জন্মদাগ

সুস্মিতা মিলিঃ

কয়েকদিন থেকেই ফাল্গুনীর মনটা অনেক খারাপ।মেজাজটাও কেমন তিরিক্ষি আছে।এমনিতেই তার ধৈর্য কম আর এখন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তার এই মন মেজাজ খারাপ থাকার কারণ হলো – বেশ কয়েকদিন থেকে লক্ষ্য করেছে দুজন মানুষ তাকে সব জায়গায় ফলো করছে।একজন পুরুষ আরেকজন মহিলা।দুজনই মধ্যবয়সি।দেখতেও মনে হয় বেশ পয়সাওয়ালা। একটা গাড়ি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই টিএসসিতে আসেন ওরা।বসন্ত বরণের দিন থেকেই এই অবস্থা। সেদিন ছিলো ফাল্গুনীর জন্মদিন। টিএসসিতে বন্ধুদের সাথে অনেক মজা করেছিলো সেদিন। মানুষ দুজন হঠাৎ তাকে দেখে চমকে উঠেছিলো। নামও জিজ্ঞেস করেছিলো তার। নামটা শুনার পর মহিলাটা কেমন চুপ করে গেলো।
ব্যস তারপর শুরু হলো দূর থেকে তাকে দেখা। মনে হয় যেন তাজমহল দেখছে!তবে ওরা শুধু দূর থেকেই ওকে দেখে, কাছে আসেন না।

ফাল্গুনী ঠিক করলো তাদের কাছে যাবে, গিয়ে জিজ্ঞেস করবে ওরা সবসময় কেন তার আশেপাশে থাকে।কেন তাকে দূর থেকে প্রতিদিন দেখেন।ওরা কি বুঝেনা যে অনেক অস্বস্তি হয় কেউ এভাবে তাকিয়ে দেখলে?
ভার্সিটিতে গিয়েই দেখলো আজ শুধু মহিলাটা এসেছে।মুখটা মলিন।একটা গাছের নিচে অসহায়ের মতো বসে আছে।ফাল্গুনী এগিয়ে গেলো মনে মনে ভাবছে আজ দু’টো কথা শোনাবে তাকে।

ফাল্গুনী এগিয়ে গেলো কিন্তু একি!মহিলাটা কাঁদছে। বকা দিতে এসেও সে কাছে গিয়ে মহিলাটার পাশে বসলো। বললো,
—-আন্টি আপনি প্রতিদিন আসেন।আপনি কি কাউকে খুঁজেন এখানে?
—-আমি আর তোমার আংকেল ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলাম। তাই সময় পেলেই এখানে আসি।এখানেই আমাদের পরিচয় আর প্রেম হয়েছিলো। তারপর বিয়ে তারপর,,,বলেই কাঁদতে থাকেন তিনি।

—-কি হলো আন্টি কাঁদছেন কেন? কেউ কি কিছু বলেছে আপনাকে?

——-আসলে আমরা তোমাকে দেখতেই এখানে আসি।আজ থেকে একুশবছর আগে আমার মেয়ে ফাল্গুনী হারিয়ে গিয়েছিলো।চারদিন বয়সে হাসপাতাল থেকে আমার বুকেরধন চুরি হয়ে যায়। তোমার ডান গালে যে জন্মদাগটা আছে ঠিক তেমনই একটা দাগ ছিলো আমার বাবুর গালে।তাই যেদিন তোমাকে প্রথম দেখলাম আমার একুশ বছর আগের ক্ষতটা তাজা হয়ে গেছে।অবশ্য ঘা আমার কখনোই শুকায়নি।

এগুলো শুনে ফাল্গুনীর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।এমনিতেই নরম মনের মেয়ে সে।তাই মহিলার হাতটি ধরে বললো,
—– এমন নামকরা হাসপাতাল থেকে কিভাবে বাবুটা চুরি হয়ে গেলো আন্টি?কেউ দেখতে পায়নি?আপনারা মামলা করেননি?কোমলগলায় জানতে চাইলো ফাল্গুনী।

—–করেছিলামতো কোন কাজ হয়নি।আমার আর কোন সন্তানও হয়নি, আমরা এখনো আমার ময়নাবাবুটাকে খুঁজে বেড়াই।কিন্তু তোমার গালের এই দাগ দেখে থমকে গেছিলাম সেদিন, তাইতো কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম।আমার মেয়েটা ফাগুনের প্রথমদিনে জন্মেছিলো বলে তোমার আংকেল তার নাম রেখেছিলো ফাল্গুনী। তুমি যখন নাম বললে তখন থেকেই তোমার উপর একটা মায়া পরে গেছে। হয়তো আমার মেয়েটাও এমন বড় হয়েছে তোমার মতো।
তোমার আংকেল অবশ্য আমাকে অনেক বুঝিয়েছে, বলেছে সব কাকতালীয় ।আমার মন মানেনি আমি দেখতে চেয়েছিলাম তোমার গালের মতো আরেকটা দাগ তোমার ডানপায়ে আছে কিনা।কারণ আমার ফাল্গুনী দুটো জন্মদাগ নিয়ে জন্মেছিলো।তোমার আংকেল মেয়ের মুখের আর পায়ের জন্মদাগ দেখে বলেছিলো এক অলক্ষুণে কথা”আমার এই মেয়েকে কেউ চুরি করে নিতে পারবেনা আমি ঠিক খুঁজে বের করে নেব।”

আন্টি আমি যাই, বলেই কোনপ্রকার সৌজন্য না দেখিয়ে হনহনিয়ে ফাল্গুনী চলে গেলো সেদিন।তার মনে ঝড় চলছে, একি শুনছে সে! ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে তিনটি বাচ্চা মরে যাওয়ার পর ফাল্গুনীর জন্ম হয়। আর এটাই শুনে এসছে এতকাল। ফাল্গুনীর জন্মের পর আরও দুজন ভাইবোন হয়েছে তার।কিন্তু মা তাকে অনেক ভালোবাসেন। মাঝে মাঝেই মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, আমায় ক্ষমা করিসরে মা।কেন এই কথা বলে মা?এতদিন এই প্রশ্ন মনে আসেনি তার, আজ কেন এসেছে?

ফাল্গুনী একদৃষ্টিতে তার পায়ের দাগটার দিকে তাকিয়ে আছে।এতগুলো কাকতালীয় ব্যাপার কিভাবে ঘটে মানুষের জীবনে!বাসায় ফেরার পরই ফাল্গুনীর মা মেয়ের অস্থিরতা খেয়াল করলেন। তিনি কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন ভার্সিটিতে কোন প্রোবলেম হয়েছে কিনা।

—-মা মানুষের বাচ্চা কিভাবে চুরি হয়?একজন মা আরেকজনের বাচ্চা চুরি করে কিভাবে নিয়ে আসে?এটা কিভাবে সম্ভব? ফাল্গুনী তার মাকে সরল প্রশ্ন করে।

—-মানে? কি বলিস এসব?তোকে কে বলেছে এসব কথা? ফ্যাকাশে মুখে ফাল্গুনীর মা বললেন।মেয়ের কথায় তিনি থরথর করে কাঁপছেন।

———না মানে একজন মহিলা বলছিলেন অনেকদিন আগে তার বাচ্চা চুরি হয়েছিলো।এখনো ওরা দুজনে রাস্তাঘাটে তাদের বাচ্চাটাকে খুঁজে বেড়ায়।কারন তাদের বাচ্চার এমন একটা জন্মদাগ আছে যা দেখলেই নাকি ওরা বাচ্চাটাকে চিনে ফেলবে?এই বাচ্চাটা চুরি হওয়ার পর তাদের আর কোন বাচ্চা হয়নি।ওদের হাহাকার সহ্য করা যায়না মা।

বলেই কথা না বাড়িয়ে ফাল্গুনী রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগলো।বারবার তার কানে মহিলার হাহাকার ভরা কণ্ঠ ভাসে আসছে।
পরদিন সকাল হতেই সে চলে গেলো ভার্সিটিতে। নাহ্! আজ আর আসেননি ওরা। আজ ফাল্গুনী উল্টা ওদের দুজনকে খুঁজতে লাগলো মনে মনে। নয়দিন পর আবার ওদের সাথে দেখা হলো।ভদ্রলোক অসুস্থ ছিলেন। তাই আসেননি।
এবার ফাল্গুনী নিজেই এগিয়ে গেলো।অনেক কথা হলো ওদের সাথে।

একসময় এই বন্যা চৌধুরী আর মবিন চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ছিলেন।কোন এক বসন্তবরণ অনুষ্ঠানে ওদের প্রথম পরিচয় হয়। তারপর প্রেম এবং বিয়ে। বিয়ের পর ওদের দিনগুলো খুব সুখেই কাটছিলো। তারপর আরেক বসন্ত বরণের দিন ফাল্গুনী এলো ওদের কোল আলোকরে। কিন্তু ওদের সুখে যেন কারো নজর লেগে গেলো। প্রসবকালীন জটিলতায় বন্যাকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো। ওখানে থাকতেই একদিন ভর দুপুরে অসুস্থ বন্যা ঘুমাচ্ছিলো,আর কোন ফাঁকে তাদের ঘুমন্ত কলিজার ধনকে কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেলো। একুশ বছর হয়ে গেলো এখনো ওরা তাকে খুঁজে পায়নি। কত জায়গায় যে মানত করেছে ইয়ত্তা নেই। পায়নি তাকে আর, তবে এখনো আশা ছাড়েননি ওরা ।মরনের আগে একবার হলেও মেয়েকে চান ওরা।

——আপনাদের সন্দেহ হয়না কাউকে?এমন কেউ কি ছিলো যে আপনার মেয়েকে চুরি করতে পারে? ফাল্গুনী বললো।

—–সবাই হাসপাতালের আয়াকেই সন্দেহ করেছিলো।পুলিশও আয়াটাকেই ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু তার এককথা সে বাচ্চা চুরি করেনি।বন্যা বললো।

——–এমন কেউকি ছিলো যার বাচ্চা মারা গেছে।হয়তো নিজের বাচ্চা হারিয়ে আপনার বাচ্চা চুরি করেছিলো।ফাল্গুনী আবার বলে।

——-ছিলোতো একজন ছিলো যার পরপর তিনটে বাচ্চা মারা গিয়েছিল, কিন্তু তিনিতো আমার সামনেদিয়েই গেছে। উনি যখন বিদায় হন তখন আমি সজাগ ছিলাম।ভেবেছিলাম আমার বেবিকে আয়া রোদে নিয়ে গেছে।পরে আয়া বললো সে বেবিকে আমার পাশে ঘুমপাড়িয়ে গিয়েছিল। ঐ মহিলা যাওয়ার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল। তিনি একজন হতভাগা মা, তাকে আমি কখনো সন্দেহ করিনা।

——-আন্টি আপনারা যাবেন আমার বাসায়?আমার মাকে বলেছি আপনাদের কথা।

সেদিন সারারাত ফাল্গুনী ঘুমাতে পারেনি।কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট! এমন হলো কেন তার জীবনটা?সত্যিই কি সে বন্যা চৌধুরীর মেয়ে?নাকি সব কিছুই কাকতালীয়? হে আল্লাহ, সবকিছু যেন কাকতালীয় হয়। এতগুলো চিহ্ন কিভাবে মিলে গেলো?এসব ভাবতে ভাবতেই ফাল্গুনীর সকাল হয়।

দুপুর হওয়ার আগেই বন্যা চৌধুরী আর মুবিন চৌধুরী ফাল্গুনীদের বাসায় আসেন।দরজা খুলে তাদের দেখে চমকে গেলেন ফাল্গুনীর মা। চিনে ফেললেন তাদের। বন্যা আর মুবিন ও চিনলো তাকে। বুঝতে আর বাকি রইলনা ফাল্গুনী তাদেরই মেয়ে। উত্তেজিত মুবিন তাৎক্ষণিক জিজ্ঞেস করে ফাল্গুনী আপনার মেয়ে?আপনারতো মৃত বাচ্চা হয়েছিলো। তার মানে আপনারাই আমার বাচ্চা চুরি করেছিলেন?তারপর হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলেন দুজন।

——-আপনি একজন মা হয়ে আরেকজনের বাচ্চা কিভাবে চুরি করলেন? আমরা এখনই পুলিশ ডাকবো। আমি কত মানুষকে সন্দেহ করেছি শুধু আপনাকে ছাড়া। কাঁদতে কাঁদতে বন্যা বলতে থাকেন।

এদিকে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন ফাল্গুনীর মা।তিনি কিছুই লুকানোর চেষ্টা না করে বলতে লাগলেন——

আমার দুটো বাচ্চা মারা যাওয়ার পর যখন তৃতীয়বার কনসিভ করি তখন আমার মা আমাকে শ্বশুর বাড়ি থেকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। আমার বাচ্চা মরার সকল অভিযোগ আর দোষ মা আমার শ্বশুর শাশুড়ি কে দেন।ফাল্গুনীর বাবা বিদেশে থাকেন,তিনি খুব বিরক্ত হলেন আমার মায়ের ব্যাবহারে। তিনি বললেন এখন যদি বাচ্চা মারা যায় তাহলে তোমার মাকেও কিন্তু আমি ছাড়বো না।

কিন্তু সেবারও বাচ্চাটা মারা গেলো। আমার মা আমার শ্বশুর শাশুড়িকে শুনায়নি বাচ্চা মারা যাওয়ার কথা।যেদিন আমি হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হই আমি তখনো জানিনি আমার মা আপনার ঘুমের সুযোগ নিয়ে ঘুমন্ত ফাল্গুনীকে কাপড়ের ঝুড়িতে করে কাপড় দিয়ে ঢেকে আগেই গাড়িতে রেখে গেছে। তিনি খুব সন্তর্পণে আগেই প্লেন করে কাজটি করেছেন। তারপর আমাকে নিয়ে আসলেন। আপনি কিংবা আমি কেউ তখনো কিছু বুঝিনি। বাচ্চা হারিয়ে আমি কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি স্টার্ট দিতেই আমার মা ঝুড়ির উপরের পাতলা কাপড় সরিয়ে ফেললেন। ঝুড়ির ভেতরে আমি ফাল্গুনীকে দেখে চমকে উঠি।
আমার মা বললেন সংসার বাঁচাতে হলে একটা বাচ্চা তোর দরকার, আমার সংসার বাঁচাতে মা এই অন্যায় কাজ করেছেন।তিনি আর এখন বেঁচে নেই।থাকলে নিশ্চয়ই তিনিও কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতেন।
আমি হাসপাতালে ফেরত গিয়েছিলাম বাচ্চাটা ফিরিয়ে দিতে, কিন্তু সেখানে অনেক পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে যাই।তাছাড়া আমার ভেতরে লোভ ও কাজ করছিলো।মা ডাক শোনার লোভ।মা হওয়ার লোভ।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন