গলির বাঁকে

শরীফ উদ্দীন

আমি হলাম হতাশা-স্রষ্টা। আমার বড় দুই ভাই। দশ বছর ব্যাবধানে একটি কন্যা সন্তানের জন্য বাপ-মায়ের আহাজারি চরমে উঠলে আমার আগমন। ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্র আমার ‘ইয়ে’ দেখে প্রথমে দাইমা, দাইমার মুখে শুনে বাপ-মা হতাশ। বাপ মায়ের মৃত্যুর পর পড়ালেখার ধরন দেখে ভাইয়েরা হতাশ। বিয়ের পর আয়-উপার্জনের মতিগতি দেখে বউ হতাশ।

আলাদা সংসার। প্রথমে পাঁচ শতাংশ, তারপর দশ শতাংশ- এভাবে জমি বিক্রি করে বছর পার করতে করতে শুধু বসত বাড়িতে এসে ঠেকে। বিদেশে কাজে যেতে আমার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু, বউয়ের উৎসাহের কমতি ছিল না। দুই সন্তানের জন্য বসত ভিটে রক্ষায় বউ মরিয়া হয়ে উঠল।

বউকে ভয় দেখালাম, ‘বিদেশে গেলে আর ফিরব না। মধ্যপ্রাচ্যে যেসব বাংলাদেশি নারী কাজে যায় তাদের কাউকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে যাব।’

বউ হেসে উত্তর দিল, ‘অবিশ্বাসের লোহার শিকল অপেক্ষা বিশ্বাসের সুতোর জোর কোটিগুণ বেশী। আমি তোমাকে বিশ্বাসের সুতো দিয়ে বেঁধে রেখেছি।’

আত্বীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের নিকট থেকে জোগাড় হল যৎসামান্য। বউয়ের নামে বিভিন্ন এন.জি.ও থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিলাম। অসৎ আদম ব্যাপারীর খপ্পরে পড়েছিলাম। জাল কাগজ-পত্রের কারণে আমাকে আবুধাবীর জেলে যেতে হল।

ঋণের কিস্তির যন্ত্রণা বড় যন্ত্রণা। ইতিহাসের কাবুলিওয়ালারা নির্ধারিত সময়ের পরে দু-চার দিন  ফিরে যেত। কিন্তু, এন.জি.ও নামক আধুনিক কাবুলিওয়ালারা কিস্তি না নিয়ে ফিরে না। আমি বিদেশ-বিভূঁইয়ের জেলে। ঋণের সব চাপ বউয়ের বুকের উপর। সেই চাপে এক রাতে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হল।

দেড় বছর পর ছাড়া পেয়ে দেশে ফিরার ভাগ্য হল। এন.জি.ও ঋণের বীমা করা থাকে। বউয়ের মৃত্যুতে ঋণ আগেই মাফ হয়েছিল। বীমা বাবদ এন.জি.ও থেকে কিছু টাকাও পেলাম। সবার কথা অমান্য করে শূন্য ঘরে তালা মেরে  দুই নাবালোক ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। আমার সাথে আবুধাবীর জেল ফেরৎ এক বন্ধুর মাধ্যমে পুরান ঢাকার ‘নিরালা নীড় আবাসিক হোটেল’এ ম্যানেজারের চাকরী পেলাম।

হোটেল মালিক ইহকালের সাথে সাথে পরকালের কথাও ভাবেন। এই হোটেলের ভিতর কেনা-বেচা নিষিদ্ধ। আমরা কেবল রুম ভাড়া দেয়ার নিয়ম-নীতিকে বামে সরিয়ে রাখি। বাড়তি উপার্জনের জন্য শুধু ঘণ্টা প্রতি রুম ভাড়া দিই। দেড়-দুই ঘণ্টার জন্য জোড়ায় জোড়ায় যারা আসে তাদের কোথায়, কখন, কিভাবে, কার মাধ্যমে পরিচয় হয় তা আমাদের জানতে নেই। রুম সার্ভিস এসব জোড়ারা  পছন্দ করে না।

আজকের আগে মেয়েটিকে কখনও দেখিনি। নতুন। চেহারা সাধারণের থেকে বেশি। বয়স একুশ-বাইশ। রিসিপশনের সোফাতে বসে কখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, কখনও মাথা নিচু করে চুপচাপ থাকছে। আবার কাঁদছে। প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশ মিনিট ধরে দেখছি।

এখানে সঙ্গীরা আনন্দ নিতে আর সঙ্গীনিরা আসে আনন্দিত হওয়ার অভিনয় করতে। কারও কান্না দেখার মত মন ও সময় তাদের নেই। আমাদের তো কৌতুহলই থাকতে নেই। মালিকের হুকুম। আমাদের শুধু দেখে যেতে হয়।

