সফুরা বেওয়া

বয়স পয়ষট্টি থেকে সত্তর এর মত হতে পারে,কিন্তু একদম কুঁজো হয়ে গিয়েছে,যেখানে যায়, বাচ্চারা বলে কুঁজোবুড়ি এসেছে ভিক্ষে নিতে,সবাই ভিক্ষে দিয়ে দাও, কুঁজো হওয়াতে একটু বাড়তি সুবিধাও পাচ্ছে, কোন একবাড়ীর দাওয়ায় বসলেই সবাই এসে ভিক্ষে দিয়ে যায়, আবার অনেকেই বলে, আহা তুমি রান্না করে খেতে পারবে? তার চেয়ে বরং দুটো খেয়েই যাও। এভাবে তার দিনের খাওয়াটাও হয়ে যায়।
থাকে সে এক বাড়ীর দাওয়ায. ওরা একটু যায়গা দিয়েছে, থাকার জন্য ওখানেই একটা মাটির চুলা রেখেছে.চুলাটা মাটির সাথে লাগানো নয়,তাইএটাকে বলা হয় আলগা চুলা। বিকেল বেলাতেই সে ঘরে ফিরে দুটো ভাত ও আলুসেদ্ধ দিয়ে দেয়।একটু মরিচ পেয়াজ দিয়ে ভাত খায় আর বাকিটুকু পানি দিয়ে রেখে দেয়। কখনো কখনো ও বাড়ীর গৃহকর্ত্রী একটু মাছ মাংশ দিয়ে যায়.বুড়ি তখন ফোকলা দাঁতে হাঁসে আর বলে আল্লায় তোমাদের অনেক বড় করবে? ভোরে উঠে প্রাতকৃত্য সেরে বাসী ভাতটুকু খেয়ে আবার অন্য গ্রামে চলে যায়, আবার রোজ ভিক্ষে করতেও পারেনা, কুঁজো হয়ে লাঠি ভর করে কত আর হাঁটা যায়?
সেদিন বসে বসে ভাবে, একদিন আমার সব ছিল, গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, হাঁস, মুরগী ও কবুতর সব ছিল,আঙ্গিনায় করত সবজী, কি দিন ছিল ! যত বিপত্তি শুরু হল স্বামীটা মরে যাওয়াতে। ছেলেরা বলল,বুড়ি তোকে তো আমাদের বাপ কিছু দিয়ে যায়নি? আমরা তোকে কেন খাওয়াবো? এক কাপড়ে বের করে দিল কিছু নিতে দিলনা,,দাওয়ায বসে কত কান্নাকাটি করল,বাবারে আমি কই যাব? আমাকে যে কোন ঘরে একটু যায়গা দে, আমি ভিক্ষে করে খাব। আমাকে বের করে দিসনা বাবা। সারারাত বুড়ি বসে বসে কাঁদল, কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে ছেলেরা উঠে দেখল,বুড়ি ঘুমিয়ে আছে, এক ছেলে ধাক্কা দিয়ে তুলে বলল, তুই এখনো যাসনি, এক্ষুনি চলে যা।
অগ্যতা বুড়ি কুঁজো হয়ে একটা লাঠি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্বামীর গ্রাম পার হয়ে অন্য গ্রামে চলে গেল। ভাল ! এই ভাল হল,গ্রামে থাকলে তার ছেলেদেরকে মাকে বের করে দেওয়ার জন্য লোকে ছিঃ ছিঃ করতঃ ওটা কি তার ভাল লাগত।তার চেয়ে কোন দূর গ্রামে চলে যাওয়াই ভাল।
সকালে খেয়ে ভিক্ষে করতে বেরুল, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎতার মনে হল, আচ্ছা আমার নাম তো ছিল সফুরা বেগম, তো লোকে এখন বলে সফুরা বেওয়া, বেওয়া মানে বেওয়ারিস ! বেওয়ারিস মানে যার কোন ওয়ারিস নেই, বেওয়ারিস লাশ হয়,কুকুর হয়, বিড়াল হয়, জীবিত মেয়েমানুষও তাহলে বেওয়ারিস হয়। অত বুঝিনা,কিন্তু এটুকুতো বুঝি আমার স্বামী মরে গেল তাই সবাই ডাকে বেওয়া মানে বিধবা। কিন্তু ঐ যে রহিমুদ্দিন বেপারীর বওটা মরে গেল,তার তো নাম বদলায়নি?
অ বুঝছি,আপন মনেই ভাবছে বাপ,স্বামী এসব না থাকলে মেয়েমানুষের দাম নাই। সবকিছুরই মালিক তারা,তাইতো স্বামীটা মারা গেলে চল্লিশ দিন না পেরুতেই ছেলেরা বলল,বুড়ি ,আমদের বাপ তো তোকে কিছু দিয়ে যায়নি? আমরা তোকে কেন খাওয়াব, আর আমি যে পেটে ধরলাম, লালন পালন করলাম,এর কোন মূল্যই নেই। আমাদের বিয়ের আগে নাম থাকে,বিয়ের পর অমুকের বও সন্তান হলে অমুকের মা,আর স্বামী মারা গেলে হয়ে গেলাম বেওয়া।
নিজের মনেই সে কথাগুলো আওড়ায়, মনে মনে আওড়াতে আওড়াতেই সে এক গৃহস্থের বাড়ীর দরজায় পাশে দাড়িয়ে ভিক্ষে চায়, কে একজন বলল, এই তোরা কে আছিস, সফুরা বেওয়া এসেছে ওকে ভিক্ষে দিয়ে দে। সফুরা বেওয়া মেয়েটিকে ডেকে বলল, শোন আমার নাম সফুরা বেওয়া না বেগম বুঝেছ? মেয়েটি বলল কেন তোমার তো স্বামী নেই,স্বামী না থাকলে তো বেওয়া ই বলে, বিধবা মানে তো বেওয়াই।
সফুরা প্রতিবাদ করে বলল, আজ থেকে তোমরা কেও আমাকে বেওয়া বলতে পারবেনা ,বলবে সফুরা বেগম,না হয় শুধু বলবে সফুরা এসেছে ভিক্ষে করতে।
মেয়েটি তার দিকে”একটা ভিখেরিনির মুখে এসব কথা শুনে” অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আর বলল, তোমার তো স্বামী নেই তাই তো তুমি বেওয়া! সফুরা বলল,স্বামী তো বিয়ের আগেও ছিলনা, তখন তো সফুরা বেগমই বলত সবাই,এখন কেন বলা যাবেনা।
আস্তে আস্তে নানা বয়সের মহিলাদের ভীড় জমে গেল। সবাই অবাক হয়ে এই সত্তর বছরের একটি কুঁজো ভিখিরিনির প্র্রতিবাদের কথা শুনছে। সে বলছে আচ্ছা তোমরা বল,ওই যে পূব পাড়ার রহিমুদ্দিন বেপারীর বওটা যে মরে গেল,কই তার নাম তো বদলায়নি, তবে আমার নাম কেন বদলাবে?
আজ থেকে তোমরা কেও আমকে সফুরা বেওয়া বলবেনা,বলবে সফুরা বেগম। উপস্থিত সকল মহিলারাই তাতে নীরব সম্মতি জানাল,বলল কথা তো ঠিকই বলছে, পুরুষ মানুষের নাম যদি না পাল্টায়. তাহলে আমদেরটা কেন পাল্টাবে ?

লেখকঃ আওলিয়া খানম টুলটুল, কবি ও সাহিত্যিক।

 

আরও পড়ুন