ঝিলাম নদীর দেশঃ কাশ্মীর ভ্রমণের ইতিবৃত্ত

এম আর রাসেল

কাশ্মীরকে বলা হয় ‘The paradise of the earth’. এখানে রয়েছে বিখ্যাত সব স্থাপত্যশৈলী ও অনন্য সুন্দর প্রাকৃতিক নিদর্শন। এর মধ্যে ঝিলাম নদী, ডাল ও নাগিন লেক, নিশাত বাগ- শালিমার বেগ, চেশমা শাহী, গুলামার্গ -পেহেলগাম উল্লেখযোগ্য। ডাল ও নাগিনের সৌন্দর্যে বিমোহিত মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান ‘মেহবুবা’ বলে ডাকতেন। নূরজাহান নাম দিয়েছিলেন ‘খোদা কি তোহফা’। 

কাশ্মীর নিয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর এর ভাষ্য ছিল ‘আমি কিভাবে এর প্রশাংসা লিখব? কাশ্মীর হল স্বর্গীয় বসন্তের উদ্যান’। বিখ্যাত পর্যটক আল বেরুনি বলেছেন, ‘পরীর দেশ’। মার্ক পোলো বলেছেন, ‘ফুলের বিছানা’। কাশ্মীরের স্থাপত্যশৈলীতে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কাশ্মীরের প্রকৃতিতে সুর হয়ে বেঁচে আছে হাব্বা খাতুন। হযরতবাল মসজিদ ঘিরে রহস্যবোনা জালের বুনন, পীর পাহাড় বা তখত-ই- সুলাইমান, খিলানমার্গ পাহাড় এর মনোহর দৃশ্য এসবই কাশ্মীরে স্থিত হয়েছে।

মৌর্য যুগের কাল পেরিয়ে মোগলদের হাত ফসকে কাশ্মীর এক সময় ডোগরা রাজাদের শাসনাধীন  হয়। ব্রিটিশ শাসিত ভারববর্ষের স্বাধীনতা কাশ্মীরকে দীর্ঘস্থায়ী সংকট উপহার দিয়ে যায়। যার খেসারত এখনও দিয়ে যাচ্ছে কাশ্মীরের জনগণ। কাশ্মীরের এতসব রূপ ও বেদনা জাগানিয়া ইতিহাস জানাতে লেখক বুলবুল সরওয়ার অসাধারণ একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘ঝিলাম নদীর দেশ’। বইটি প্রকাশ করেছে অ্যার্ডন পাবলিকেশন। মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা

লেখক মায়াবী হরফে ভালবাসার কালিতে কাশ্মীরের যে চিত্র এঁকেছেন তা দেখে যে কেউই বিস্ময়ে অভিভূত হবে। আবার কেউ চোখের নোনাজলে গাল ভিজাবে এটা হলফ করে বলা যায়। ভ্রমণ স্মৃতিকে অবলম্বন করে লেখা হলেও বইটিকে ভ্রমণকাহিনী না বলে ভ্রমোণপন্যাস বলাই যুতসই হবে। পুরো বই জুড়ে ক্ষীণজীবী কিছু চরিত্রের প্রোজ্জ্বল উপস্থিতি ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে। আর লেখকের প্রথম সৃষ্ট চরিত্র নাজনীন এর আভার বিকিরণ গল্পের শেষ পর্যন্ত প্রোজ্জ্বল ছিল। ক্ষণিক সময়ে সৃষ্টি চরিত্র হয়েও যেন পুরো সময়ে লেখকের পাশেই ছিল। প্রকৃত কাশ্মীরকে জানতে নাজনীন এর জবানিতে যে বাণী পাওয়া যায় তা পাঠক হৃদয়ে ব্যথার নহর বইয়ে দিয়ে যায়।

‘ঘরের দরজায় পুলিশ প্রহরা থাকলে বসন্ত আর শীতে পার্থক্য থাকে, বল।’ 

এই উক্তির মধ্যে গভীর বেদনার দ্যোতনা আছে। কাশ্মীরের অপরূপ রূপে চোখ জুড়াতে অনেক পর্যটকই আসে তবে নাজনীনের এই মর্মভেদী কথার সুর কেউ শুনতে পায় না। পায় না বলেই হয়ত নাজনীন লেখককে বলেছেন,

‘তুমি যদি আসল কাশ্মীরকে জানতে চাও,তাহলে তোমাকে যেতে হবে মাটির আরও গভীরে।’ 

লেখক যে মাটির গভীর তলেই চোখের জল ফেলেছেন তা পুরো বই পড়লে বুঝতে পারা যায়। কাশ্মীরের রূপ সাগরে ডুব দিয়ে লেখক বের করে এনেছেন কাশ্মীরের ভিতরের রূপটাকে৷ একই সাথে কাশ্মীর নিয়ে ঘৃণ্য রাজনীতির ঘটনাও বিধৃত করতে ভুলে যান নি। বোনাস হিসেবে আগ্রার তাজমহলকেও দেখা যায় এই বইয়ের পাতায়। বইটির ব্যাক কভারে আবদুল মান্নান সৈয়দ এর একটি মূল্যায়ন লেখা আছে।

‘আমাদের প্রোজ্জ্বল রচনা আঙুলে গোনা। ব্যতিক্রম যা, তার বিচারও নান- নিরিখে নানা রকম। যেমন ভ্রমণোপন্যাস ‘ঝিলাম’ – নজরুলীয় প্রেম আর ফররুখীয় জোশ এর ব্যতিক্রমী সমন্বয়৷ ইতিহাসের পথে যখন কবি হাঁটেন, সে এক বিচিত্র জীবনানন্দ। বিস্ময়কর যে, বুলবুলের আরাধ্য আবার মহামনীষী টলস্টয়।’

আপ্তবাক্যটির মাঝেই পুরো রচনার সারকথা উঠে এসেছে৷ নাজনীনের ঈগলের ডানার মত ভুরুর চকিত চাহনিতে লেখক স্পন্দিত হন। তিনি আর্জুমান্দ, ফাতিমা ও দীনার দিকে তাকিয়ে এদের চেহারায় ভূ-মধ্য সাগরীয় স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পান। তিনি গল্পের সমাপ্তি রেখায় দাঁড়িয়ে মন্তব্য করেন, ‘কি লাভ প্রেমকে প্রতারিত করে’? তিনি পর্যটকের সাথে যুক্তিতর্কে মেতে উঠে বলেন,

‘মুঘল স্থাপত্যের দিকে তাকাও – দেখবে,  সেখানে রয়েছে মানুষের শাশ্বত চেতনার গভীর অন্তর্গত মিল। ইংরেজিতে যাকে বলে কানেকশন বিটুইন ন্যাচার উইথ সুপার ন্যাচার; আত্নার সাথে পরমাত্নার সংযোগ। এ জন্যই তাজ, লালকেল্লা, আগ্রা ফোর্ট কিংবা এই চেশমা শাহীর সৌন্দর্য কখনও এমন কাজে ব্যবহৃত হয় না,  যা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে। অথচ গ্রিক বা রোমান ভাস্কর্য ঠাঁই পেয়েছে মদের পাত্র আর বিছানার নগ্ন শোভাবর্ধনে।’

যুক্তিবাদী লেখক সত্তা হযরতবাল মসজিদ চত্বরে দাঁড়িয়ে চোখের পানিতে আবেগ ঝরিয়েছেন। আবার আবেগী লেখক সত্তা কিছুক্ষণ পর নদীকে দেখে পুলকিত হয়েছেন। সর্বোপরি সুমিষ্ট কিছু গল্পের স্রোতে ভেসে ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ঘেরা মনোহর কোনো দ্বীপে যেতে চাইলে ‘ঝিলাম নদীর দেশ’ হতে পারে উত্তম মাধ্যম। লেখক গল্পকথার মৌতাতে মাতিয়ে আপনার হৃদয় মন অফুরান খুশিতে ভরিয়ে তুলবে এতে কোনোই সন্দেহ নেই।

লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট 

আরও পড়ুন