কোনো কোনো দিন আমাদের এখানে ধর্ম ভাই পাতানোর হিড়িক পড়ে। পুলিশ রেড দিলে সঙ্গীনিরা শুরু করে, ‘ও ভাই, ভাইগো, আপনি আমার ধর্ম ভাই। ছেড়ে দিন ভাই।’

প্রত্যেক সঙ্গীনি সেদিন পুলিশের মধ্যে ধর্ম ভাই খুঁজতে থাকে। ধর্ম ভাইয়েরা আন্তরিক হয়ে উঠে। দরদী কণ্ঠে বলে, ‘আহা ! কতদিন ধরে বাপের বাড়ি আছিস ! চল, তোদের শ্বশুর বাড়ি দিয়ে আসি।’
পুলিশ ভ্যানে তুলে ধর্ম ভাইয়েরা সবাইকে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যায়। কিছুদিন না যেতেই উকিল বাপের সহায়তায় তারা অনির্ধারিত সময়ের জন্য বাপের বাড়ি নাইওরে আসে।

নতুন নতুন দেড়-দুই ঘণ্টার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায়ই মধ্যবয়স্ক এক সুদর্শন এখানে আসে।  হোটেল রেজিস্টারে তার একদিনের নামের সাথে আরেকদিনের নামের মিল থাকে না। সেদিন নাম লিখাল আব্দুর রউফ। রুমের চাবি হাতে নিয়ে ঘুরতেই নিজের ভাতিজাকে সঙ্গীনিসহ হোটেলের গেটে ঢুকতে দেখে  আব্দুর রউফ ডেস্কের উপর দিয়ে লাফিয়ে আমার পায়ের নিকট পোষা বিড়াল হয়ে বসে থাকল। পোষা বিড়ালের পায়ে আঙুল থাকে। আব্দুর রউফের হাতে আঙুল। ডেস্কের তলে মাথা গুঁজে দিয়ে আমাকে খোঁচা মারতে লাগল। আব্দুর রউফের আঙুল অনুসরণ করে ভাতিজাকে সব উপরের রুমের চাবি দিলাম। ভাতিজা সঙ্গীনিকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যেতেই আব্দুর রউফ উঠে দাঁড়িয়ে ভাতিজার জন্য দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘বড়ই আফসোস ! ভাতিজা আমার কুপথে চলে গেছে। শাসন করতে হবে।’

রুম না নিয়ে চাবি ফেরৎ দিয়ে আব্দুর রউফ সঙ্গীনির সাথে সুপথে বেরিয়ে অন্য হোটেলের রাস্তা ধরল।

গতকাল কোট-প্যান্ট-টাই পরা এক ভদ্রলোক এলেন। সাথের সঙ্গীনিকে আমরা খুশি নামে চিনি। খুশিকে আগাম খুশি করতে ইতস্তত করলে খুশি একেকদিন একেক উপায়ে সঙ্গীকে নাজেহাল করে। কাল বনিবনা না হওয়ায় খুশি সুযোগ বুঝে সময়মত টাই-বাবুর প্যান্ট নিয়ে বাইরে থেকে রুমের দরজা লাগিয়ে সরে পড়ল। টাই-বাবু ভিতর থেকে দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ডাকাডাকি শুরু হল, ‘খুশি, ও খুশি, ভিতরে এসো। আমি তোমাকে খুশি করে দিব।’

প্যান্টের অস্থায়ী মালিকের কানে সেই ডাক গেল না। সে তখন প্যান্টের দাম কত দিলে প্যান্টের স্থায়ী মালিককে প্যান্ট ফেরৎ দিবে তা নিয়ে ছাদের সিঁড়িতে বসে হিসাব কষছে। টাই-বাবু খুশির সাড়া না পেয়ে অন্যদের ডাকতে শুরু করল, ‘কে আছেন, ভাই? ম্যানেজারকে ডেকে দেন, ভাই।’

সার্ভিস বয়ের মুখে খবর পেয়ে আমি গেলাম। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে দেখি, কিছুক্ষণ আগের টাই-বাবু গায়ে কোট, গলায় টাই আর পরনে বিছানার চাদর পরে চাদর-বাবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সার্ভিস বয়দের মধ্যস্থতায় পুনরায় টাই-বাবু হয়ে ফিরে গেলেন।

সোফার উপর ধপ করে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে মুখ তুলে দেখি, নতুন মেয়েটি মাথা বামে কাত করে চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে  আছে। নেতিয়ে পড়েছে। রেজিস্টার খাতা বন্ধ করে এগিয়ে গেলাম। জ্ঞান হারায় নি। হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে চোখ মেলে তাকাল। এক গ্লাস পানি দিলাম। গ্লাস নামিয়ে রেখে আমার মোবাইল নিল। মোবাইল সামনে ধরে অসহায়ভাবে একবার মোবাইলের দিকে, একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। বুঝলাম, ওর কোনো নম্বর মনে পড়ছে না। মানুষের চোখের জল নকল হতে পারে কিন্তু চোখের ভাষা মিথ্যা হয় না।

