বেবি সুজ

-ইসরাত জাহান

আজ আমার মেয়ে মেহজাবিনের জন্মদিন । কোনোদিন ওর জন্মদিনটা আমরা মনেই করতে পারিনা । আর কিছু না হোক ওর তো ইচ্ছে করে অন্তত ওর মায়ের হাতের একটু ভালো রান্না খেতে । আমি এক অপদার্থ মা । আজ পর্যন্ত ওর জন্য একটু আলাদা করে কিছু রান্না করেও দিতে পারিনি । আমার মেয়ে মেহজাবিনও খুব লক্ষ্মী । কোনোদিন ভুলেও বলে না – মা আজ আমার জন্মদিন, আমার কেক চাই, নতুন জামা চাই বা অন্য কিছু । আর আমার হাজব্যান্ড সাদিকও মেয়ের ব্যাপারে খুব আনমনা ।

কিন্তু যেদিন আমি প্রথম অনুভব করলাম আমি মা হতে চলেছি, আমার প্রেগনেন্সি টেস্ট রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে, আমি ফোন করামাত্রই সে অফিস থেকে ছুটে চলে আসলো সঙ্গে একটা ফুলের তোড়া আর বিশাল একটা নিগ্রো মেয়ে বাচ্চার ছবি । আমি ছবিখানা দেখে বললাম এ কী ? সাদিক আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো আমি চাই এই রকম কালো একটা মেয়ে বাচ্চা । আমাদের মেয়ে মেধা-মননে অনেক বড় হবে কালো মেয়ে হিসেবে নয় । একজন যোগ্য মানুষ হয়ে বড় হবে । এ সমাজকে দেখিয়ে দেবে গায়ের রঙ কোন অন্তরায় নয়, কোন মেয়ের পরিচয় নয় । আমি সত্যি সত্যিই সেদিন কেঁদে ফেলেছিলাম । ওর ভাবনার সাথে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিলাম । সেদিন থেকে শুরু হলো আমাদের নতুন করে পথচলা । প্রতিদিন নতুন নতুন অনুভূতি একটা মানুষের মধ্যে আরেকটা মানুষের জন্ম ।

কী অদ্ভুত আনন্দ ! দুজনের ছোট্ট সংসারে নতুন অতিথির আগমন । প্রতিদিন স্বপ্ন দেখা । আজ আমার হাজবেন্ড সাদিক অফিস যায়নি । সে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরী মোনাজাত ধরতে যাবে তার একটা মেহজাবিন চাই । ছোট ছোট করে নানা আয়োজনে ঘর ভরে গেল । মেহজাবিনের মামা গিয়েছে চীন সফরে, সেখান থেকে চমৎকার ছোট্ট বাক্সবন্দী বেবি সুজ নিয়ে আসলো মেহজাবিনের জন্য ।

তখন মেহজাবিনের অস্তিত্ব শুধু আমার শরীরের মধ্যে । আমি খুব খুশি । আমার অনুভবে মেহজাবিন আর বাইরে ছোট্ট বাক্সবন্দী বেবি সুজ। আমার মন সারাদিন খেলা করে আমার অনুভব আর বেবি সুজ নিয়ে । আজ আলট্রাসাউন্ড করতে যাবো । কী আনন্দ! আলট্রাসাউন্ড হলো আমি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম বলা যাবে ? আমার ছেলে না মেয়ে হবে নার্স হেসে দিয়ে বললো মেয়ে । আমি এক দৌড়ে বেড়িয়ে এসে বসলাম সাদিক আমাদের মেয়ে হবে ।

সেদিন প্রথম দেখলাম সাদিকের অন্য রকম উজ্জ্বল মুখ । একটা প্রশান্তি সারা মুখে জ্বলজ্বল করছিলো । সত্যিই কি বাবা হওয়ার এত আনন্দ ? ডাক্তার ডেট বলে দিলো আগে-পরে যেকোনোদিন হতে পারে । আমরা অপেক্ষা করছি । দুজনের নানা রকম প্রস্তুতি চলছে ।

দেখতে দেখতে কাঙ্ক্ষিত দিনের আগমন ঘটলো । অনেক যুদ্ধ করে আমি মা হলাম । আমার মেহজাবিন এর জন্ম হলো । ওর নরম তুলতুলে শরীর, এক মাথা চুল, ঠিক যেন সাদিকের প্রতিচ্ছবি । আমি অপলক দৃষ্টিতে শুধু দেখছি । তারপর আমি গভীর ঘুম ।

দেখতে দেখতে এক যুগ পেরিয়ে গেল । মেহজাবিন আমাদের সাথে থাকে না । ও চলে গেছে অসীম সীমানায় রঙধনুর দেশে । শুধু রয়ে গেছে বাক্সবন্দী বেবি সুজ ।

মেহজাবিন বেঁচে থাকলে আজ ওর বারো বছর পূর্ণ হতো । মেহজাবিন সশরীরে আমাদের সাথে নেই কিন্তু আছে স্মৃতিতে, আছে হৃদয়ে । হাজারো মেহজাবিন আমাদের সঙ্গে আছে । যাদের কলকাকলিতে আমাদের মন সবসময় খেলা করে।

ইসরাত জাহান – কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন