সিলিন্ডার…

শোয়াইব আহমদ

রাত দুইটা বাজে আম্মা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে ধাক্কা দিয়ে আমাদের দুই ভাই কে ডেকে তুললেন, ” তাড়াতাড়ি কেরোসিন তেলের ডিপোতে যা, চারটার দিকে গ্যাস এর গাড়ী আসবে। একটু আগে মিলনের মা আমাকে জানালো। দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি ওঠ্”।
গ্যাস মানে এলপি গ্যাসের কথা বলছি। রাজশাহীতে গ্যাস এখন দুষ্প্রাপ্য।প্রায় চার মাস হতে চললো শহরে কোন সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে আবার আসে পাশের শহর থেকে ব্ল্যাকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করছে। এই নিয়ে অনেক ঝামেলাও হচ্ছে। সেদিন শুনলাম পাশের পাড়ার ফয়সালের আব্বা নাকি নাটোর থেকে গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে আসার সময় পুলিশের জেরার মুখে পড়ে। অনেক ধরাধরি আর ঝামেলার পর উনি গ্যাস নিয়ে ফিরতে পেরেছেন। উনি গ্যাস নিয়ে বাড়ীর আসার পর ফয়সালের মা যা ভাব দেখাতে শুরু করলো,তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। “ও রে ফায়সাল, তোর আব্বা কে ড্যেকে লিয়ে আয়, নাস্তা বানিয়েছি” এই কথা গুলি উনি এতো জোরে বললেন, যে গোটা পাড়া শুনতে পেল। এই নিয়ে পাড়ায় সেকি প্রতিক্রিয়া। মরিয়ম চাচি তো আর থাকতে না পেরে বলেই বসলেন, ” হ্যারে চা কি বে? এডা কি ক্যরে খায়?”। শাহীনের নানি তো আরও এক কাঠি উপরে, “ঐ ফায়সালের মা, এতো ভাব দেখাইছ কেনে। ভুলে য্যাওনা একদিন আমাদেরও দিন আসপে”।
এই রকম পরিস্থিতি সারা শহরজুড়েই। যারা গ্যাস পাচ্ছে, তারা ভাগ্যবান, অভিজাত। তাদের অনেক ক্ষমতা, তাদের কে দেখলেই চোখ টা কেমন টাটায়।যাই হোক আমরা দুই ভাই সিলিন্ডার নিয়ে গিয়ে দেখি ইতিমধ্যে দুইশ জন সিলিন্ডার নিয়ে সিরিয়াল দিয়ে বসে আছে। আমরা গিয়ে সংখ্যা টা দাড়াঁলো দুইশ এক। আরও লোকজন আসছে, এক ঘন্টার মধ্যে এই সংখ্যা সাড়ে তিনশ তে পৌঁছালো। আমি আর ভাই বসে আছি, ঘুমে দুই চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। এমন সময় হঠাৎ লাইনে চাঞ্চল্য শুরু হলো। একজন এসে বললে, “গ্যাসের গাড়ী মুনে হয় এ্যসেছে”। কিছুক্ষন পর শুনলাম, না এখনো আসেনি। ঘড়ির কাটা রাত চারটা। আমরা দুই ভাই ঝিমচ্ছি হঠাৎ শুনতে পেলাম, ” লাইনে লোক দাঁড়িয়েছে চারশ, এদিকে সিলিন্ডার আসবে মাত্র দেড়শ। আমরা মনে হয় গ্যাস পাবো না।” এই কথা শুনে বেশ কয়েকজন চলে গেলেন। আমার ভাই হঠাৎ আমাকে বললেন, ” শোন দুই জনের একসাথে এই ভাবে বসে থাকার কোন মানে হয় না। আমি বরং বাসায় যায়, তুই বসে থাক। আমি সকালের দিকেই চলে আসবো”। এই কথা বলে আমার ভাই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, দিব্যি চলে গেলো। আমি খালি সিলিন্ডার নিয়ে লাইনে বসে থাকলাম।
আমার পিছনের দুই জন ফিসফিস করে বলছে, ” কেমন চাল চাললাম, পঞ্চাশ জন কিন্তু কম্যেছে”।
বসেই আছি, বসেই আছি গ্যাসের গাড়ীর কোন খবর নাই। ফজরের আজান দিলো, অনেকে নামাজ পড়তে গেলেন।আমি বসেই রইলাম। এদিক ওদিক দেখছি, কে কি করে। একটু সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা মেয়ে আর একটা ছেলে বেশ গল্প করছে। চেনার চেষ্টা করলাম, কিন্তু চিনতে পারলাম না। তবে দুইজনই দেখতে বেশ।
সকাল সাতটা বাজে এখনো গাড়ী আসেনি। ইতিমধ্যে অনেক সিলিন্ডারের প্রতিনিধি পরিবর্তন হয়েছে, মানে পরিবারের বদলি সদস্য এসে লাইনে বসেছে। একভদ্র মহিলা একটা বিশাল ঝুড়ি আর বাসার গৃহকর্মী নিয়ে এসে হাজির। চোখে চোখ পড়তেই বললো, ” তোমার আঙ্কেল কে আবার অপিসে য্যাতে হবে তো, তাই আমিই চলে এলাম। আমার ছেলে-মেয়েদের আবার পেস্টিজে লাগে লাইন দাড়াতে। ” আমি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আন্টি, ঝুড়ি তে কি?” ভদ্রমহিলা বললেন, ” রানতে হবে না? তাই সবজি লিয়ে এসেছি। এখানে বসেই ক্যাটেকুটে লিবো।” আমি উনার গৃহকর্মীর দিকে তাকাতেই উনি বলে উঠলেন, ” ফাঁকিবাজ, একটা বুললে আরেকটা শুনে, তাই সাথে করে লিয়ে এ্যাসেছি। আমার সামনে বসে ক্যাটপে।” এমন সময় পিছনে দুই চাচার মধ্যে শুরু তুমুল ঝগড়া। ঝগড়ার বিষয়বস্তু জানলাম রাজনৈতিক দল নিয়ে। এই ঝগড়া দুইজন থেকে দশজনে ছড়ালো। ঝগড়া টা লেগে ভালোই হয়েছে, আরও অনেকজন ঐ জায়গা থেকে চলে গেলো।
আমার ভাই এসে বললো, ” খবর নিলাম, তিনটার আগে গাড়ী আসবে না। তুই বাড়ী যা। দুপুরে খেয়ে চলে আসিস, তারপর আমি বাড়ী যাবো।” আসার সময় দেখলাম ওই ছেলে-মেয়ে দুইজন নেই।
তিনটার আগেই আমি চলে গেলাম। গিয়ে দেখি অনেকেই নেই। শুনলাম সিলিন্ডার আসবে একশ বিশ টা। তাই অনেকেই চলে গেছে। এদিকে আমার ভাই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এখন একশ দশ নাম্বারে অবস্থান করছে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “কি রে তুই প্রমোশন পেলি কি ভাবে? “। ও বললো, ” মাঝে মধ্যে ধোঁয়া তুলতে হয়, নাহলে এই লাইন ছোট হয়! ডিপোর পিয়ন টাকে বিশ টাকা দিয়ে বলেছি, “আজকে আর গাড়ী আসবে না” এই কথাটা রটিয়ে যেনো দেয়।”
আধা ঘণ্টা পরে দেখি কয়েকজন এসে খুব হইচই করছে। কারন জানতে গিয়ে জানলাম, গ্যাসের জন্য সিরিয়াল দিতে আসা ঐ ছেলে মেয়ে দুইজন পালিয়েছে। কি একটা অবস্থা। হইচই, গালিগালাজ এই পরিবারের লোক ঐ পরিবারের দিকে তেড়ে যায়, ঐ পরিবারের লোক এই পরিবারের দিকে তেড়ে আসে। এমন সময় পাশ থেকে একজন বলে উঠে, ” কেমন মেয়ে রে বাবা, গ্যাসের জন্যও কোন মায়া দয়া নেই। ছি, ছি, ছি, ছি।” এই ক্যাচালের মধ্যে পড়ে আরও কয়েকজন লাইন ছেড়ে চলে গেলো।
সময় সন্ধ্যা ছয়টা, হঠাৎ গাড়ী আসার শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দের উৎস খুঁজে তাকিয়ে দেখি, লাল রঙের লরি আসছে, যার পেটের উপর লেখা আছে “বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম”। আহা কি শান্তি, কত অপেক্ষা শেষে তাহার দেখা পেলাম। আহা তাহারে পাইলাম, তাকে পাইলাম। তাকে শেষ পর্যন্ত জিতে নিলাম। আমি আর আমার ভাই অত্যন্ত গর্বিত ভাবে গ্যাসের সিলিন্ডার টা নিয়ে রিকশায় উঠলাম। সকলে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আমরা গর্বিত ভাবে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। সে এক বিরল অনুভূতি।

(এই গল্পের সময়টা ১৯৯২ সাল…..)
লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও বাচিক শিল্পী

আরও পড়ুন