দিয়ে বিয়ের এক সপ্তাহ আগে বাড়ি থেকে পালালাম।

সত্যিই নিজেকে বেশ অযোগ্য সন্তান মনে হচ্ছে।

ভাবতে লাগলাম বাড়িতে গিয়ে কিভাবে মুখ দেখাবো,সবার প্রতিক্রিয়াই বা কি হবে..? একটু পর ডেক ছেড়ে লঞ্চের ছাদে চলে যাই,
জোছনা রাত,চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে নদীর জলে।নদীর দুপাশে দূরের গঞ্জ দেখা যাচ্ছে, কয়েকটা ছোটো নৌকা তখনও মাছ ধরায় ব্যস্ত।
লঞ্চ বাঁক নিলো,স্টাফরা বাঁশি বাজাচ্ছেন; শেয়ালিয়া ঘাট এসে গেছে।
লঞ্চ ভীড়লো,
আমি দেখতে লাগলাম দুজন মানুষ ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে মৃত ছেলেটিকে,পেছনে ওর মা তখনও চিৎকার দিয়ে কাঁদছেন।
“ওরে জুয়েল,আমার বাপ;
তুই কেন গেলি আমারে ফেইলা”
লঞ্চ আবার ঘাট ছাড়লো।
আর রেখে গেলো কিছু জমাট দুঃখ;

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও মেডিকেল ছাত্র

আরও পড়ুন