অরাজনৈতিক ঝগড়া (পর্বঃ ৮)

মাহজেবিন মম

– সর্বত মঙ্গল রাঁধে বিনোদিনী রাই

বৃন্দাবনের বংশীধারী ঠাকুরও কানাই।

একলা রাঁধে জল ভরিতে যমুনাতে যায়,

পিছন থেকে কৃষ্ণ তখন আড়ে আড়ে চায়।”

– বাব্বাহ, খুব ভাল মুডে আছ মনে হচ্ছে?

– জ্বি, আমি ভাল মুডেই থাকি। আপনার মত মেঘে ঢাকা তারা হয়ে থাকিনা আমি।

– তোমার মুড তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতন। ট্রাম্প কখন কি বলে তার যেমন ঠিক ঠিকানা নেই তেমন তোমার মুড কখন কি অবস্থায় থাকে তারও কোন ঠিক ঠিকানা নেই।

– আবার আমাকে ট্রাম্পের সাথে তুলনা করলেন? আপনি এরকম গায়ে পড়ে ঝগড়া করছেন কেন? শুধু শুধু আমার ভাল মুডটাকে বিগড়ে দিচ্ছেন।

– ঠিক আছে, আর করব না ঝগড়া। কিন্তু তুমি যে গান টা গাইছিলে তা কি নিয়ে লিখা জান তো?

– ওমা, জানব না কেন আবার। রাঁধা- কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে এই গান টা লিখা হয়েছে।

– হুমমম, কিন্তু এই রাঁধা- কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” কাব্যে। মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন এই কাব্য। এই কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। ” শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ” কাব্য মোট তেরটি খন্ডে বিভক্ত। মূলত চর্যাপদের পর বাংলাসাহিত্যে এটিই প্রাচীনতম নিদর্শন।

– হুমমম। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে অবাক লাগে যে, এই কাব্য পাওয়া গিয়েছে বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামের এক ব্রাহ্মণের গোয়ালঘরে। গোয়ালঘরের মত জায়গায় এই কাব্যের কি কাজ সেটা নিয়ে আমি চিন্তিত। গরু তো আর পুঁথি পড়বে না তাইনা?

– তোমার মত দুষ্ট বালিকার মাথায় তো এগুলা ভাবনাই আসবে। মেয়ে মানুষ এত পাজি কেন হয় বল তো?

– মেয়েরা মোটেই পাজি হয় না, ছেলেরা পাজি হয়। ওই দুষ্ট কানাই( কৃষ্ণ) রাধাকে প্রেমে পাগল বানিয়ে মথুরায় পালিয়ে গিয়েছিল। আর এদিকে বেচারি রাঁধা বিরহে আকুল।

– শুধু কি মেয়েরাই প্রেমে পাগল হয় নাকি। তুমি কি ” লাইলি মজনু” উপাখ্যানের মজনুর কথা শোন নাই? বেচারা মজনু প্রেমে পাগল হয়ে শেষমেশ লাইলির কুকুরকে জড়িয়ে ধরেছিল। দৌলত উজির বাহরাম খানের রোমান্টিক প্রণয়কাব্য “লাইলি মজনু” ও কিন্তু মধ্যযুগের সৃষ্টিকর্ম।

– হিহিহি, আপনার কথা মেনে নিলাম উস্তাদ।মজনুর প্রেমের কোন তুলনা হবেনা। কিন্তু মধ্যযুগের
কাব্যগুলো সব প্রেম আর রোমান্টিকতায় পরিপূর্ণ ছিল মনে হচ্ছে। “মধুমালতী “, “ইউসুফ জুলেখা”, ” “সয়ফুলমুলক “, ” সতীময়না-লোরচন্দ্রানী” সবই তো দেখি প্রণয়োপাখ্যান।

– শুধু প্রণয়োপাখ্যান ছিল এমনটাও কিন্তু নয়। মঙ্গল কাব্য গুলো যেমন- মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, কালিকামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল এগুলো মূলত ধর্ম কেন্দ্রীক রচনা ছিল। বেহুলা লক্ষীন্দর, চাঁদ সওদাগরের কাহিনি, ঈশ্বরী পাটনীর কাহিনি গুলো মঙ্গলকাব্যের অংশ।

– বুঝলাম। তবে যাই বলেন, মধ্যযুগের এত রোমান্টিক কাব্য যেমন ছিল তেমন মানুষগুলোও নিশ্চয় রোমান্টিক ছিল। আপনার মত এমন আন-রোমান্টিক ছিল না।

– তুমি আমাকে আন-রোমান্টিক বললে? আমি খুব মন খারাপ করেছি মম।

– আপনি যে কত রোমান্টিক তা এই চার বছরে আমার জানা হয়ে গেছে উস্তাদ। মন খারাপ কইরেন না, স্পেশাল ক্রীম বিক্কু (বিস্কুট) কিনে দিব, সাথে দুধ চা ও বানিয়ে দিব।

– আমি এসব খাবনা। এক কাপ গ্রিন টি বানিয়ে দাও। তুমি জাননা আমি ডায়েটে আছি?

– আপনার আবার ডায়েট!!! ঠিক আছে আমি যখন দুধ চা খাব তখন আবার বইলেন না-

“এ সখী কেমনে বাঁধিব হিয়া
আমারি বধূয়া দুধ চা খায় আমারি সামনে বসিয়া”

( অতঃপর চা করিতে প্রস্থান করিলাম)

লেখক- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন-

দাম্পত্য সিরিজঃ অরাজনৈতিক ঝগড়া (পর্ব-৭)

আরও পড়ুন