মেয়েটির নাম বিভা । হিন্দু ঘরের উঁচু জাতের মেয়ে। দুবছর আগে মুসলমান ছেলেকে ভালোবেসে ঘর ছাড়ে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ঢাকায় এক গার্মেন্টসে কাজ নেয়। দুজনের কারো পরিবারই তাদের মেনে নেয় নি। তিন মাস আগে চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে স্বামী বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে পিছনের সি.এন.জি অটো রিক্সা শরীরের উপর দিয়ে চলে যায়। একটি পা ভেঙ্গেছে। গুরুতর আঘাত লাগে বুকে, মাথায়। চার দিন পর জ্ঞান ফিরে। গত দুই মাস ধরে বিভাকে রাত কাটাতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝেতে। ডাক্তার আছে। নার্স আছে। কিন্তু, বিভার হাত খালি। ঔষধ নেই।

আমি ভুক্তভোগী, মানুষ শিকারিদের পাল্লায় পড়ে বিদেশের জেলে অসহায়ের মতো ছটফট করেছি। আমি জানি, শকুন যেমন ভাগাড়ের খোঁজ রাখে তেমনি মানুষ শিকারীরা অসহায় মানুষের ঠিকানা জানে। হাসপাতালে পরিচয় এমন একজন দালাল বিভাকে  তিন দিন আগে ঔষধের টাকা জোগাড়ের এই শর্ট-কাট পথ দেখায়। দুপুরে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গার্মেন্টসের চারজন বান্ধবীর নিকট থেকে সাত হাজার টাকা ঋণ করে। এক সপ্তাহ ধরে স্বামীর শরীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর জন্য ডাক্তার চাপ দিচ্ছে।

গার্মেন্টস থেকে বের হয়ে দুই হোটেল ঘুরে এসে তৃতীয় সঙ্গীর সাথে এখানে। নতুন মেয়ে। এই পথের ‘সর্বদা সতর্ক থাকবে’ নীতি সম্পর্কে জানে না। ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে দেখে, সঙ্গীটি ব্যাগসহ হাওয়া হয়ে গেছে। হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ‘হাওয়া-ব্যাক্তি’কে দেখা যাবে কিন্তু এমন মামলা নিয়ে থানায় যাওয়া যায় না।

আমার নিচে পড়ার ভয় নেই। আমি মৃত-স্ত্রীর বিশ্বাসের সুতো দিয়ে বাঁধা। বিভার হাত ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম। বিভার বাকী কাহিনি শুনতে শুনতে হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম।

পরিস্থিতি মানুষকে যেমন পর করে তেমনি কখনও কখনও আপনও করে দেয়। বিভার স্বামীকে আশ্বস্ত করলাম। ঔষধ-পত্র কিনে দিয়ে পকেটের বাকী টাকা বিভার হাতে দিলাম। ওয়ার্ড থেকে বের হওয়ার সময় বললাম, ‘আগামীকাল মালিকের কাজে সাভারে যাব। ফিরতে সন্ধ্যা হবে। পরসু আসব।’

হাসপাতালের মেইন গেট পার হব এমন সময় পিছন থেকে বিভার কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘দাদা।’

বিভার ডাকে থমকে গিয়ে ঘুরে দাড়ালাম। দৌড়ে এসেছে। দুই হাত দিয়ে দুই হাটুর উপর শরীরের ভর রেখে হাঁপাচ্ছে।

ওখান থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে মুখ তুলে বিভার কাতর অনুরোধ, ‘আগামীকাল ভাই ফোঁটা। তুই একবার আসবি, দাদা ?’

ভেবেছিলাম আবুধাবীর জেলে চোখের সব জল রেখে এসেছি। ভুল ধারণা। বিভার মুখে দাদা ডাক শুনে মুহূর্তের মধ্যে চোখে জল জমতে শুরু করল। ঝরে পড়ে সেই ভয়ে এগিয়ে না গিয়ে সেখানে দাঁড়িয়েই মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে বিভাকে আঙুল দিয়ে ওয়ার্ডে ফিরতে ইশারা করে ভেজা চোখে হোটেলের পথে পা বাড়ালাম।

রাতে ছুটির সময় মালিক এলে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। মেয়ে না পাওয়ার আফসোস নিয়ে বাপ-মা মরেছেন। বাপ-মায়ের মৃত্যুর অনেক বছর পর আমি বোন পেলাম। ভাইয়ের এমন পরিবেশের চাকরিতে কোনো বোনের স্বস্তি মিলে না।

শরীফ উদ্দীন -সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন