রহিম ড্রাইভার

-রতন ভট্টাচার্য

লালসালু কাপড়ের ব্যানার টানানো একটা ট্রাক স্কুলের দিকে যাওয়ার রাস্তার পাশে দাঁড়ানো।
হাসি দাঁড়িয়ে আছে ঐ থেমে থাকা ট্রাকের পিছনে লম্বা লাইনের প্রায় শেষের দিকে।
ট্রাক সেলে ন্যায্য মূল্যে চাল,ডাল,আলু, ,পেঁয়াজ,তেল বিক্রি হচ্ছে।
তিন কিলো চাল, এক কিলো আলু, হাফ কিলো ডাল, পারলে এক লিটার তেল তাকে কম দামে এখান থেকেই কিনতে হবে। তারপর বাজার থেকে আরো কাঁচা তরকারী কিনতে হবে।
জ্বরের কথা বলে কোন একটা ওষুধের দোকান থেকে কিছু ওষুধও কিনতে হবে তার বাবার জন্য ।
হাসির হাতে মাত্র দুশো টাকা।

হাসির পিছনে আরো কিছু মানুষ এসে জড়ো হওয়ায় লাইন ক্রমাম্বয়ে বড় হচ্ছে।
একটা ছেলে মাঝে মাঝে এসে লাইন ঠিক করে দিয়ে যাচ্ছে ।
একবার সে এসে হাসিকে বলল, ” তোমার কী লাগবে?”
হাসি বলল, ” চাল, ডাল, তেল………
ছেলেটি আচ্ছা, আচ্ছা বলে চলে গেল।

হাসির বাবা আব্বাস একজন রিক্সা চালক। রিক্সা চালাতে পারলে হাসির বাবার যে আয় হয় তাতে তাদের সংসার চলে যায়। নিত্যকার বাজার সওদা হাসির বাবা আব্বাসই করে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে তার জ্বর। জ্বরের মধ্যেও আব্বাস রিক্সা চালাচ্ছিল ।কিন্তু তিনদিন আগে থেকে সে আর বের হতে পারেনি। বসে থাকলে তাদের সংসার চলে না।
দুই মেয়ে আব্বাসের। হাসিই বড়। মাগুরা শহরের নবগঙ্গার পাড়ে তাদের ভাড়া করা ঝুপড়ী ঘর থেকে একটু দুরে একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে হাসি পড়ে। ছোট মেয়েটা এখনো হাঁটতে শেখেনি।
আব্বাসের করোনা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়নি। পরীক্ষা করাতে গেলে লাইন দিতে হবে, অনেক ভীড়। রিক্সা চালাতে পারবে না। আবার ডাক্তারও ঠিক সময়ে আসে না। হাসপাতালের আউটডোরে তিন ঘন্টা সময় কাটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।

হাসির মা মেহেরজান একটা বাড়িতে ঠিকে কাজ করে।বাসন মাজা, ঘর মোছা এই সব কাজ।
করোনার জন্য স্কুল বন্ধ। ফোনে নাকি হাসিদের ক্লাস হয়। কিন্তু ক্লাস করার মত ভাল ফোন হাসিদের নেই। তাই হাসির লেখাপড়া একেবারেই বন্ধ।
কোলের মেয়েটাকে বাসায় হাসির কাছে রেখে মেহেরজান কাজে যায় । বাসার সব কাজই হাসি করতে পারে। তাই সমস্যা হয় না।
মেহেরজান যে বাড়িতে কাজ করে গতকাল দু’শো টাকা সেই বাড়ি থেকে অগ্রিম নিয়ে এসে হাসিকে বাজারে পাঠিয়েছে মেহেরজান।
আব্বাস ঘরে শুয়ে কাঁতরাচ্ছে।কখন হাসি আর তার মা ফিরে আসবে কাঁথা মুড়ি দিয়ে চোখ বন্ধ করে তাই ভাবছে আব্বাস।

হাসি একটু একটু করে লাইনের সামনের দিকে এগোয় আর ট্রাকের উপর থেকে চাল ডাল বিতরণ করা দেখে।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা ধরে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরে ঐ ছেলেটা আবার এসে লাইনের কাছে এসে বলল, ” তুমি তো চাল,ডাল পাবা না, আমাগের ইস্টক পিরায় শেষ। দাঁয়ায় থাইকে লাভ নাই।”
কথাটা শুনার পর লাইনের মানুষগুলো ছেলেটাকে অনেকগুলো কথা শুনিয়ে দিয়ে একে একে কেটে পড়তে শুরু করল।
হাসি তার বাম হাতে মোড়ানো দু’টো কাগজের নোটের দিকে তাকিয়ে ট্রাকের দিকে এগিয়ে গেল।
ট্রাকের উপরে বসা একটা ছেলে হাসিকে বলল, ” আজ আর হবে না। কাল আসিস।”
হাসি বিনয় করে বলতে থাকে, “আব্বার জ্বর। আমি কন্ট্রোলের চালই নেব, আমাগের টাকা কম। আমারে দেন।”
” কয় টাকা আনিছিস? কী কী নিবি ?”
” চাল তিন কেজি, ডাল হাপ কেজি……….”
” এত কম টাকায় হবে না, যা বাড়ি যা”
হাসি ব্যাগ উঁচু করে চাল,ডাল…….. দিতে অনুরোধ করতে থাকল।

