সেই বৃষ্টির দিন

শাকিলা আক্তার পাঁপড়ি

কেমিষ্ট্রি প্রাইভেট শেষ করে সিএনজিতে উঠতে না উঠতেই হুট করে গোটা আকাশ কাল হয়ে হালকা ঝড়ো বাতাস শুরু হয়ে গেল। ভাগ্যিস আকাশের অবস্থা খারাপ দেখে স্যার জলদি ছুটি দিলেন। রোদ একেবারেই সহ্য হয় না সিঁথির। তাই ব্যাগে সবসময় ছাতা থাকে। এর আরেকটা সুবিধাও আছে, হঠাৎ যদি বৃষ্টি নেমে পরে তবে ছাতা আছে কি নেই এ নিয়েও দুশ্চিন্তা নেই। 

 

সিএনজি থেকে নেমে ২০ মিনিটের পথ সিঁথি আর অর্পা হেঁটেই বাসায় ফিরে। নামবার আগেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। এত মুষলধারে বৃষ্টি পরছে যে ছাতা থাকলেও নিশ্চিত ভিজে যাবে ভেবে খুবই বিরক্ত লাগছে সিঁথির। মেজাজ এক্কেবারে খিটমিটে হয়ে গেছে। 

 

ক্লাসের বান্ধবী অর্পা আর সিঁথি একই সাথে প্রাইভেটে যায়। মফস্বলের সেরা গার্লস স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ে ওরা। দুজনই ভালো ছাত্রী তবে সিঁথির প্লেস বরাবর বেশি ভালো সেই ছোট্টবেলা থেকেই। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা তার উপর গত সপ্তাহে স্যার একদিন পড়াতে পারেনি বলে আজ শুক্রবার সকালে ওদের ব্যাচটাকে যেতে বলেছে। 

 

মেঘলা আকাশ আর শুক্রবারের সকাল একটু আয়েসি বলে অর্পা যাবে না বলায় সিঁথিও দমে যেতে চেয়েছিল। আবার ভাবলো, সামনে টেস্ট পরীক্ষা। এছাড়া কেমিষ্ট্রি সিঁথির অপ্রিয় সাবজেক্ট তাই স্যারের প্রাইভেট মিস্ হয়ে গেলে টপিক বুঝতে কষ্ট হবে। এসব ভেবে একাই চলে গেল। 

 

কিন্তু ফিরতি পথের এ বিপত্তি নাজেহাল করে ছাড়লো মেয়েটাকে। শুক্রবার সকাল তাই দোকানপাট প্রায় সব বন্ধ। টুকটাক প্রয়োজনে যারা বেরিয়েছে তারাও বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা করে ফিরে গেছে বা কোন দোকান, মসজিদ এসবের সামনে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ছাতা মাথায় কয়েক পা এগোতেই মেয়েটা ভিজে একাকার। ভাবলো ভিজে যেহেতু গিয়েছি জলদি হেঁটে বাসায় পৌঁছে যাই। 

 

এ রাস্তাটা সবসময় ওরা হেঁটে গল্প করতে করতে চলে যায়। বৃষ্টিতে রিক্সা করে চলে যাওয়া যেত কিন্তু এই মুষলধারা বৃষ্টিতে কোন রিক্সার দেখা মিললো না। গলির মোড়ের যে কটা রিক্সা ছিল ওসব নিয়ে হয়ত ঝড় শুরু হবার শুরুতেই মানুষজন বাসার দিকে রওনা দিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর এলো বটে কিন্তু কামিজ, ওড়না, পায়জামা ভিজে বারবার পায়ের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। ওসব সামলে হাঁটতে বেগ পেতে হচ্ছে। 

 

পথিমধ্যে রাস্তার পাশে একসাথে চারটা দোকান আছে, স্বভাবতই এখন বন্ধ। এখানকার পথটা স্বাভাবিক সময়েই বেশ নিরিবিলি। আর এখন তো আরও নির্জন হবার কথা। কিন্তু বন্ধ দোকানগুলোর সামনে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তিনটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখে সিঁথির খুব অস্বস্তি হলো। ওর মনে হল, এই কাকভেজা শরীরেও যেন ভয়ে ঘাম দেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু মাঝ রাস্তায় তো দাঁড়িয়েও থাকা যাবে না। ছেলেগুলো যদি বুঝতে পেরে যায় সিঁথি ভয় পেয়েছে আর তখন ওর সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করে! এসব ভেবে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে চোখ মুখ শক্ত করে একমনে খুব দ্রুত হাঁটা শুরু করলো। 

 

যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। ছেলেগুলোর বরাবর আসতেই ওরা বেচারীকে নানান অশ্লীল মন্তব্য জোড়ে জোড়ে শোনাতে লাগলো। সিঁথি এবার স্পষ্ট বুঝতে পারছে ওর কানগুলো লাল হয়ে গরম ভাপ বেরুচ্ছে, পায়ে পায়ে কামিজ আরো জড়িয়ে যাচ্ছে, চোখের পাতা ঠিকরে জল গড়িয়ে পরছে সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বখাটেদের অশ্লীল কথা। 

 

কান্নাভরা চোখে সামনে তাকাতেই ঝাপসা দৃষ্টিতে সিঁথি দেখলো খানিকটা দূরে ছাতা মাথায় কেউ একজন সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। এটা দেখামাত্রই সে একটু সাহস পেয়ে অল্প দৌড় দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাইলো। ব্যস, বখাটে ছেলেগুলো আরো জোরে চিৎকার শুরু করলো। 

 

এবারে সিঁথির সামনে হাঁটা তপু কিছুটা শোরগোল শুনতে পেল। বৃষ্টির ঝুম শব্দে অস্পষ্ট কিছু হৈ-চৈ শুনতে পেয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই সিঁথিকে দেখতে পেল। পেছন দিকে তাকাতেই তপু কিছুটা অবাক হল।ভীষণই মায়াবী মুখের একটা মেয়ে ভিজে একাকার হয়ে দ্রুত লয়ে ওর দিকে হেঁটে আসছে। কিন্তু মেয়েটি মনে হয় কাঁদছে! এবারে আরেকটু বেঁকে পেছনে তাকাতেই ছেলেগুলোকে চোখে পড়লো। সে প্রথমে ভাবলো মেয়েটি বুঝি ছেলেগুলোর সাথে ছিল, ওদের বন্ধু, ওকে হয়ত ডাকছে। সিঁথি আরেকটু কাছে আসতেই বলল-

 

—ওরা বোধ হয় আপনাকে ডাকছে।

 

~আমাকে না, আমি ওদের চিনি না।

 

চট করে পুরোটা ব্যাপার বুঝে গেল তপু।

 

এবারে বখাটেগুলো একটু এগিয়ে এসে দেখলো সিঁথির সাথে কেউ কথা বলছে। খেয়াল করলো তপু ওদের দিকে খানিকটা রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভেবে নিল তপু বুঝি মেয়েটার পরিবারের কেউ হতে পারে। বৃষ্টির কারণে হয়ত এগিয়ে নিতে এসেছে। ততক্ষণে বৃষ্টির তোড় জোরও খানিক কমে এসেছে। যদি সিঁথি বা ওর সাথে থাকা ছেলেটির ডাকাডাকিতে বাড়তি কোন মানুষ এসে কোন ঝামেলা করে বসে সেই আশঙ্কা থেকে বখাটেরা আশপাশে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হবার ভান করলো।

 

তপু মুহূর্তেই ভেবে নিল এই মায়াবী অসহায় মেয়েটার নিরাপত্তা দরকার। সে একটু থেমে সিঁথিকে এগিয়ে যেতে দিল। সিঁথি একটু এগিয়ে যাবার পর তপু পেছন ফিরে দেখলো বখাটেগুলো আছে কিনা। ততক্ষণে ওরা চম্পট। এবারে তপু মিনিট খানেক সিঁথির পিছু পিছু হেঁটে তারপর পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো।

 

যে রাস্তাটুকু মাত্র দশ মিনিটে ফুরোবার কথা, ইভটিজিং এর অত্যাচারে সেটা যেন কত দীর্ঘ সময় নিয়ে নিল। এতক্ষনের ভয়ঙ্কর উত্তেজনার আপাত অবসানের পর সিঁথির শরীরটা যেন অসাড় হয়ে আসছে। তপু পাশে আছে এটা যেন ও টেরই পাচ্ছে না। কেবল টের পাচ্ছে একটা ছায়া ওকে নিরাপত্তার আশ্রয়ে নিয়ে চলেছে।

 

তপুই ভাঙলো নীরবতা।

 

—ছেলেগুলো ডিস্টার্ব করছিল?

 

সিঁথি কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। 

 

তপু খেয়াল করলো মেয়েটার মায়াভরা মুখটা মলিন হয়ে আছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে। কিশোরী সুলভ সরলতার ছাপ উপচে  বেশ আকর্ষনীয় এক ব্যাক্তিত্বের ছাপ জড়ানো এইটুকু কিশোরীর মুখাবয়বে। মনে মনে তপু ভাবলো মেয়েটা খুব আড়ষ্ট ভাব অনুভব করছে, তার দিকে এভাবে তাকানো ঠিক না। কিন্তু কি যেন আছে ওর মাঝে, সংযত তপু না চাইতেও পীঠ গড়িয়ে কোমড় ছাড়িয়ে চলে যাওয়া সিঁথির চুলের বেনীর দিকে চোখ পরে গেল। 

 

বেশভূষা, চেহারা, চুলের স্টাইল বা হাল ফ্যাশনের কোন আতিশয্য নেই, উপরন্তু মায়া আর ব্যাক্তিত্বের মিশেলে এক অপরূপ কিশোরী তপুকে ভরসা করে ওর পাশে হেঁটে চলেছে ভাবতেই ওর মনটা এক নিখাদ ভালো লাগায় ভরে গেল।

 

তপু ভেবে নিল ওকে বাসার গেট অব্দি পৌঁছে দেবে। সিঁথিকে বলল-

—এত ভয় পেলে এমন ওয়েদারে একা বের হয়েছেন কেন?

 

~প্রাইভেটে গিয়েছিলাম।

 

তপু বলল, একটু দাঁড়ান। পেছনে তাকান। ওরা আছে?

 

সিঁথি বাধ্য মেয়ের মত কথা শুনে পেছনে তাকাতেই দেখলো দোকানগুলোর সামনের জায়গাটা পুরো ফাঁকা। ব্যাটারা ঝামেলা হতে পারে ভেবে কেটে পরেছে।

এবারে একটু স্বস্তি পেল।

 

তপু বলল-

—ভয় পেলে সুযোগ সন্ধানী মানুষ আরো ভড়কে দেবে। একা চলতে হলে একটু সাহসী হতে হবে। দরকার পরলে আশপাশের কাউকে চিৎকার করে সাহায্যের জন্য বলবেন। প্রতিরক্ষার কোন প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন ব্লেড, ছুরি, কাঁচি এসব রেখে দেবেন। এখন আর ভয় পাবার আর কিছু নেই। আমি আছি। স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করেন।

 

এবার প্রথম সিঁথি মুখ তুলে তপুকে দেখলো। 

 

এতক্ষন ধরে অভয় দিয়ে আসা ছেলেটা দেখতে কেমন ঘটনার আকস্মিকতায় সিঁথি সেটা খেয়ালই করেনি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর হাতে ঘড়ি পরা বেশ সুদর্শন ছেলেটাকে দেখে বুঝতে পারলো শুধু কথা শুনে না, এই ছেলেকে দেখেও নির্ভর করা যায়। ভয়টা এবারে বেশ হালকা হয়ে গেল।

 

তপুই আবারো বলল-

 

— কিসে পড়েন?

 

~ এস এস সি দিব সামনে।

 

— সাইন্স?

 

~ জ্বী।

 

— কোন স্কুল?

 

~ গার্লস স্কুল।

 

— ও তাই? ওখানে আমার একমাত্র  ছোট বোনও পড়ে। ক্লাস এইটে।

 

সিঁথির এবারে আরো একটু স্বস্তি লাগলো। জানতে চাইলো-

 

~ কোন সিফটে?

 

— মর্নিং। আপনি মর্নিং এ তো?

 

~ জ্বী। নাম কি ওর?

 

— তন্বী।

 

সিঁথি একটু ভেবে নিল কিন্তু তন্বী নামের কাউকে ঠিক মনে পড়ছে না এ মুহূর্তে। বলল-

 

~ দেখলে হয়ত চিনবো, ঠিক মনে পড়ছে না।

 

— চিনতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই তো। তবে আপনার নামটা জানা থাকলে বাসায় গিয়ে তন্বীকে বলতে পারতাম আপনাকে চেনে কিনা।

 

~ সাবরিনা জামান সিঁথি।

 

— নামটা চেনা চেনা লাগছে!

বলেই একটু ভাবতে লাগলো তপু।

তারপরই বলল-

 

— আপনি ডিবেট করেন?

 

~ এইতো টুকটাক।

 

— তন্বী বাসায় কিছুটা গল্প করেছিল আপনাদের স্কুলের ডিবেট কম্পিটিশন নিয়ে। ওখান থেকেই  আপনার নামটা শুনেছিলাম। 

কি আশ্চর্য, এভাবে রাস্তায় হুট করে পরিচয় হয়ে গেল। হা হা হা…

 

তপুর একের পর এক কথায় সিঁথি একটু মুগ্ধ হচ্ছিল। স্বাভাবিক সময়ে হলে হয়ত বেশ লাগতো কিন্তু একটু আগে ঘটে যাওয়া বাজে ঘটনার প্রভাবে মনটা বিক্ষিপ্ত থাকায় তপুর কথাগুলোর প্রভাব মনে খুব একটা পড়ছে না। বিশেষ করে শুধুমাত্র নাম শুনে সিঁথি ডিবেট করে এটা কেউ বলে দিতে পেরেছে ব্যাপারটা এই ছোট্ট কিশোরীর জন্য বেশ ভালো লাগার বিষয় বটে।

 

তপু জানতে চাইলো-

 

— আপনাদের বাসা কোথায়?

 

তপুর প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পেয়ে সিঁথি তখনি খেয়াল করলো, ওরা বাসার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।

 

~ একদম কাছে চলে এসেছি। বা’দিকের সরু গলিটা দিয়ে একটু সামনেই বাসা।

 

তপু বাসার গেট অব্দি পৌঁছে দিতে চাইলো। সিঁথি জানালো-

 

~ বাকীটা যেতে পারবো। সমস্যা হবে না। কাল স্কুলে গিয়ে তন্বীর সাথে পরিচিত হয়ে নেব।

 

এটা বলে সিঁথি গলির পথে পা বাড়াতেই তপু কি মনে করে যেন বলে বসলো-

 

— তন্বীকে দেখলে হয়ত স্কুলে দেখা পরিচিত মুখ হিসেবে চিনতে পারবেন। আমার বোন দেখতে আপনার মতই সুন্দর….

 

কথাটা শুনে সিঁথি পেছন ফিরে তাকাতেই তপুর চোখে চোখ পড়ে গেল। পরক্ষণেই অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে গলিপথে হেঁটে যেতে লাগলো।

 

কিন্তু সিঁথি অনুভব করতে পারলো পেছন থেকে কেউ তার নির্ভরতার দৃষ্টি দিয়ে ওর বাসায় যাবার পথটাকে নিরাপত্তায় আগলে রাখছ…..

 

কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দিয়ে সিঁথির কাকভেজা অবস্থা দেখে ওর মায়ের চোখ ছানাবড়া।

 

নাজমা রহমান। সিঁথির মা। স্বামী শরীফুজ্জামান আর দুই মেয়ে নিয়ে সংসার তার। বড় মেয়ে দিনা বেশি শান্ত স্বভাবের। ছবি আঁকায় খুব আগ্রহ তার। ডিগ্রী শেষ বর্ষে পড়ছে। ছোটবেলায় অনেকে বলতো দিনা একটু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। চারপাশে ঘটে যাওয়া প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া দেখাবার মত ব্যাপারেও সে নির্বিকার থাকে। 

 

সমস্যাটাকে ছোটবেলায় তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি পরিবারের লোকজন। ১২/১৩ বছর বয়সে প্রথম দিনাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান নাজমা ও শরীফুজ্জামান। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করিয়েও কাক্ষিত কোন পরিবর্তন হয়নি। ডাক্তাররা বরাবর বলেছেন ট্রিটমেন্ট আরো ছোট থেকে শুরু হলে হয়ত রেসপন্স ভালো হতো। তবে নিভৃতচারী হয়ে দিনার জীবন একরকম কেটে যাচ্ছে। যাই হোক নিজেদের খামখেয়ালি আর ভাগ্যকে দায়ী করে দুর্ভাগ্যকে এক প্রকার মেনে নিয়েছিলেন তারা।

 

সর্বনাশ চরমে পৌঁছায়, যখন দিনার চেয়ে বয়সে তিন বছরের ছোট তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান দুর্জয় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। গ্রামের বাড়িতে পাকা বিল্ডিং বানাতে চেয়েছিলেন শরীফুজ্জামান। ঘরের কাজের শেষের দিকে বিদ্যুতের লাইন টানবার সময় মিস্ত্রিদের অসাবধানতা আর দুর্জয়ের অযথা হুড়োহুড়িতে পুত্রহারা হয়ে যান দুর্ভাগা নাজমা আর শরীফুজ্জামান। সিঁথি তখন হাঁটা শিখেছে মাত্র।

 

তাই শেষতক একপ্রকার বলা চলে সিঁথিকে আর দিনার অসহায়ত্বকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন তারা। জীবনের এই নানান ঘাত প্রতিঘাতে শরীফুজ্জামান বাস্তবিক প্রয়োজনে বুকে কষ্ট চেপে নিজেকে সামলে নিলেও নাজমা বেশ কিছুটা অস্থির হয়ে গিয়েছে। সিঁথিই যেন তার কাছে অন্ধের যষ্ঠী। সিঁথির সব ব্যাপারে অকারণেই বেশি দুশ্চিন্তা করতে থাকেন।

 

তাই পথে ঘটে যাওয়া এসব এখন মাকে কিছুতেই জানানো যাবে না। তার উপর আবার ওর বাবা শহরে নেই। তিনি সরকারি চাকুরে। একটা প্রমোশন হবার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কাজে কিছু কাগজপত্র জমা দিতে দুদিনের জন্য ঢাকায় হেড অফিসে গিয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে প্রমোশন হয়ে গেলে ঢাকায় চলে যাবে ওরা সবাই।

 

মা চেঁচামেচি করতে লাগলেন-

 

– ভিজে নেয়ে মেয়ে একাকার। এখন যদি জ্বর-ঠান্ডা-কাশি বাঁধে কি অবস্থাটা হবে তখন। তোর বাবাও নেই। একটু সামলে চলবি তো।

 

সিঁথির ভারী মন খারাপ করে। মা শুধু শুধুই ওকে বকছে। ওর তো কোন দোষ, ভুল কিছুই নেই। পরিস্থিতি এর জন্যে দায়ী। 

 

এরপর আবার ভাবে, থাক মা তো আমাকে বেশি ভালোবেসে অমন করে। ওর বাবা একদিন সিঁথিকে বলেছিল-

 

– তোর মায়ের ভেতরের এই অন্তর্দহন কেবলমাত্র তুই আশ্রয়, প্রশ্রয়, ভরসা হয়ে সারিয়ে তুলতে পারবি। তোর সহনশীলতা আর ধৈর্য ই পারবে তাকে খানিকটা মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে দিতে।

 

 মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সেদিন বাবা বলেছিল, জানি দুরন্তপনার বয়সে যখন তোর উচ্ছ্বলতায় মেতে থাকার কথা তখন বড় ভারী দায়িত্বের ভার বয়ে নিতে বলছি মাগো। আমরা যে পরিস্থিতির কাছে বড় নিরুপায় গো মা। 

 

মা যদি কখনো অহেতুক কারণে চিৎকার চেঁচামেচি করে তখন বাবার বলা কথাগুলো ভেবে সিঁথি খুব দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেয় নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায়।

 

শরীফুজ্জামান আর নাজমা দম্পতির অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় রূপ দেবার জন্যেই হয়ত সৃষ্টিকর্তা সিঁথিকে এতো লক্ষ্মীমন্ত আর গুণের আঁধার বানিয়ে দিয়েছেন।

 

গোসল সেরে মাকে বুঝিয়ে মানিয়ে শান্ত করে সিঁথি বারান্দায় গেল। এক পশলা বৃষ্টির পর প্রকৃতির সবুজ যেন তার সতেজতা ফিরে পেয়ে আরো স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকদিন পর হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি হলে পীচ ঢালা রাস্তা থেকে যে একটা সোঁদা গন্ধ ভেসে আসে সেটা সিঁথির বেশ লাগে। রাস্তাগুলো তাদের সব রুক্ষতা ধুঁয়ে মুছে নিয়ে যেন পরিপাটি রূপ ফিরে পায়। 

 

বারান্দায় একটা এলোভেরা আর একটা নয়নতারা ফুলের চারা লাগিয়েছে সিঁথি। গাছগুলো দেখতে দেখতে ভাবছিল-

 

ইশ, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার মত বড় হয়ে যেত সে, তবে হয়ত এমন দিনে বারান্দায় কড়া করে এক কাপ চা নিয়ে বসতো। এখন মাকে চা দিতে বললেই তারস্বরে চিৎকার করে বলবে-

 

রাতে না ঘুমানোর ফন্দি।  রাত জেগে গল্পের বই পড়বার ফন্দি। আরো কত কি। ইস, এখনো কত ছোট সিঁথি!

 

এসব ভেবে রুমে ঢুকে ড্রেসিংটেবিল পার হয়ে বিছানার দিকে পা বাড়াতেই হুট করে কি মনে করে যেন ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় চোখ পড়লো। 

 

আজকে সিঁথি ওর পছন্দের কলাপাতা রঙের জামাটা পড়েছে। আয়নায় নিজের মুখশ্রী দেখতেই হঠাৎ যেন ওর কানে ভেসে উঠলো ভরাট কন্ঠের সেই কথা-

 

“আমার বোন দেখতে আপনার মত সুন্দর”

 

সিঁথি কিছুক্ষণ আয়নার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে ভাবতে লাগলো কথাটা দিয়ে কি বোঝাতে চেয়েছিল!

 

তার বোনের পরিচিতি নাকি সিঁথি সুন্দর……

 

***************************

 

দুপুরের খাওয়া শেষে তপু ঘুমিয়েছিল। ঘুম ভেঙে দেখলো ঘড়িতে পাঁচটা বাজে। উঠে টাওয়াল নিয়ে ফ্রেশ হবার জন্য ওয়াশরুমে গেল।

 

বের হয়েই দেখে তন্বী ফুলকপির চপ আর সস নিয়ে রুমে এসেছে। মায়ের হাতের এই চপটা তপুর খুব পছন্দ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসনে চতুর্থ বর্ষে পড়ছে তপু। ভার্সিটিতে পলিটিক্যাল দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে গন্ডগোলের জেরে ১৫ দিনের জন্য হল লীভ হওয়ায় বাসায় এসেছে সে। 

 

আদরের ছেলে যে ক’দিন  বাসায় আছে মা তার পছন্দের প্রায় সব খাবার রান্নার এক মিশনে নাম লেখান। এ নিয়ে তন্বীর খুনসুটি ঘরে লেগেই থাকো।

 

— ও ছেলে মাঝে মাঝে আসে বলে এত আহ্লাদ। আমি সারা বছর থাকি বলে এই ঘরে আমার কোন ভেল্যু নাই। বুঝবা, আমিও যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হবো তখন ভেকেশানেও আসবো না। খালি কাঁনবা আর কাঁনবা আমার জন্য। এখন তো আমার যেটা খেতে ইচ্ছে করে সেটা দশদিন বললে পরে একদিন রাঁধো। তখন আমার পছন্দের খাবার রেঁধে হলে নিয়ে গেলেও দেখা করবো না। ডাইনিং এর মোটা ভাত, পাতলা ডাল, আধা সেদ্ধ আর কম তেল মসলার তরকারি খাবো আর ছবি তুলে তোমাদের পাঠাবো।

 

বাসার সবাই ওর এসব মেকি হাঁক ডাক রাগ খুব উপভোগ করে। তপুর খুব আদরের বোন তন্বী। চুড়ি ওর খুব পছন্দ। ড্রেসের রঙের সাথে মিলিয়ে চুড়ি পরতে ভালোবাসে বলে ছুটিতে আসবার সময় বোনের জন্য প্রতিবারই কম-বেশি চুড়ি আনে তপু।

 

তপুকে ওয়াশরুম থেকে বের হতে দেখেই বোন বলল

 

— চপ খেয়ে নাও। আম্মু চা বানাচ্ছে।

 

ব্যবসায়ী বাবাকে বিকেলের এ সময়ে সাধারনত বাসায় পাওয়া যায় না।

 

তন্বীকে রুম থেকে চলে যেতে দেখে হাতে একটা চপ নিয়ে তপু বলল-

 

— বাসায় তো ভালোই তিড়িং বিড়িং করিস কিন্তু স্কুলে কি ভদ্র হবার ভান ধরে থাকিস নাকি?

 

~ মানে কি? এটা কেমন প্রশ্ন?

 

— না আমি তো ভাবতাম তোর বাঁদরামোর চোটে স্কুলেও এক নামে তোরে সবাই চেনে। 

 

~ ঘটনা কি ভাইয়া? তোমারে কে কি বলছে?

 

— কিছু না। যা চা আন। চা খেতে খেতে বই পড়বো।

 

~ আমাকে টেনশান দিয়ে তুমি বই পড়তে পারবা ভাবছো? পড়ায় বাগড়া দেবার জন্য আমি কি কি করতে পারি তুমি ভাবতেও পারবা না!

 

— আমি দরজা বন্ধ করে পড়বো, তুই কি করবি?

 

~ আম্মুকে গিয়ে বলবো তোমার মন খারাপ, রাতে ভাত খাবা না বলছো। ব্যস, আমি আর কিছু করবো না। বাকী কম্মখানা তোমার দরদী মা জননীই সারবেন।

 

তপু জোরে জোরে হাসতে লাগলো। হাসতে গিয়ে বিষমও খেল। পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে তন্বী এবার অনুনয় করলো-

 

~ বলো না ভাইয়া, কেউ কি আমার নামে কিছু বলেছে তোমাকে?

 

— আরে নাহ্। তুই স্কুলের ডিবেট কম্পিটিশন নিয়ে গল্প করতে গিয়ে সিঁথি নামের একটা মেয়ের কথা বলেছিলি না?

 

~ হ্যাঁ, সিঁথি আপু। আমার দেখা দুনিয়ার অন্যতম লক্ষ্মী মেয়ে।

 

— মেয়েটার সাথে দেখা হয়েছিল আজ। তোর নাম বলায় চিনতে পারলো না।

 

~ সিঁথি আপু চেনেনি? 

পরক্ষণেই বলল

~ আরে স্কুলে তো সবাই আমাকে ভালো নাম মানে ফাহমিদা নামে চেনে তাই চিনতে পারেনি হয়ত। ফ্রেন্ডরা ডাক নামে জানে। ওরা তো সিনিয়ার আপু তাই জানে না।

 

— ওহ্ আমি তাহলে তোর খারাপ নামটা বলে দিয়েছি।

 

~ ভাইয়া মজা করা বন্ধ কর। তুমি তাকে চিনলা কি করে? তোমার সাথে কোথায় দেখা হল?

 

তপু দুপুরের আগে ঘটে যাওয়া পুরোটা ঘটনা জানালো।

 

তন্বী খুব আফসোস করে বলল-

 

~ এত মিষ্টি একটা মেয়ে ওর সাথে এমন হল ইসস!

 

তারপর তন্বীদের পুরো ফ্যামিলি ক্রাইসিস তপুকে জানালো।

 

— তুই এত সব জানিস কি করে?

 

~ আমার ফ্রেন্ড ঈশিতার বড় বোন দিনা আপুর ক্লাসমেট, ওর কাছ থেকেই শুনেছিলাম।

 

তপুর কোন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তন্বীকে চা দিয়ে যেতে বলে বুক শেল্ফ থেকে সুনীলের “সেই সময়” বের করে নিল। বিন্দুবাসিনীর কথা পড়তে ওর ভালো লাগে।

 

কিন্ত কিছুতেই বই পড়তে পারছে না। বইয়ের পৃষ্ঠাজুড়ে কেবল একটা মায়াবী মুখ ভেসে উঠছে।

 

বই রেখে চা নিয়ে বারান্দায় গেল তপু।

পাশে মোবাইলের প্লে লিস্টে বাজছে-

 

আজ শ্রাবণের বাতাস বুকে

এ কোন সুরে গায়

আজ বরষায় নামল

সারা আকাশ আমার পায়

 

আজ শুধু মেঘ সাজাই মেঘে

আজ শুধু মেঘ বুকে

আজ শুধু বিষ ঢালবে আকাশ

বিষ মেশানো সুখে

 

দাও ঢেলে দাও

যে প্রেম আমার হৃদয় জ্বলে যায়

আজ বরষায় নামল

সারা আকাশ আমার গায়

 

দিগন্তলীন মাঠের ওপর 

থাকছি আমি শুয়ে

এই কপালের সমস্ত তাপ

বর্ষা দেবে ধুঁয়ে

 

এর বেশি কি পাওয়ার থাকে

এর বেশি কে চায়

আজ বরষায় নামল

সারা আকাশ আমার পায়….

 

*************************

 

স্কুলের এসেম্বলি শেষে সিঁড়ি বেয়ে ক্লাসরুমের দিকে যাবার সময় কেউ একজন বলে-

 

-কি অবস্থা আপু?

 

পাশ ফিরে তাকাতেই ফাহমিদাকে দেখলো সিঁথি।

 

~ এই তো ভালো। তোমার কি খবর?

 

— ভালো। কাল আমার ভাইয়া তোমার কথা বলছিল।

 

কথাটা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো সিঁথি।

 

— মানে, গতকাল নাকি রাস্তায় কিছু বখাটে ছেলে তোমার সাথে বাজে ব্যবহার…

 

এটুকু বলতেই সিঁথি কথা টেনে নিল।

 

~ ও আচ্ছা উনি তোমার ভাইয়া? কিন্তু উনি নাম বলেছিল তন্বী।

 

— ওটা আমার ডাক নাম আপু।

 

~ আমি জানতাম না বলে চিনতে পারছিলাম না। দেখো তো কি অবস্থা। 

 

সিঁথি ভাবলো কাল তো ওর ভাইয়ার নামটাও জানা হয়নি।

 

~ আরেকটা কথা, আমি না আসলে এত পাজলড হয়ে গিয়েছিলাম যে ভাইয়ার নামটাও জানা হয়নি।

 

— ভাইয়াকে সবাই তপু নামে চেনে।

কথা বলতে বলতেই রুমের সামনে চলে এলো তন্বী। যাই আপু বলে পা বাড়াতেই সিঁথি বলল-

 

~ ফাহমিদা, এত ঘাবড়ে গিয়েছিলাম যে ভাইয়াকে একটা থ্যাংকস ও জানানো হয়নি। তুমি প্লিজ আমার পক্ষ থেকে থ্যাংকস বলে দিও।

 

— আরে ধূর এত ফরমাল হবার কিছু নাই।

তবুও তুমি যেহেতু বলছ আমি বলে দেব।

 

************************

 

আরিফ ভাইয়ের কোচিং এ বসে আড্ডা দিয়ে দীর্ঘ সময় কেঁটে গেল তপুর। এলাকার বড় ভাই আরিফ মেধাবী কিছু ছেলেদের নিয়ে ক্লাসভিত্তিক কোচিং সেন্টার চালায়। সামনে এস এস সি পরীক্ষা। মডেল টেস্ট দেবার জন্য অনেকে ভর্তি হচ্ছে এখন।

 

ওদের আড্ডার মাঝেই একজন রুমে আসবার অনুমতি চাইলো।

 

শরীফুজ্জামান মেয়েকে মডেল টেস্টের জন্য ভর্তি করাতে নিয়ে এলেন। 

 

তপু যারপরনাই অবাক হল!

হুট করে এভাবে আবারো এই মায়াবতীর দেখা পেয়ে যাবে তপু সেটা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি। 

অন্যদিকে কি এক অদৃশ্য কারণে এখানে তপুকে দেখতে পেয়ে সিঁথি অবাক না হয়ে বরং স্বস্তি অনুভব করল।

মনে হল আবার যেন দেখা হবারই কথা ছিল!

 

তবে সৌজন্যমূলক কিছু বলতে গিয়েও বলল না, পাছে আবার কিভাবে একে অপরকে চেনে এ নিয়ে যদি কথা হয়। এখন এসব নিয়ে এখানে কথা বলতে মোটেও ভাল লাগবে না। তাছাড়া বাবা আজ সকালেই মাত্র ঢাকা থেকে এসেছে, তাই ঐদিনের ঘটনা বলা হয়ে উঠেনি। এখন হুট করে জানলে দুশ্চিন্তায় পরে যাবে। ওকে নিশ্চুপ দেখে তপুও ভালো মন্দ কিছু জানতে চাইলো না। 

 

সিঁথিকে হুট করে দেখতে পেয়ে তপুর মনে হচ্ছে এই মায়াবতীকে দেখবার জন্যেই হয়ত দুদিন ধরে অবচেতন মন কাতর ছিল।

 

শরীফুজ্জামান জানালেন প্রমোশনে তিনি ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। সিঁথির পরীক্ষা শেষে ফ্যামিলি যাবে।

কোচিং এর টাকা পরিশোধ করে মেয়ের পড়াশুনার প্রতি খেয়াল রাখতে বলে বিদায় নিলেন।

 

আরিফ ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তপুও ওদের পরপরই বেরিয়ে গেল।

 

চৌরাস্তার মোড়ে এসে মেয়েকে বাসার দিকে পাঠিয়ে বাজারের পথে গেলেন শরীফুজ্জামান।

 

— পরীক্ষা শেষে এখান থেকে চলে যাচ্ছো তাহলে।

 

কন্ঠ শুনে আঁতকে উঠে পাশে তাকাতেই তপুকে আবিষ্কার করে সিঁথি। হঠাৎ কেন যেন খুব ভালো লাগলো ওর। এতক্ষণ যেন তপুর জন্যেই অপেক্ষা করে ধীর পায়ে হাঁটছিল সে।

 

ধূর! কি সব ভাবছে সিঁথি। তপুর কথার জবাব দিল-

 

~ সে রকমই কথা।

 

— তুমি আমার অনেক ছোট, তাই তুমি করেই বললাম।

 

~ অবশ্যই। এটাই স্বস্তিদায়ক। ফাহমিদা মানে তন্বীর সাথে কথা হয়েছে। সেদিনের জন্য ধন্যবাদ।

 

— তন্বী একবার সেটা কনভে করেছে।এই শব্দ পাবার জন্য কিছু যেহেতু করিনি, তাই ওটা না দিলেই ভালো। আর সেদিন না জেনে বুঝেই আমাদের দেখা হয়েছে। আমি কিন্ত তোমার বিপদ দেখে দূর থেকে সাহায্যের জন্যে আসিনি। কেবল সামনে পরে যাওয়ায় একটু পাশে থেকেছি। এটাকে বিশেষ কিছু বলা ঠিক হবে না। তাই ধন্যবাদটা আপাতত তোমার কাছেই থাক। 

 

তারপর- সাইন্সে পড়ছো, সবার মত ডাক্তার হতে চাও বুঝি?

 

~ না, আমি ল’ইয়ার হতে চাই।

 

— বাহ্! অন্য সবার থেকে ব্যতিক্রমী চাওয়া।

 

~ অনেকে বিশেষ করে একাধিকবার টিচাররা বলেছেন, তুমি ভালো ডিবেট কর। আইনজীবী হলে অনেক ভালো করবে। আর এই প্রফেশনটার প্রতি আমারও খুব আগ্রহ কাজ করে। হয়ত ডিবেট করতে করতেই… খুব চ্যালেঞ্জিং মনে হয়।

 

— তাহলে কষ্ট করে সাইন্স পড়ছো কেন?

 

~ রেজাল্ট যেমন ছিল, সাইন্স নেয়াটা একরকম বাধ্যবাধকতাই ছিল। আর ভবিষ্যতের কথা কেই বা বলতে পারে। বর্তমানে দাঁড়িয়ে আমরা তো কেবল কল্পনা করতে বা স্বপ্নই দেখতে পারি। দেখা যাক সামনে কি হয়।

বাসার কাছে চলে আসছি। যেতে হবে।

 

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটায় কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা অনুভূত হল তপুর। বাসায় যাবার পথটা আরো দীর্ঘ না হবার আক্ষেপ যেন মনের কোথাও বেজে উঠল।

 

সিঁথি বায়ের গলিটায় পা বাড়াতেই ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তপু বলল-

 

— সিঁথি, আমি পড়াশুনার জন্য চিটাগং থাকি। কাল ভোরে চলে যাব। সামনে অনার্স ফাইনাল শুরু হবার কথা। হয়ত কয়েক মাস আসা হবে না। তাই সহসা হুট করে এভাবে দেখা হবে না আর। সাবধানে পথ চলো…

 

বুকটা হাহাকার করে উঠল সিঁথির। 

কি আজব, একটা মানুষের সাথে ঘটনাক্রমে দুদিন ক’মিনিটের জন্য দেখা আর কথা হয়েছে। আর দেখা না হওয়াটাই তো খুব স্বাভাবিক। 

কিন্তু এই স্বাভাবিক ব্যাপারটা মেনে নিতে সিঁথির এত অস্বাভাবিক লাগছে কেন…….

 

*********************

 

তপু বাসা থেকে ভার্সিটিতে এসেছে প্রায় মাসখানেক হয়ে গেল। আজ হলে তার রুমের ব্যালকনিতে বসে গিটারে টুংটাং সুর তুলছিল। গানটা বরাবরই ভালো গায় ও। শেখেনি তবুও ওর গায়কীতে বন্ধুবান্ধব, স্বজন, পরিচিত অনেকেই মুগ্ধ । 

 

গিটারটা শেখার ইচ্ছে ছিল। বাবার সায় ছিল না। তাই মা একটু একটু করে টাকা জমিয়ে আদরের ছেলেকে গিটার কিনে দিয়েছিল। শেখাও শুরু করেছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় দৌড়াদৌড়ি বাঁধ সাধায় আর শেখা হয়ে উঠেনি।

 

ভরা পূর্ণিমায় হলের ছাদে গিয়ে বন্ধুদের আবদার মেটাতে কিংবা রুমমেটদের জন্মদিনে অথবা ওদের কারো মন খারাপ বা আনন্দে গিটারের ধূলো ঝেড়ে নিয়ে তপুকে গান গাইতেই হয়।

 

একমনে গিটার বাজাবার সময় পাশে রাখা ফোন বেজে উঠল। বাসা থেকে ফোন করেছে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠস্বর –

 

~ হ্যালো, কেমন আছিস বাবা?

 

— ভালো, তুমি কেমন আছো?

 

~ স্কুল ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য বন্ধ। বাসায় একজন রাজত্ব গেড়ে বসছে। বুঝে নে আমি কেমন আছি!

 

পরীক্ষা চলছে, কি জানি সিঁথির পরীক্ষা কেমন হচ্ছে? মেয়েটার বাবাও ঢাকায়। সেন্টার তো জিলা স্কুলে পড়েছে নিশ্চয়। অত দূরে কে নিয়ে যাচ্ছে কি জানি…

 

মায়ের কথায় ভাবনায় ছেদ পরে-

 

~ কি রে কথা শুনিস না? পরীক্ষার ডেট হল?

 

— ২২ তারিখ মানে সামনের সপ্তাহ থেকে শুরু হবে আম্মু।

 

~ আচ্ছা, ঠিকভাবে খাওয়া দাওয়া করিস। শেষ বর্ষ- মন দিয়ে পড়িস বাবা। রেজাল্ট যেন ভালো হয়।

 

— হু। দোয়া করো বলে লাইন কেটে দেয় তপু।

 

হলের সামনে অদূরের ঐ পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে সিঁথির মুখটা মনে পড়তেই মন কেমন করে ওঠে….

 

আজকাল প্রায়ই ডিপার্টমেন্ট এর গ্রুপ স্টাডিগুলোতে উদাস হয়ে যায় তপু। বন্ধুরা পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, তোর হইছে টা কি! ক তো! তপুর বলতে ইচ্ছা করে না কিছুই! 

বন্ধুরা মিলে ঝুপড়িতে খেতে যাবার সময় ডাকলেও যায় না। ডাইনিং এর অপছন্দের খাবারটা খেয়ে রুমে শুয়ে বসে বই পড়ে আর বইয়ের পৃষ্ঠাজুড়ে অস্পষ্ট একটা মায়াবী মুখাবয়বকে কল্পনা করে……..

 

সিঁথির পড়ার টেবিলে নাস্তা রেখে মা পাশে বসলো।

 

—পরশু কি পরীক্ষা?

 

~বায়োলজি।

 

— রিভিশন ভালো হচ্ছে?

 

~ শুরু করলাম মাত্র। এটার প্রিপারেশন ভালো। হায়ার ম্যাথ নিয়ে টেনশান লাগে।

 

— তোর বাবা একটু আগে বলল, ঢাকায় আমাদের যাবার ডেটটা মাস তিনেক পেছাতে পারে।

 

সিঁথি চমকে উঠল মা’র কথায়। এখান থেকে চলে যাবার কথা মনে হলেই সিঁথির ইদানীং অস্থির লাগে। অথচ একটা সময় ছিল যখন ওরা সবাই ঢাকায় সেটেল্ড হয়ে যাবে ভাবলেই আনন্দ লাগতো। কত প্ল্যান করতো বাবার সাথে বসে। অনেক বড় বাসা ভাড়া নেবে। বারান্দায় ওর লাগানো গাছগুলো ট্রাকে করে নিতেই হবে। দু’চারটে গাছ বলে অবহেলা করে ফেলে যাওয়া যাবেনা এমন আরো কত কি! আথচ এখন এসব আর ভাবনাতেই আসে না।

 

নিজের মনে মনে সে উত্তর খুঁজলো, চলে যেতে হবে ভাবলে মন খারাপের কারণটা কি?

 

এই শহরে ভার্সিটির বন্ধে তপু আসে। কোনদিন হয়ত হুট করে দেখা হয়ে যেতে পারে। সুন্দর করে গুছিয়ে বুঝিয়ে কোন কথা বলতেই সিঁথি মুগ্ধ হয়ে শুনবে…. ব্যস এটুকুর জন্যই ওর মন চায় না এ শহর ছেড়ে চলে যেতে!

 

ভারী আশ্চর্য! এমন করে কেন ভাবছে সিঁথি। কি অস্বস্তিকর! দুদিনের আলাপে একজন মানুষকে নিয়ে এতসব উদ্ভট চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবার মত হ্যাংলা স্বভাবের মেয়ে তো মোটেই সিঁথি নয়। এলাকার কত

ছেলেপেলে ওর পেছনে ঘুরঘুর করেছে। টিনএজ মেয়েদের দেখলে উঠতি বয়সের ছেলেরা যা করে আরকি! বাবা নিজে কত ঝামেলা সামলেছে। সবসময় এসব বাজে ব্যাপারে সিঁথি বিরক্তিই হয়েছে। মনের ভুলেও কখনো কোন বিষয়কে প্রশ্রয় দেয়ার চিন্তা অব্দি মাথায় আনেনি। কলোনির মানুষজনও তাই সিঁথিকে খুব লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে বলে জানে আর তাই সিঁথিকে নিয়ে মা-বাবার খুব গর্বও হয়।

 

কিন্তু সেই বৃষ্টির দিনে তপু দাঁড়িয়ে থেকে সিঁথিকে এগিয়ে যেতে দিয়ে তারপর ওর পিছু পিছু হাঁটবার কথাটা মনে পড়লে ভাবে, এতো কেয়ারিং একটা মানুষের কথা না চাইতেও মনে আসাটা স্বাভাবিক!

 

তারপর কোচিং এ ভর্তি হবার দিন যখন দেখা হল সেদিন ভার্সিটিতে চলে যাবার কথাটা বলবার সময় তপু এক দৃষ্টিতে যেভাবে তাকিয়েছিল তাতে ফুঁটে উঠা অসহায়ত্ব চোখ এড়ায়নি সিঁথির। সেই চাহনির কথা মনে হলে সিঁথির মনটাও খানিক উদাসীন হয়না বললে বড্ড ভুল বলা হবে……

 

মুখে নাস্তা পুরে নিয়ে জিজ্ঞেস করে-

 

~ যেতে দেরীর কারণ কি মা?

 

— তোর বাবা বললো সরকারি কোয়ার্টার পাবার সম্ভাবনা আছে। তাই মাস তিনেক দেরি করে গেলে একেবারে কোয়ার্টারেই উঠতে পারবো আমরা। আরেকটা বড় সুবিধা হল এরমধ্যে দিনার পরীক্ষা টা শেষ হবার সম্ভাবনা আছে। তোরও রেজাল্ট হয়ে যাবে। কাগজপত্র তুলে নিয়ে একেবারে ওখানে গিয়ে ভর্তি হবি। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। আচ্ছা তুই পড়। আমি যাই।

 

সিঁথিও ভাবছে, যা হয় ভালোর জন্যই হয়…….

 

***************************

 

পরীক্ষা শেষে কম্পিউটারের বেসিক একটা কোর্সে ভর্তি হয়েছে সিঁথি। ঢাকায় যেতে আরো কিছুদিন বাকী। ততদিনে প্রয়োজনীয় একটা কোর্স করে নিতে বাবা’ই বলেছিল।

 

ছয় মাসের কোর্স। কিন্তু কোচিং সেন্টারের পরিচালক ওর বাবার পরিচিত বিধায় উনি বললেন, প্রয়োজনে সিঁথিকে এক্সট্রা সময় দিয়ে কোর্সটা শেষ করিয়ে দেবেন যাওয়ার আগে। তারপর পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ে এসে পরীক্ষা দিয়ে গেলেই ঝামেলা মিটে গেল।

 

এলাকায় ‘অথেনটিক ডিবেটিং সোসাইটি’ নামে একটা ডিবেট অর্গানাইজেশন বেশ কিছুদিন আগ থেকে কাজ শুরু করেছে। এরা প্রাথমিক পর্যায়ে শহরের স্কুল, কলেজগুলোতে ডিবেট কম্পিটিশন শুরু করেছে। আস্তে আস্তে ব্যাপ্তি বাড়লে ডিবেট ওয়ার্কশপ সহ সামাজিক বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ করবার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। 

 

পরিচিত এক বড় আপুর মাধ্যমে এই অবসর সময়ে ওদের সাথে কাজ করবার ডাক পায় সিঁথি। এর মধ্যে দিনারও ডিগ্রি পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই বাসায় মাকে টুকটাক সাহায্য আর আনুষঙ্গিক কাজের মাঝে দিন কেঁটে যাচ্ছিল।

 

কিন্তু ব্যস্ততার ভিড়ের টুকরো অবসরে তপু ভাইয়াকে মনে পড়ে গেলে একটু অস্থির আজও লাগে। বড় বিচিত্র মানুষের মন! সে যে কোন ছুঁতোয় কাকে মনে সযত্নে রেখে দেয় বলা মুশকিল!

 

তপুর রিটেন পরীক্ষা শেষ হলেও প্রশাসনিক এক কাজের ঝামেলায় ভাইবার ডেট একটু দেরীতে পরেছে, তাই বাসায় যেতে পারছে না। এই ফাঁকে বিসিএস এর কোচিং এ ভর্তি হয়ে যেতে পারতো। আগে ভর্তি হলে ক্লাস আগে থেকে শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু তপু এখনই ক্লাসে ইনভল্ব হতে চায় না। আগে কিছুদিন বাসায় থেকে আসতে চায়।

 

কিন্তু কেন?

বাসায় যাবার জন্য এত উতলা কেন হচ্ছে তপু?

মনকে প্রশ্ন করতেই খুব আলতো করে সিঁথির মুখটা ভেসে উঠে মানসপটে……..

 

সিঁথি আদৌ আছে কিনা সেটাই তো তপু জানেনা। এতদিনে ঢাকায় চলে যাবার কথা। তবুও ওখানে যেতে মনটা বড় অস্থির হয়ে আছে। সিঁথি চলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এটাকে মেনে নিতেই হবে, কিচ্ছু করার নেই। সিঁথি যদি বাস্তবতার তাগিদে চলে গিয়েও থাকে তবুও কি এক অদৃশ্য মায়ায় তপু ঐ পথ ধরে হাঁটতে চায় যে পথে ঐ মায়াবীর স্মৃতি লুটায়ে আছে……..

 

তপু চাইলেই তন্বীর কাছ থেকে খবরটা নিতে পারতো। তন্বী ঈশিতার মাধ্যমে খুব সহজে জেনে নিতে পারতো সিঁথিরা চলে গিয়েছে নাকি আজও আছে।

 

কিন্তু তপুর ইচ্ছে হল না তন্বীর থেকে জানতে। কারণ, সিঁথির ব্যাপারে তপুর এই অহেতুক কেয়ারনেসের বিষয়টার মাঝে যে অন্য কোন সূক্ষ্ম অনুভূতি কাজ করছে সেটুকু বুঝবার মত বয়স তন্বীর হয়েছে। 

 

বোনের সাথে যতই খুনসুটি আর আহ্লাদের সম্পর্ক থাকুক না কেন তপু চায় না ওর ব্যাক্তিত্বকে ক্ষূন্ন করে এমন কিছু তন্বীর দৃষ্টিগোচর হোক। আর এ বিষয়ে তপুর চেয়েও সিঁথির সম্মানের কথা আগে ভাবতে হবে। সিঁথি ঘুণাক্ষরেও এমন কোন কাজ করেনি যাতে করে তপু এতটা অনুভব করতে পারে তাকে। কিন্তু তন্বীর কাছে জানতে চাইলে সে হয়ত সিঁথির সম্পর্কেও ভুল একটা ধারনা পোষণ করতে পারে।

 

তাই তপু সব ভেবে সিঁথির জন্যে এক অনিশ্চিত অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে………..

 

*******************

 

বাসায় আসবার সময় আম্মু, আব্বু, তন্বীর জন্য সবসময় কিছু না কিছু তপু অবশ্যই নিয়ে আসে।সাধ্যের মধ্যে খুব সামান্য জিনিসই আনে। একবার আব্বুর জন্য ফতুয়া আনবার পর ওটা হাতে নিয়ে আব্বু যখন মনে প্রশান্তি চেপে বলল-

~ ফতুয়া তো এতগুলো আছে, আবার আনার দরকার কি ছিল?

 

তপু তখন মনে মনে বলে, আপনার এই প্রশান্তচিত্ত দেখবার জন্য সাধ্যে থাকলে আরো কিছু নিয়ে আসতাম আব্বু। কিন্তু মুখে বলে-

 

— থাকলে কি হইছে, পাল্টায়ে পাল্টায়ে পরবেন।

 

আম্মু তো আরো অবুঝ! ছেলে কি দিল সেটা দেখে কি দেখে না বরং জিনিসটা হাতে নিতে দেরি তো সহাস্যে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দেরি নেই এক মুহূর্ত। সশব্দে না বললেও ছেলের জন্য না জানি কায়মনোবাক্যে কত দোয়া নিমিষেই করে ফেলেন  স্রষ্টার কাছে।

 

আম্মু কোন দরকারে বাসার বাইরে যাবার সময় পানের খিলি বানিয়ে ব্যাগের সাইড পকেটে নিয়ে যায়। তাই এবারে স্টীলের পানের একটা ছোট্ট বক্স এনেছে তপু। সুপারি, জর্দা, চুন রাখার খোপগুলো খুলে খুলে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে সে ভাবল-

 

ছোট সিঁথি একদিন বড় হয়ে এমনিভাবে দায়িত্ব নিতে শিখে গেলে ওর মায়ের অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা খানিক কমবে। সেদিন হয়ত সিঁথিও একটু নির্ভার হতে পারবে!

 

মায়ের কথায় সম্বিৎ ফিরে আসে-

 

~ সবার জন্য বহুকিছু করা হইছে। এবার এই অবসরে গিটারটা আবার শেখা শুরু কর বাবা।

 

মায়ের কথায় মুচকি হেসে ব্যাগের ভেতর থেকে এবারে সবচে বড় প্যাকেটটা নিয়ে তন্বীকে ধরিয়ে দিয়ে কপট রাগী ভঙ্গিমায় বলে-

 

— এই শেষবার। এত বড় প্যাকেট আর আনতে পারব না। ব্যাগের সব জায়গা খেয়ে নেয়। আমার নিজের কাপড় চোপড় ঢোকানোর জায়গাই পাই না!

 

বিস্মিত তন্বী ব্যাগ খুলে মস্ত বড় এক টেডিবিয়ার পেয়ে খুশিতে চিৎকার দিতে যাবার সময়ই তপু জানান দেয়-

 

— এত উচ্ছ্বসিত হবার কিছু নাই। সপ্তাহ পরেই তোমার জন্মদিন বলে এক্কেবারে একের মাঝে দুটো গিফট দিয়ে দিলাম। পরে আবার জ্বালাতন করিস না যেন! আম্মু তুমি কিন্তু সাক্ষী!

 

সবাই হাসে। তন্বী তো টেডি’কে জড়ায়ে ধরে খিলখিলিয়ে হেসেই চলেছে।

 

রাতে বেশ বৃষ্টি হল। তাই শেষ রাতের দিকে একটু ঠান্ডা লাগছিল। ঐ ঠান্ডায় ফ্যান স্পীডে চালানো থাকায় তপুর ঠান্ডা লেগে গলা ব্যথা হয়ে গেল। 

 

সকালে ১০টা বেজে গেলেও তপু বিছানা ছেড়ে না উঠায় মা গিয়ে দেখে জ্বরে বেশ নাকাল হয়ে গিয়েছে ছেলে।

 

মা হাহাকার করে উঠে-

 

~ ডাকবি না আমাকে। বলেই জলপট্টি দিয়ে একটু স্যুপ খাইয়ে দেবার পর নাপা খাইয়ে শুইয়ে দিল।

 

সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে দিন পাঁচেক লেগে যাবার সাথে সাথে বেড়ে গেল প্রতীক্ষাও!

 

এর মাঝেই এসএসসির রেজাল্ট হয়ে গেল। স্কুলে কারা কারা ভালো করেছে সেই সুবাদে তন্বীর মুখে সিঁথির ভালো রেজাল্টের খবরও জানা হয়ে যায় তপুর। 

 

শুধু জানা হয়না সিঁথির সাথে দেখা হবার সুযোগ আর কখনো হবে কিনা। এক অস্থির বিষাদ জেঁকে বসেছে তপুর মনোজগতে। এ কারণেই হয়ত পুরোপুরি সুস্থও হয়ে উঠতে পারছিল না।

 

তন্বীর জন্মদিন আজ। তপুও খানিক সেরে উঠেছে। ঘরময় কিছুটা আয়োজন হয়েছে। আশপাশের বাসার কয়েকজন আর তন্বীর কয়েকজন বান্ধবীদের বলা হয়েছে। 

 

সন্ধ্যার কিছু পরে ঈশিতা এলো। তপু তখন সোফায় বসে WAR  মুভি দেখছে। তন্বী কিছুক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করেছিল রুমটা আরেকেটু সুন্দর করে সাজিয়ে দিতে। দিব দিচ্ছি করে করেও তপু করে উঠতে পারছিল যেন।

 

ঈশিতার সাথে তন্বীর মায়ের দেখা হতেই বললেন-

 

~ তোমার মা আর আপুকে নিয়ে এলে না যে?

 

— আন্টি, আপু আর আম্মু দিনা আপুদের বাসায় গেল। ওরা কয়েকদিনের মধ্যে চলে যাচ্ছ তো আবার সিঁথি আপুর রেজাল্ট হয়েছে তাই সময় থাকায় আজ একটু দেখা করতে গেল। যাবার সময় এদিক দিয়ে আপনাদের সাথেও দেখা করে যাবে।

 

তপু যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সিঁথি আজও এ শহরেই অদূরে কোথাও আছে! এখনও সুযোগ আছে ঐ মায়াবী মুখটাকে আরো একবার সামনাসামনি কাছ থেকে দেখবার!

 

তন্বীকে ডেকে বলল-

তোর সিঙ্গল কিছু ছবি আর আমাদের ফ্যামিলি ফটো কয়েকটা দে । সাথে স্কচ ট্যাপ আর কাঁচিটাও দিস। বারান্দায় যাবার থাইগ্লাসটাতে ছবিগুলো লাগিয়ে দিই। দেখতে ভালো দেখাবে।

 

তন্বী ড্রয়ার থেকে সবকিছু বের করতে করতে ভাবছে, ভাইয়ার হঠাৎ কি হল? এতক্ষণ তো বলেও কিছু করানো যাচ্ছিল না।

 

কি যে হল সেটা যে তপুও বুঝতে পারছে না…..

 

**********************

 

একাডেমিক কোচিং সেন্টার থেকে শরীফুজ্জামানের মোবাইলে ফোন এলো। এসএসসি তে যারা ভালো করেছে তাদের সংবর্ধনা দেখা হবে। 

 

ঢাকায় শিফট করতে একটু দেরী হওয়ায় ভালোই হল। অনেকগুলো কাজ গোছানো হয়ে গেল। এটা ভাবতে ভাবতেই বাসায় ফোন করে নাজমাকে কাল কখন, কোথায় সংবর্ধনার অনুষ্ঠানটা হবে তার সময় আর জায়গা জানিয়ে দিলেন।

 

সংবর্ধনার কথা শুনে খুব স্বাভাবিকভাবেই বেশ লাগলো সিঁথির। চলে যাবার আগে অনেকের সাথে দেখা হয়ে যাবে। শুধু তপু শহরে ফিরল কিনা জানা হল না।

 

আর ফিরলে অথবা জানলেই বা কি? সিঁথি বোকার মত অকারণে অপেক্ষা করে আছে বলে তপুও যে অপেক্ষা করে থাকবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা আছে নাকি!

 

নিজেরই উপর কপট এক অভিমানে বিষন্ন হয় সিঁথি!

 

দুপুরের ভাতঘুমটা মোবাইলের রিংটোনে ভেঙে গেল তপুর। আরিফ ভাই ফোন করেছে। রিসিভ করতেই কন্ঠ ভেসে এল-

 

~ হ্যালো, তপু?

 

— কেমন আছেন আরিফ ভাই?

 

~ ভালো। কেমন আছো বলার আগে বল কোথায় আছো?

 

— কেন বলেন তো?

 

~ তোমাকে দরকার একটা অনুষ্ঠানের জন্য।

 

— অনুষ্ঠান? 

 

~ আগে বল এখানে আছো কিনা?

 

— হ্যাঁ আছি। আপনি টেনশান নিয়েন না। পুরো ব্যাপারটা একটু বলেন তো আমাকে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

 

~ আরে আর বলো না। জরুরি এক কাজে কিছুদিনের জন্য সিলেট যেতে হচ্ছে। গত পরশু মাত্র ডিসিশান হল। তাই তড়িঘড়ি করে এসএসসি’র ব্যাচটাকে সংবর্ধনা দিতে ছোট্ট একটা প্রোগ্রাম করতে হচ্ছে। কারণ, ফিরতে কিছুটা দেরী হতে পারে। এর মধ্যে অনেকে আবার বিভিন্ন দিকে ভর্তি হয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবে  বলে আগামীকালই সব করছি।

 

তপু যেন হতভম্ব হয়ে গেল। এ যে- মেঘ না চাইতে বৃষ্টি! অদূরে সিঁথি আছে। এদিকে আবার ওদের নিয়ে করা প্রোগ্রামে আরিফ ভাই ডাকছে। 

কেন ডাকছে সেটা জিজ্ঞেস করবার হিতাহিত জ্ঞানটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে। আরিফই বলল-

 

~ এলাকার স্কুলগুলোর কয়েকজন টিচার, গণ্যমান্য কিছু ব্যাক্তি আর ভাল রেজাল্টধারীদের নিয়েই প্রোগ্রাম। আলোচনা আর ক্রেস্ট প্রদান শেষে খাবার বিতরণ করে ছোট্ট একটা সাংস্কৃতিক পর্ব করতে চাই।

 

— সবই বুঝলাম, কিন্তু আমাকে কেন দরকার তাই বলেন।

 

~ তুমি গান গাইবা।

 

— ধূর, কি যে বলেন!

 

~ কেন?

 

— আপনি তো জানেন, আমি একটু গোবেচারা টাইপ মানুষ। ওসব রক গান আমাকে দিয়ে হবে না ভাই।

 

~ রক গাইতে হবে কে বলল? আমি তো জানি তুমি মেলোডিয়াস গাইতে পছন্দ কর।

 

— কিন্তু ওসব গান এই বয়সের ছেলেপেলেদের ভালো লাগবে না ভাই।

 

~ কে বলল লাগবে না? আরে, এরা সব ব্রিলিয়ান্ট ছেলেপেলে। ওরা লিরিক বুঝে গান শুনে। তোমার গানই বরং ওদের বেশি ভালো লাগবে। কাল ক্লাব অফিসে ৪টায় চলে এসো। 

 

— আপনি ওভাবে বললে কি আর না করার সুযোগ আছে ভাই, আপনার কথাই শিরোধার্য।

 

~ দেখা হচ্ছে তাহলে কাল। গিটার সমেত চারটায় পৌঁছে যেও।

 

— ওকে। বলেই ফোন রাখলো তপু।

 

ভাগ্যিস কিছুদিন বাসায় থাকবে বলে এবার গিটারটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।

 

মন থেকে খুব করে কোন কিছু চাইলে, সেটা অবশ্যই পূরণ হয়- এ কথাটা অনেক লেখায় তপু পড়েছে। আজ নিজের জীবনে সেটা উপলব্ধি করল।

 

কাউকে কিছু না বলে, না বুঝিয়ে সিঁথির দেখা পেতে চেয়েছিল এক প্রকার দৈবাৎ ভাবেই। সে ইচ্ছেটা ওর চাওয়ার মত করেই পূরণ হতে চলেছে। 

 

মনোজগতের সাথে শরীরের কী ভীষণ বোঝাপড়া। সিঁথির সাথে দেখা হবে একথা ভাবতেই যেন শরীরটা তার ক্লান্তির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

 

ক্লাব অফিসের ছোট অডিটোরিমে এসে ক্লাসমেটসহ বিভিন্ন স্কুলের অনেকের সাথে দেখা হল সিঁথির। এটাই শেষ দেখা সবার সাথে।

 

জন্ম থেকে এখানেই বেড়ে ওঠা সিঁথির। এই নদী, জল, হাওয়া, আলো, বাতাসে ১৬ বছরের স্মৃতি মিশে আছে। আজ বুঝতে পারছে ঢাকামুখী হবার যতটা তাড়া ছিল  একসময় তার চেয়ে এই চেনা পরিবেশের সাথে জড়ানো টান অনেক বেশি গভীর।

 

অডিটোরিমে ঢুকবার আগেই আরিফ ভাইয়ের সাথে দেখা তপুর। অফিসের ক্লার্ককে দিয়ে গিটারটা ভেতরে পাঠিয়ে তপুর সাথে টুকটাক কথা সেরে ভেতরে গিয়ে বসতে বলল।

 

রুমের দরজার সামনে এসে কৌতুহলী চোখ কাউকে খুঁজতে লাগলো। খানিকক্ষণ তাকাতেই চোখ আটকে পড়ল সাদা কামিজ পরে চুলের বেণী ধরে নাড়াচাড়া করতে থাকা স্মিতহাস্যোজ্জ্বল সেই চেনা মায়াবী মুখের পরে!

 

কাকে বেশি শুভ্র লাগছে? সাদা ড্রেস নাকি সিঁথিকে…….. তপু কিছুতেই বুঝতে পারছে না!

 

শুধু টের পাচ্ছে ওর নিউরন এক এক করে সিঁথিকে বার দুয়েক দেখবার স্মৃতিগুলো ফ্ল্যাশব্যাকের মত কল্পনায় দেখিয়ে যাচ্ছে।

 

কি আশ্চর্য মাত্র কয়েকগজ সামনে থেকেও কেন সিঁথি এতটা অধরা! ওকে দেখে তৈরি হওয়া অনুভূতির সুর কি সিঁথির মন অব্দি কখনো পৌঁছবে? সেই সুরে গান ধরতে সিঁথির মন কখনো কি চাইবে!

 

কিন্ত কেন যেন সিঁথির কাছ থেকে খানিক সময় আড়াল থাকতে ইচ্ছে করছে তপুর। তাই পেছনের দিকে বেশি মানুষের জটলায় গিয়ে বসে পড়লো সে।

 

আরিফ ভাই স্টেজে এসে দূরে তপুকে দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে সামনে বসতে বললেও হাতের ইশারায় তপু জানালো এখানেই ঠিক আছে সে।

 

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে সংবর্ধনা পাওয়া একটি ছাত্র তার দারুন ভরাট কন্ঠস্বরে আবৃত্তি করলো সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’।

 

এরপর আরেক কৃতী ছাত্রীর স্টেজ কাঁপানো এক নাচের পর সবার মুহুর্মুহু করতালি শেষে আরিফ ভাই স্টেজে নিয়ে এলেন তপুকে।

 

সবাই করতালি দিয়ে তপুকে স্বাগত জানাবার পরই আরিফ ভাই ছোট করে তপুর পরিচিয় দিতে লাগলেন। কিন্তু সেসব কথার কিছুই সিঁথি বা তপু কারোর কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে পারলো না।

 

সেসব কথা ছাপিয়ে হুট করে এভাবে এখানে তপুকে দেখতে পেয়ে সিঁথির যারপরনাই বিস্ময় আর সিঁথির প্রতি তপুর মুগ্ধতা দিয়ে ওরা কেবল একে অপরের দিকেই তাকিয়ে ছিল! যেন অনন্তকাল ধরে এ দৃষ্টি বিনিময়। কোন শব্দ নেই অথচ দৃষ্টির আকুলতা সব বলে দিয়ে চলেছে….

 

সবার সামনে কিন্তু বোঝার অলক্ষ্যে আজকের এই গানটা তপু শুধুমাত্র সিঁথির জন্যে গাইবে বলে ভেবে  এসেছে।

 

নিজের সবটুকু আবেগ, অস্থিরতা, আকুলতার নিবেদন সিঁথির তরে রাখবার জন্যে তপু যেন তার সর্বস্ব দরদ দিয়ে গাইলো-

 

মেঘ নেমে এলো তার জানালার কাছে

হাওয়া ডেকে নিল তার

আলগোছে মন!

 

কি জানি তোমার মনে

আছে কিনা আছে

মুখে যে বলেনি কিছু

আমি সেইজন-

 

শুকনো পাতাতে হাওয়া

সারাটি দুপুর

যার লোভে বাজিয়েছে

কিশোরী নূপুর!

 

যার টানে ভাসে ঘর

ও দুটি নয়ন

তুমি কি জানো না সখী

আমি সেই জন-

 

মেঘ নেমে এলো তার জানালার কাছে….

 

ছলকে উঠেছে জল

দুলছে বাতাস

বলে যাও তার কথা

ধরনী বাতাস!

 

তোমার পায়ের কাছে

এ মহা জীবন

রেখেছি আমার প্রেম

আমি সেই জন…….

 

গান শেষে সবাই তপুর গায়কীর খুব প্রশংসা করছিল।

 

আর সিঁথি জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি মেলে ভাবছিল-

পৃথিবীতে এর চাইতে শ্রুতিমধুর গান হয়ত আর একটিও নেই………

 

বেরিয়ে যাবার জন্য ক্লাব অফিসের গেট পর্যন্ত ধীর পায়ে হেঁটে আসছিল সিঁথি। 

 

কিন্তু কেন? কেন কারো জন্যে অপেক্ষা করছে? 

আর মাত্র একটা দিন পরেই এই পথ-ঘাট সব ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর কোন সুযোগ নেই এমুখী হবার। তাহলে শেষ মুহূর্তে এমন পিছুটানে কেন টলছে! এই পিছুটানের ভার বয়ে বেড়ানো বড় যন্ত্রনার। কোনভাবেই এই যন্ত্রনা সে বয়ে বেড়াতে চায় না। কিন্তু খুব আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই যন্ত্রনা থেকে তার অবচেতন মন মুক্তিও পেতে চায় না! 

 

তপুর দৃষ্টির আকুলতা সিঁথিকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। এর থেকে মুক্তি মেলা মানে যেন মনে মনে মরে যাওয়ার নামান্তর।

 

আনমনে এসব ভেবে সিঁথি গেট পেরিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই পাশের এক টং দোকান থেকে গলা খাকড়ি দিয়ে তপু পিছু পিছু হাঁটা শুরু করল।

 

সিঁথি মনে মনে ভাবলো, একবার পিছু পিছু এই হেঁটে চলার মায়া ছাড়াতেই হিমশিম খাচ্ছে সে। তার মধ্যে আজ আবারও।

 

যেখান থেকে সিঁথি রিকশা নেবার কথা ওখানে আসবার পর তপু পাশে এসে বলল-

 

— পথটা কিন্তু খুব বেশিদূর না। গল্প করতে করতে হেঁটে গেলে ফুরিয়ে যাবে।

 

~ কিন্তু দেরি হবে।

 

— তাতে করে কি সমস্যা বাসায় নাকি পথে নাকি আমি?

 

সিঁথি চোখ তুলে তাকালো। আর কিছু বলতে পারল না। তপু ওর পিছু পিছু থাকলে, এমন অন্তহীন পথ সে পাড়ি দিতে পারে অনায়াসে। এ কদিনে মন অন্তত সহস্র উপায়ে সেই জানান দিয়েছে।

 

পাশে একটা ভেলপুরির লোককে দেখে তপু জানতে চাইলো-

 

— সিঁথি কি খেতে পছন্দ কর? না মানে মেয়েরা তো ফুচকা, ভেলপুরি এসব খেতে খুব পছন্দ করে তাই বলছিলাম আরকি।

 

~ আমার বড়দের মত সকাল বিকাল নিয়ম করে চা থেকে ইচ্ছে করে।

 

তপু বিস্ময়ে সিঁথির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটা এত আলাদা কেন সবার থেকে? ওর মায়া যে তপুকে মরমে মারছে সেই কথাটা ওর ব্যাক্তিত্বের দিকে তাকিয়ে বলাও যায় না।

 

তপু অবাক হয়ে জানতে চায়-

 

— তো চা খেতে ইচ্ছে করলে খাবা। সমস্যা কি?

 

~ আমি এখনো অত বড় হইনি তো। একটু বড় হলে পরে খাব। এই ধরেন ভার্সিটিতে যখন উঠব তখন।

 

কথাগুলো বলতেই ওর চোখদুটো যেন চকচক করে উঠে। তপু খেয়াল করে সেটা।

 

মুহূর্তেই ভেবে নেয় সিঁথির চোখ জুড়ে সাজানো স্বপ্নের পসরা নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। ওর চলার পথে অদৃশ্য বন্ধনের কারণে কোন বাঁধা দেয়া যাবে না।

 

এক জায়গায় বসে চা খেতে পারি? তপু জানতে চায়।

 

সিঁথি কি বলবে ভেবে পায় না। মনে মনে ভাবে, একসাথে কোথাও বসলে খুব হ্যাংলামো হয়ে যাবে নাতো?

 

~ আসলে দেরি যাচ্ছে, বাসায় যাওয়া দরকার।

 

— ঠিক আছে তুমি না চাইলে থাক। চলো এগিয়ে যাই।

 

তপুর মন খারাপটা টের পায় সিঁথি। পরে নিজেই বলে বসে, সামনের টং দোকানটায় চা খাই চলেন।

 

তপু চমকে গিয়ে সিঁথির  দিকে তাকাতেই মেয়েটা দ্রুত পায়ে হাঁটা দেয়। তপুও পিছু পিছু এগিয়ে যায়।

 

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তপু জানতে চায়-

 

— তোমরা কবে যাচ্ছো?

 

~ পরশু।

 

কথাটা শুনতেই চা টা খুব বিষাদ লাগতে থাকে তপুর। দুজনই নীরব থেকে চা শেষ করে। এতদিনে জমে থাকা কত কথা বলার ছিল কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই আর বলতে ইচ্ছে করে না। 

চলে গেলে তপুকে মনে থাকবে কিনা মায়াবী মেয়েটার সেটাও জেনে উঠা হয়না!

 

চা শেষ করে উঠে কিছুদূর গিয়ে নীরবতা ভাঙে সিঁথি।

 

~ গান বেশ লাগলো কিন্ত।

 

গানটা তোমার জন্যেই গাওয়া- মনে মনে বলে তপু।

মুখে কেবল একটু মুচকি হাসে ।

জানতে চায়-

 

— তুমি বই পড়তে ভালোবাসো?

 

~ বাসি তো। অল্প স্বল্প পড়ি।

 

— কার লেখা পছন্দ?

 

~ খুব বেশি তো পড়া হয়নি। বই পড়তে দেখলে মা কেমন যেন সন্দীহান হয়ে যায়। বলেই দুজন হেসে উঠলো। তবে যাদের পড়েছি তাদের মাঝে রবি ঠাকুর বেশি প্রিয়।

 

— পরশু কখন যাচ্ছো?

 

~ সকালের প্রভাতী ট্রেনে। বাবা ট্রাকের মালামাল নিয়ে  রাতে রওনা দেবে। আর আমরা সকালে ট্রেনে করে।

 

— আপনি কিছুদিন আছেন এখানে?

 

~ বলতে পারছি না এখনো, দেখি।

 

সিঁথি নেই এটা ভাবলে মনে যে ফাঁকা অনুভবটা হবে সেটা নিয়ে এবারে কতদিন থাকতে পারবে তপু আসলেই জানে না।

 

সিঁথি জানায়-

 

~ বাসা চলে এসছে। যেতে হবে।

 

তপু কিছু বলে না। সিঁথির দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। গলির মুখে দাঁড়িয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

 

তপুর দিকে তাকিয়ে ভালো থাকবেন বলতে পারেনা সিঁথিও। শুধু মনে হল, ওর পা দুটো যেন চলতে ভুলে গেছে। সরতে জানে না।

 

সিঁথির বাসার বায়ের গলির পথটা আজ আর কারো নির্ভরতার দৃষ্টিতে আগলে থাকে না। 

ওপথে ছড়িয়ে থাকে তপুর হাহাকার। সিঁথিকে সেই হাহাকার মাড়িয়ে হেঁটে যেতে হয়……

 

***********************

 

প্ল্যাটফর্মে সিঁথিরা বসে অপেক্ষা করছে প্রায় ২৫ মিনিট হয়ে গেল। সবকিছু গুছিয়ে তড়িঘড়ি করে বেরুতে গিয়ে বোতলে করে মা পানি আনতে ভুলে গিয়েছে।

 

মায়ের কথামত পানির বোতল কিনতে প্ল্যাটফর্মের একটা দোকানে গেল সিঁথি। পানি নিয়ে দোকানির কাছ থেকে খুচরো ফেরত নেবার সময় প্ল্যাটফর্মে চিপস বিক্রি করা এক ছোট হকার ছেলে সিঁথির কাছে এসে একটা ছোট্ট প্যাকেট নিতে বলে।

সিঁথি অবাক হতেই সে দূরে হাত দেখিয়ে বলে-

 

-আফু, ঐযে কালো রঙের শার্ট পরা ভাইয়াডা বইয়া রইছে, হে আমনেরে এইডা দিতে কইলো।

 

সিঁথিদের আগেই স্টেশনে এসেছে তপু।কোন এক ফাঁকে সিঁথি একটু সরলেই কাউকে দিয়ে এই প্যাকেটটা দেবে বলে। আর সিঁথিকে শেষ দেখার স্মৃতিটুকু চোখে পুরে নেবে বলে।

 

সিঁথি দৃষ্টিসীমায় তপুকে দেখতে পায় কিন্তু তপু এদিক পানে তাকানোর সাহস করতে ভয় পায়। 

 

সিঁথি কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তপু এখান পর্যন্ত এসেছে, তারপর আবার এই প্যাকেট দিয়েছে। ওর উচিত তপুর সাথে গিয়ে কথা বলা। কিন্ত এখানে মা, দিনা’পু আছে। কি করবে?

 

এসব ভাবতে ভাবতেই প্ল্যাটফর্মের মাইকে ঘোষণা হয়, ঢাকাগামী মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেস অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছবে। অগত্যা মায়ের পাশে চলে আসতে হয়। 

 

‘ট’ বগিতে উঠে নিজেদের সীট খুঁজে বসবার পরে সিঁথির অনুভূত হল জানালা দিয়ে কেউ ওরদিকে  তাকিয়ে আছে।

 

পাশ ফিরে তাকাতেই জানালার পাশে দাঁড়ানো তপুর চোখে চোখ পড়লো….

 

সিঁথির বিস্ময় ভরা দৃষ্টির দিকে তপু কয়েক সেকেন্ডের বেশি তাকিয়ে থাকতে পারলো না। চোখ ফিরিয়ে নিতেই ট্রেনের চাকাও গড়াতে শুরু করল।

 

ট্রেনের গতি বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে তপুর মনে হল, এখানে অসাড় দেহটাকে রেখে কেউ যেন তার প্রাণটা নিয়ে ছুট দিল….

জীবনের প্রয়োজনে সিঁথির চলে যাওয়া মেনে নিতে গিয়ে ভারী হয়ে আসা চোখের পাতা দুটো বন্ধ করে নিল তপু………….

 

ট্রেন যখন শহর ছাড়িয়ে মাঠ-ঘাট-গাছ-জলাশয় পেরিয়ে বহুদূরের পথে চলে যাচ্ছিল সিঁথি তখনো তপুকে শেষ দেখার দৃশ্য চোখে পুরে নিয়ে বন্ধ করা চোখ খুলবার সাহস পাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল- চোখ খুললেই বুঝি হারিয়ে যাবে তপু….

 

পানি চেয়ে মা ডাক দিতেই চোখ খুলল সিঁথি। সামনের সীটে থাকা মাকে পানির বোতল দিয়ে দেখলো দিনা’পু ঘুমাচ্ছে।

 

ব্যাগের ভেতর থেকে ছোট্ট প্যাকেটটা বের করে খুলতেই পেল রবি ঠাকুরের “শেষের কবিতা”।

 

বুদ্ধি করে জেনে নেয়া দুটো পছন্দ কেমন যত্ন করে পূরণ করে দিল তপু, সেটা ভাবতেই সিঁথির গলায় কান্নারা দলা পাকাতে শুরু করে।

 

বইয়ের মলাট উল্টোতেই ভাঁজ করা কাগজ!

 

কাগজের ভাঁজ খুলতেই লেখা-

 

সিঁথি

 

লেখকেরা বলে, যে চোখ সবকিছুকে দেতে পায় সে চোখ নাকি নিজেকেই দেখতে পায় না, চোখকে দেখতে হলে মনের আলো লাগে। আমিও তাই বিশ্বাস করি। আর সে আলোতে আমি বুঝে নিয়েছি এ চিঠি পেয়ে তুমি অবাক হবে না। বরং আপ্লুত হবে।

 

অকারণে আমি যেমন তোমার প্রতীক্ষায় থেকে থেকে মুষড়ে পরেছি, সে কষ্ট কখনো না কখনো তোমাকেও ছুঁয়েছে সেটা কোচিং এর অনুষ্ঠানে গানের পর জানালা দিয়ে তোমার তাকিয়ে থাকা দেখে বুঝেছি।

 

তোমার চোখে জীবনে এগিয়ে যাবার জন্য কল্পনার তুলির যে আঁচড় দেখেছি, সেটা হয়ত তোমার জীবনের এই সময়ে আমার অনভিপ্রেত আগমনে বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে। এই ভেবে দূরে সরে গিয়েছি। তোমার কল্পনারা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যতটা রঙিন হয়ে সেজে উঠবে আমার এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ততটাই সার্থক হবে।

 

আমাকে ভেবে তুমি যতটা বিষন্ন হয়েছো তার দায় কোনভাবেই তোমার একার না। এর আধেক দায় আমারও। কোথাও তোমার কোন ভুল ছিল না। কখনো কোথাও তুমি আমাকে প্রশ্রয় দাওনি। 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত আবেগের কথা ভেবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রাখতে কখনো কুণ্ঠাবোধ যেন না করো তাই এই চিঠি। কোন ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করো।

 

তোমার প্রিয় ঠাকুর মশাইয়ের কথা মত ভেবে নিও, তোমাকে মনে নিয়ে তোমার চলে যাওয়াটা মেনে নিয়েছি। তুমি কোন পিছুটান রেখো না, তবেই স্বস্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। এটা আমার অনুরোধ। আর জানো তো, কারো আদেশ উপেক্ষা করলেও অনুরোধ উপেক্ষা করা যায় না। কারণ, অনুরোধ মানুষ উপায়ান্তর না দেখে কাতর হয়ে করে। আমার এই কাতরতার মূল্য তুমি নিশ্চয়ই দেবে।

 

আর জেনো, সবসময় তোমার ভালো থাকার মাঝে আমার ভালো থাকার বসবাস থাকবে…..

 

–তপু

 

সিঁথির মনটা বরাবরই দারুন বাধ্য। যে কোন প্রয়োজনে একনিষ্ঠের মত মন ওর সব কথা মান্য করে।

কিন্তু চোখ দুটো ভীষণ অবাধ্য। সামান্য জলও আটকাতে জানে না……..

 

(শেষ)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন