আরবদের জীবন যাপন (পর্ব-২)

মোঃরুহুল আমিন

একটা সময় আরবের ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহনে বেশ অনীহা ছিলো।দ্রব্যমূল্য নাম মাত্র মূল্যে সৌদি সরকার পৌঁছে দিতো জনসাধারণের কাছে।
অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বেশির ভাগই আমাদানি করে আনা হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে।সবকিছুতেই সৌদি সরকার বিরাট একটা অংশ ভর্তুকি দিয়ে থাকে,সবার জন্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।আবার বেকারদের জন্যে ভাতা, বয়স্ক ভাতা,শিক্ষা ভাতা,আরো অনেক রকমের প্রণোদনা দিয়ে থাকে সৌদি সরকার।তাই আরবের ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ অনীহা ছিলো।কাজ-কর্মে তেমন আগ্রহী ছিলো না।সময়ে সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে।

এখনকার আরব সন্তানরা আগের মতো এতো অলস নয়।এখন ওরা লেখাপড়ায় বেশ আগ্রহী।উচ্চ শিক্ষার জন্যে ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বিভিন্ন কোর্সে এখন নিয়মিত ভাবে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে থাকে।

একসময় আরবরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারতো না,এলিট শ্রেণীর কিছু লোক ছাড়া। আরবে একটা জেনারেশন গড়ে উঠেছে, যারা এখন ইংরেজিতে বেশ দক্ষতার সাথে কথাবার্তার আদান প্রদান করতে পারে। এক-দেড় যুগ আগেও তেমন প্রসার ঘটেনি। অল্প সংখ্যক মানুষ ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারতো।বাচ্চারা প্রবাসীদের দেখলে ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করে।সেইদিনের পরিবর্তন ঘটেছে। শেখা ও জানার প্রতি আগ্রহ থেকে,পরিবার ছেড়ে একাকী জীবন যাপন করে অনেকটা সময়।ফিরে আসে অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে।কারণ আরব ছেলেরা কাজ করতে অভ্যস্ত নয়।পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে সবাইকে কাজ করতে হয়। বিশ্বায়নের যুগে সবই এখন হাতের মুঠোতে।

পৃথিবীর কোন প্রান্তের জীবন যাপন কেমন সহজেই জানা সম্ভব।আরব ছেলে-মেয়েরা এখন নিজে আয় করার প্রতি অনেকটা উৎসাহিত আগের তুলনায়।
এখন সবাই চাকরি করতে বেশ আগ্রহী,এখন আমরা যখন কোন আরব ছেলেকে দুষ্টুমির ছলে জিজ্ঞেস করি,তুমি বিয়ে করছো কবে?তখন বলে আমি মাদ্রাসা শেষ করে আমেরিকাতে যাবো,উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ভালো চাকরি করবো, তারপর বিয়ে করার কথা ভাবা যাবে।এখন সবার মধ্যে একটা নিরব প্রতিযোগিতা, কে কতোটা সম্পদশালী হতে পারে।যা এক যুগ আগেও তেমন ছিলো না।পাশাপাশি এখন জীবন যাপন আগের চেয়ে তিন চারগুণ ব্যয় বহুল দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি,বছর কয়েক আগেও যেখানে পেট্রোলের দাম ছিলো লিটার-পতি ৫৫হালালা। (পয়সাকে হালালা বলা হয়)বাংলা টাকায় মাত্র ১১/১২টাকার মতো, এখন সেই পেট্রোল ২রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে।আপনি কি জানেন?পেট্রোল হলো আরবদের জন্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মতো।
পেট্রোল ছাড়া ওদের একদিনও চলবে না।

আমরা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ, আমরা কম-বেশি সবাই পায়ে হেঁটে চলাচল করে থাকি।গ্রামাঞ্চলে আমরা বিকেল বেলাতে আড্ডা কিংবা চা পান করতে পায়ে হেঁটে দোকানে গিয়ে থাকি।দলবেঁধে আমাদের দেশে ছেলেরা হাঁটতে থাকে।

আরবদের এখানে পায়ে হাঁটার সংস্কৃতি নেই।ওরা যেখানেই যাবে গাড়ি নিয়ে যাবে।খেলা কিংবা ঘুরতে যাবে গাড়ি করে, নিজেরাই চালিয়ে যাবে।আরবরা নিজেরা ব্যক্তিগত গাড়ি চালাতে স্বাচ্ছন্দ্য-বোধ করে।

হাউজ ড্রাইভার নেওয়া হয় মূলত নারী শিশুদেরকে স্কুলে পৌঁছে দিতে,কিংবা চাকুরীজীবি মহিলাকে কর্মস্থলে পৌঁছে দিতে আবার বাসায় নিয়ে আসতে।
ব্যক্তিগত পারিবারিক ভ্রমনে নিজেরাই ড্রাইভ করে থাকে।একজন হত দরিদ্র আরব ভিক্ষাবৃত্তি করতেও গাড়ি ব্যবহার করে থাকেন।
মোটকথা গাড়ি ছাড়া আরবরা অচল।আরব দেশগুলোতে যেনো নতুন নতুন মডেলের গাড়ির ক্রয়ের প্রতিযোগিতা হয় প্রতিদিন।গাড়ির প্রতি আরবদের তীব্র নেশা।

আরবরা আমাদের দেশের মতো পাশাপাশি কাছাকাছির থাকতে পছন্দ করে না।টাকা পয়সা হলে একটু দূরে বসতি স্থাপন করে।এখনকার আরব পুরুষরা আগের মতো নির্জন স্থানে বাড়ি তৈরি করে না,আবার কোলাহলহীন জায়গা পছন্দ করেন।

আধুনিক সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় এইরকম নিরিবিলি স্থানে বাড়ি করেন।সমতলে কমই বাড়ি তৈরি করে,পাহাড় কেটে পাহাড়ের মাঝে বসতি গড়েন।বর্তমানে জেনারেশন বিদ্যুৎ আর পাকা সড়ক প্রাধান্য দিয়েই বসতি স্থাপন করে।আগেকার মানুষ নির্জন পাহাড়ে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন করতো।সেই চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে বেশ।

এক দশক আগেও খাবার পানির সংকট ছিলো বেশ।২৫টন পানির জন্যে হাজার বারো’শ রিয়াল গুনতে হতো(২০/২৫হাজার টাকা),১০০কিঃমিঃ দূর থেকে সংগ্রহ করতে হতো।সেই সংকটও দূর হয়ে গেছে। এখন পাইপ লাইনে মাধ্যম প্রতিটি এরিয়াতে পানি সরবরাহ করছে সৌদি সরকার নামমাত্র মূল্যে।দেড় মাস আগেও ২৫/২৬ টনের পানি গাড়ি মাত্র ৩৩ রিয়ালে বিক্রি হতো গাড়ির ভাড়া ছাড়া।এখন দাম বৃদ্ধি পেয়ে ২০০রিয়াল হয়েছে।

ভাবতে পারেন! সাগর থেকে পানি ফিল্টার করে জনগণের হাতের কাছে পৌঁছে দিয়েছে,একদশক আগেও যেখানে কূপের পানির উপর নির্ভর করতো হতো গৃহস্থালি কাজে, বড়ো বড়ো শহর গুলো ছাড়া।আমরাতো গ্রামাঞ্চলে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত টিউবওয়েলের মাধ্যমে ভোগ করছি বিনা পয়সায়।তবে বেশির ভাগ সৌদি নাগরিক, মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ বিত্তশালীরা বোতলজাত পানি পান করে থাকেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বোতলজাত পানি পাওয়া যায়।কয়েক বছর আগেও কোমল পানীয় আর পানির দাম কাছাকাছি ছিলো।একটা সময় পানির সংকট ছিলো,এখন মনে হয় বাংলাদেশ। পানির কোন সংকট নেই মরুভূমির এই দেশে।এখন সবজির চাষাবাদ হচ্ছে। আমাদের দেশে সবজির মধ্যে আলু অন্যতম।আপনি জানেন কি?বাংলাদেশ দেশ থেকেও কমদামে আলু পাওয়া যায় সবজি বাজারগুলোতে।

বাংলাদেশের মতো প্রায় সবরকম সবজি এখন সৌদিতে উৎপাদন হয়।সৌদির প্রতিটি বড়ো শহরে বাংলাদেশীরা বাঙালি সবজি বাজার নামে নামকরণ করে ফেলেছে।আপনার যদি কখনো মক্কাতে হজ্জ, উমরাহ করতে যান,তাহলে একবার নাক্কাসা পাহাড়ে ঘুড়ে আসুন।মনে হবে এটা বুঝি ঢাকার কারওয়ান বাজার।দূর থেকে পাহাড় দেখবেন, পাহাড়ে উঠতেই আপনি আশ্চর্য হয়ে যাবেন।দোকান পাট আর মানুষের ভীড়। এ যেনো একটুরো মিনি বাংলাদেশ।

আগেরকার মতো নেই।গত এক যুগে আবাসন প্রকল্পের ঋণ সুবিধা নিয়ে প্রচুর পরিমানে বাড়ি তৈরি হয়েছে।এখন চারিদিকে শুয়ে আধুনিক স্থাপত্যের বিলাসবহুল অট্টালিকা।একেকটা বাড়ির ভেতরের রুমের সাজসজ্জা দেখলে মনে হবে জান্নাতের কিছু দৃশ্য।প্রচুর অর্থ ব্যয় করে সাজসজ্জায় সজ্জিত করে প্রতিটি রুমে।আমি আপনি দেখলে বলবো যেনো পৃথিবীর বুকে একটুকরো প্রশান্তির জায়গা।

 

(চলবে..)

আগের পর্ব-

আরবদের জীবন যাপন (পর্ব -১)

আরও পড়ুন