ট্রাকের কাছে আর লোকজন নেই।খাঁ খাঁ রোদ্দুর চারিদিকে। মাঝে মাঝে একটা দু’টো রিক্সা যাতায়াত করছে।
ট্রাকের উপরে থেকে যে ছেলেটা চাল, ডাল মেপে দিচ্ছে তার নাম কালু। কালু বস্তাগুলো গোছাতে গোছাতে নীচে ওদের সাথে থাকা ছেলেটাকে বলল, ” ঐ মিন্টু, উস্তাদরে ক গাড়ি ইসটাট দিতে, কাজ শেষ। ”
মিন্টু একটা চোখ টিপে কালুকে ইশারা করে বলল,” কালু, মাইয়েডারে দশ কেজি চাল ফ্রি দিয়ে দিয়া যায় না? ”
কালু মিন্টুর ইশারা বুঝতে পেরে বলল, ” হ দিয়া যায়, তয়, গুদোমেরতে আনতি হবে। দেখ, ও যদি যায়, বেশী দুর তো না।”
মিন্টু বলে, ” হ, দুর না, যাবি আমাগের সাথে? দশ কেজি চাল দিব, আর যা যা লাগে দিব। তোরে এহেনে আবার ফিরায়ে দিয়ে যাব। তুইও গবীর, আমরাও গরীব, গরীবের কষ্ট দেখলে বড়ই কষ্ট লাগে। ”

হাসিদের সংসারে অভাব, যদি কিছু পাওয়া যায় খুব ভাল হয়। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না সে । হাসি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাবতে চেষ্টা করছে।
মিন্টু উচ্চস্বরে বলল, “ওস্তাদ, ইসটাট দেন। চলেন।”
ট্রাকের পিছনের ডালা খোলাই ছিল।
কালু বলল, ” যাবি, চল, তোরে দিয়ে যাব।”
মিন্টু হাসিকে আর ভাবার সময় না দিয়েই ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ওকে ধরে আস্তে করে তুলে নিজেও ট্রাকে উঠল এবং পিছনের ডালাটা তুলে লক করে নিল।
কালু ট্রাকের ডালায় জোরে দু’টো থাবা মেরে বলল,” যান, যান। ”

রহিম ড্রাইভার চলকের আসনে গিয়ে বসে আছে। ট্রাকের চাকা গড়াতে শুরু করল। গাড়ির গতি ধীর থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।
কালু আর মিন্টু কয়েক মুহূর্ত নিজেরা আলাপ করে নিল।
তারপর চালের খালি বস্তাগুলো একটা জায়গাতে জড়ো করে নিল।
হাসি ট্রাকের একটা ডালি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার খোলা চুল হাওয়ায় উড়ছে। হাসি বার বার তার ওড়ানাটা ঠিক করতে লাগল। কালু ওকে বসে থাকতে বলল।
হাসি দ্রত বসতে বসতে বলল, ” আপনারা আমারে কতদুর নিয়া যাবেন? আমি আর দুরে যাব না। আমারে ফিরায় নিয়ে চলেন। আমি আর যাব না। আমারে নামায় দেন।”
কালু হাসির কাছে এসে ওর হাত ধরল। গায়ের ওড়নাটা এক টানে ছিনিয়ে নিয়ে জোর করে হাসির মুখ বেঁধে ফেলল। প্রচন্ড হাওয়ার মধ্যেও হাসির গোঙানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। মিন্টু এসে হাসির জামাটা ধরে এমন জোরে টান দিয়ে খুলতে চেষ্টা করল যে জামাটা ছিঁড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে হাসির শরীরে আর জামা কাপড় কিছু অবশিষ্ট থাকল না। হাসির মুখটা বাঁধা আছে।
কালু হিংস্র হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ল হাসির শরীরের উপর। মিন্টু উঁকিঝুঁকি দিয়ে এদিকসেদিকে নজর রাখতে লাগত।ট্রাকটা জোরে দৌড়োচ্ছে। হাসির গোঙানোর শব্দ ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দের সাথে মিশে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরে প্রচণ্ড জোরে হর্ণ বাঁজিয়ে ট্রাকটা রাস্তার বাম পাশে একটা ঝোঁপের ধারে থেমে গেল।
রহিম ড্রাইভার নিচে নেমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝোঁপের মধ্যে প্রস্রাব করে আবার ঘুরে দাঁড়াল। পেটে খিদে সবার। শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে রামনগর বাজারে গিয়ে ওদের দুপুরেরের খাবার খাওয়ার কথা।
প্রশ্রাব সেরে তাড়াতাড়ি ট্রাকে উঠতে গিয়ে রহিম বলল, ” কালু, হেই কালু, কই তুরা? একটা গুঙানোর শব্দ কনতেরে আসে?
নাম তো।”
কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই। রহিম চিৎকার করে বলল, ” এই কালু, এই মিন্টু, কই তুরা? নাম নিচে।”
ওদের না দেখতে পেয়ে রহিম ড্রাইভার চিন্তিত হয়। সে এক লাফ দিয়ে ট্রাকের উপর উঠে পড়ে, অবাক হয়ে চোখবাঁধা রক্তাক্ত উলঙ্গ হাসিকে দেখে মিন্টু-কালুকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে ওঠে , ” এই কুত্তার বাচ্চারা, মাইয়েডারে কনে পালি?, এই শুয়োরের বাচ্চারা, ক দেহি, কার মাইয়েডার এমন সর্বনাশ করলি? ক শালারা, ক দেহি। ”
তাড়াতাড়ি নিজের জামা খুলে রহিম হাসির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে তার চোখের বাঁধন খুলে দিল।
হাসি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠল। রহিম ট্রাকের উপরেই কালু ও মিন্টুর বুকে প্রচন্ড জোরে দুটো লাথি মেরে আবার মারতে দৌড়ে গেল। কালু নিচে নেমে পালাতে গেলে তাকে দ্রুত ধরে গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলল রহিম।মিন্টুকেও একটা দড়ি দিয়ে ট্রাকের পাল্লার সাথে বেঁধে লাথি, চড়, ঘুসি মারতে লাগল।
রহিম একবার মিন্টুকে মারে একবার কালুকে মারে।
মারতে মারতে আঠাশ বছরের যুবক ছেলে রহিম ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
একবার শুধু হাসির দিকে মুখ ফিরে রহিম বলে, ” তুমার নাম কী বুনডি ? তুমার কোন ভয় নাই, সব আমি দেখতিছি।”
মারের চোটে মিন্টু-কালুর নাক-মুখ ফেটে রক্ত ঝরছে। রহিম কালুর যৌনাঙ্গ বরাবর একটা জোরে লাথি হাঁকাল।
জোরে কঁকিয়ে উঠে কালু ট্রাকের পাল্লার সাথে ঝুলে থাকল।
একইভাবে মিন্টুকেও একটা লাথি মারল। মিন্টু উচ্চস্বরে ওস্তাদ, ওস্তাদ করে চিৎকার করতে লাগল। মিন্টু-কালুর চিৎকার শুনে রাস্তার মানুষ ট্রাকের পাশে জড়ো হতে শুরু করল।
এমন সময় হাইওয়ে পুলিশ এসে ওখানে হাজির । তারা হুইসেল বাজিয়ে মানুষজনকে সরিয়ে দিল।
পুলিশ সব শুনে কালু-মিন্টুকে ধরে নিয়ে যেতে চাইল।
রহিম বলল, ” না, আমি নিজেই ওগের থানায় নিয়ে যাব। নিজেই মাইয়েডারে চিকিৎসা করাব। ওগের বাড়ি যাব আমি।
আপনারা আমার সাথে চলেন।”
রহিমের পেটে প্রচন্ড খিদে। রাগে চোখদুটো জবা ফুলের মত টকটকে লালবর্ণ।
মিন্টু-কালুকে ভাল করে পূনরায় হাতপা বেঁধে ট্রাকের উপরের রাখা হল।
হাসির গায়ে রহিমের জামা। রহিম তার পাশের সিটে বসিয়ে হাসিকে নিয়ে থানার দিকে ছুটল।
হাসির হাতে মুঠ করে ধরে রাখা টাকা ও চালের ব্যাগটা নেই।
রহিম ট্রাকটা চালাতে শুরু করল। পিছনে পুলিশের গাড়ি চলছে।
রহিম হঠাৎ দেখতে পেল যেন তার বোন জরিনা পাপিষ্ঠদের ছোঁয়ায় রক্তাক্ত দেহে তার পাশে লজ্জায় কুণ্ডলী পাঁকিয়ে বসে আছে।
২৪/১১/২০২০
রতন ভট্টাচার্য

আরও পড়ুন